ভারতের পার্লামেন্ট অচল

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০১৫, ২৩:৫২

ভারতের পার্লামেন্ট অচল হয়ে পড়েছে। গতকাল শুক্রবার চতুর্থ দিনের মতো কংগ্রেসসহ বিরোধী দলের তোপের মুখে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভার অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করা হয়। গতকাল অধিবেশন শুরু হওয়ার মাত্র চার মিনিটের মাথায় বিরোধীদের হট্টগোলের কারণে অধিবেশনের ছুটির ঘণ্টা বাজাতে বাধ্য হন স্পিকার। একই সঙ্গে পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার অধিবেশনও মূলতবি করা হয়। এসময় ললিত মোদী ইস্যুতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ, রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজে এবং শিক্ষা বিষয়ক বায়াপাম কেলেঙ্কারির ঘটনায় মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিংয়ের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন বিরোধী সংসদ সদস্যরা। খবর এনডিটিভি, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও আনন্দবাজার পত্রিকার।

 
গতকাল লোকসভা সচিবালয় হিসাব দিয়েছে, আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিলে শুধু সংসদ চালাতে প্রতি মিনিটে খরচ হয় ২৯ হাজার রুপি (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৫ হাজার টাকার বেশি)। আর এই যে এক সপ্তাহ সংসদের বাদল অধিবেশন ভেস্তে গেল, তাতে কাজ হয়েছে মাত্র ৬ শতাংশ। বাকি ৯৪ শতাংশ শুধু অপচয়। মাত্র ১৮ দিনের এবারের সংসদের প্রথম চারদিন এভাবেই কাটলো। সামনের সপ্তাহে সংসদ যে চলবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। পুরো অধিবেশন অচল থাকলে ক্ষতি হবে ৩৫ কোটি রুপি। গত মঙ্গলবার অধিবেশন শুরু হলেও গতকাল পর্যন্ত কার্যক্রম চলেনি। গতকাল অধিবেশনে যেসব প্রস্তাব উত্থাপন করার কথা ছিল তার একটা প্রস্তাবও উত্থাপন করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে কর সংস্কারের মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিল ঝুলে রয়েছে।
 
তিন বছর আগে যখন বিজেপি বিরোধী দলে, সেই সময় এমন কাণ্ডে কার্যত ভেসে যাওয়া সংসদের পর তত্কালীন সংসদীয়মন্ত্রী পবন বনশল একটি হিসাব দিয়েছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, বছরে সংসদ গড়পরতা চলে ৮০ দিন। রোজ ছয় ঘণ্টা করে। যদি সংসদের পিছনে সব খরচ ধরে নেয়া হয়, তাহলে প্রতি মিনিটে সংসদ চালাতে ব্যয় আড়াই লাখ রুপি।
 
হতাশা যে সংসদ থেকেও ফুটে ওঠেনি, এমন নয়। রাজ্যসভার ডেপুটি চেয়ারম্যান  পি জে কুরিয়নও বলেছেন, ‘এই অর্থহীন প্রক্রিয়ার কী অর্থ? রোজ আলোচনার নোটিস আমার কাছে জমা পড়ে। সব পক্ষ শুনি। আলোচনার সম্মতিও দিই। কিন্তু তারপর আর কেউ আলোচনা করেন না।’ খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও বৃহস্পতিবার সংসদ সদস্যদের কর্মশালার অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘এমপিদের উপরে মানুষের অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। সেই প্রত্যাশা পূরণের জন্য আমাদের কাজ করা উচিত। গোটা পৃথিবী কিন্তু নজর রাখছে আমাদের উপর।’
 
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিজেপি এখন যেটি বলছে, অতীতে বিরোধী দলে থাকতে তো তারাই উল্টোপূরাণ করত। সংসদ অচল করে ইউপিএ সরকারকে নাস্তানাবুদ করত সেই সময়। পাঁচ বছর আগে বাজেট অধিবেশনে টুজি কেলেঙ্কারিতে এ, রাজার পদত্যাগ দাবি হোক বা আদর্শ কেলেঙ্কারিতে অশোক চৌহানের। সেই বছরই শীতকালীন অধিবেশন শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়ে সংসদ ভন্ডুল করে দিয়েছিল। তারপর থেকে ইউপিএ সরকারের আমলে একের পর এক দুর্নীতি যেভাবে সামনে এসেছে, অন্য বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে বিজেপি স্তব্ধ করে রেখেছিল সংসদ। অরুণ জেটলির (বর্তমান অর্থমন্ত্রী) মতো নেতা বলতেন, বিক্ষোভ দেখানোও সংসদীয় কৌশলের অঙ্গের মধ্যে পড়ে। আজ কংগ্রেস বিরোধী দলে এসে সেই বিজেপি’র দেখানো পথে হেঁটেই নিজেদের ঘুরে দাঁড়ানোর রাজনীতিতে মশগুল।
 
সংযুক্ত জনতা দলের নেতা শারদ যাদব তখন রোজ লোকসভার বিরোধী দলনেতা সুষমা স্বরাজের সঙ্গে পরামর্শ করে সংসদ অচল করতেন। এখন বিজেপি’র সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর থেকে একই কাজ করছেন কংগ্রেসের সঙ্গে মিলে। শারদ যাদব বলেন, ‘তখন যদি বিজেপি’র সঙ্গে মিলে আমরা কংগ্রেসের মন্ত্রীদের পদত্যাগ দাবি করতে পারি তাহলে এখন কেন সেই দাবি করতে পারবো না? আমরা তো বলছি, সংসদে আমরা আলোচনা করতে চাই। কিন্তু তার আগে বিজেপি’র মন্ত্রীরা পদত্যাগ করুক। তিনি আরো বলেন, আমরা ভারত সরকার কিংবা কোনো রাজ্য সরকারের পদত্যাগ চাই না, যারা দোষী তাদের পদত্যাগ চাই।’ অন্যদিকে বিজেপি বলছে, পদত্যাগের তো প্রশ্নই নেই। মন্ত্রীরা নিষ্কলঙ্ক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেন, ‘আমরা তো আলোচনায় বসতে চাই। কিন্তু বিরোধীরা আলোচনায় আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।’ বহুজন সমাজ পার্টির মায়াবতী বলেন, ‘সংসদ চালাতে চাইলে সরকারের উচিত কলঙ্কের দাগ লাগা মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া।’
 
লোকসভার স্পিকার সুমিত্র মহাজন অধিবেশনের শুরুতে কংগ্রেস ও বামপন্থী সংসদ সদস্যদের অধিবেশন মুলতবির নোটিস বাদ দিয়ে কাজ শুরু করেন। এসময় বিরোধীরা হাতে কালো কাপড়ের ব্যান্ড বেঁধে সামনে গিয়ে বিক্ষোভ দেখান এবং হৈচৈ শুরু করেন। বিভিন্ন ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী মোদীর নীরবতারও সমালোচনা করেন বিরোধী এমপিরা। এরপর বিজেপি এমপিরাও পাল্টা স্লোগান দিলে হট্টগোল শুরু হয়। এরপরও অধিবেশন চালাতে চেষ্টা করেন স্পিকার। কিন্তু অবশেষে ব্যর্থ হয়ে তিনি আগামী সোমবার পর্যন্ত অধিবেশন মুলতবি করেন। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ‘এই হাউজ রেসলিং খেলার স্থান নয়, আলোচনার জায়গা এটা।’
 
লড়াইটা এখন আর শুধু সংসদেই সীমাবদ্ধ নয়। সংসদ অচল করে লড়াইটা চলছে বাইরে। বাইরেই রাহুল গান্ধী বলছেন, সুষমা অপরাধী। আর বাইরেই নীতিন গডকড়ি বলছেন, রাহুল ক্ষমা না চাইলে মামলা করব। আগে বিরোধী দল সংসদের গান্ধীর মূর্তির তলায় অবস্থান নিতো। এখনকার শাসক দল বিজেপিও কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রীদের পদত্যাগ দাবি করে সেখানে অবস্থান করেন। উল্লেখ্য, ক্রিকেট মোঘল ললিত মোদীর বিরুদ্ধে দেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ তাকে ব্রিটেন যেতে সহায়তা করেন বলে অভিযোগ আছে। এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ব্রিটেনের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে ভারতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ললিত মোদীর সঙ্গে রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজেরও গভীর সখ্যের বিষয়টি প্রকাশ হয়ে পড়ে। মধ্যপ্রদেশে শিক্ষা বিষয়ক কেলেঙ্কারি বায়াপমের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই কেলেঙ্কারির কারণে রহস্যজনকভাবে প্রায় ২৬ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। যদি বেসরকারি হিসাব মতে এই সংখ্যা ৪২ জন হবে।