কথায় বলে কারো পৌষমাস কারো সর্বনাশ। এরকমই পরিস্থিতি হয়েছে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যে অর্ধশতাধিক বছরের বৈরিতার অবসান ঘটায়। পুরনো শত্রুতার অবসান কিউবার জন্য করটা সুবাতাস নিয়ে আসবে সে নিয়ে যখন চলছে হিসাব-নিকাশ, তখন ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠেছে।
৫৬ বছর পর আমেরিকা ও কিউবার দূরত্ব কমায় সঙ্কটে পড়েছে ৩৫ সদস্য-দেশের পরিবার, ক্যারিবিয়ান হোটেল অ্যান্ড ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন বা সিএইচটিএ। সংগঠনটির আশঙ্কা, আমেরিকা ও কিউবার মধ্যে যাতায়াত অবাধ হলে তাদের দেশে পর্যটন ব্যবসা বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
এর কারণ হল ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের দেশগুলোতে এতদিন যত পর্যটক আসতেন তার শতকরা ৭০ ভাগই ছিলেন মার্কিন নাগরিক। কিন্তু জুন মাসে প্রকাশিত এক শ্বেতপত্রে সিএইচটিএ বলেছে, ‘আমেরিকা-কিউবার সুসম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে ক্যারিবিয়ান পুকুরে ৫০ বছরের মধ্যে সব থেকে বড় ঢিলটি ফেলা হল।’
সিএইচটিএ সদস্যদের মধ্যে আছে বারবাডোজ, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোব্যাগো, জ্যামাইকা, ডোমিনিকান রিপাবলিক, অ্যান্টিগা, গ্রেনাডা, সেন্ট লুসিয়া, কেম্যান আইল্যান্ডস ইত্যাদি। এই সব দেশের রাজস্বের সিংহভাগ আসে বেলাভূমি পর্যটন বা বিচ ট্যুরিজম থেকে। সিএইচটিএ’র ছাতার তলায় রয়েছে ১ হাজার ১০০ হোটেল।
তবে সিএইচটিএর প্রেসিডেন্ট এমিল লি এবং সিইও ফ্র্যাঙ্ক কোমিটো সদস্যদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘এ হল আমাদের ঘুম ভাঙার ডাক। একে এবার বিপদসঙ্কেত থেকে সুবর্ণ সুযোগে রূপান্তরিত করার দায়িত্বও কিন্তু আমাদেরই।’
কিভাবে এটা সম্ভব হবে? শীর্ষ কর্তারা মনে করছেন বিপণন বাড়িয়ে, ভিসা নিয়ে কড়াকড়ি কমিয়ে, আকাশপথে আসা-যাওয়া সংক্রান্ত কর এবং হোটেল খরচায় ছাড় দিলে কিউবার সঙ্গে জোরদার প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রের মধ্যে কিউবার স্থান হল ডোমিনিকান রিপাবলিকের পরেই।
গত বছর কিউবায় প্রায় ৩০ লক্ষ পর্যটক এসেছিলেন, যা ছিল তার আগের বছরের তুলনায় ৫ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে মার্কিন পর্যটকের সংখ্যা খুবই কম। কারণ দু’দেশের মধ্যে এত দিন বাণিজ্যিক ফ্লাইট বন্ধ ছিল। চার্টার্ড ফ্লাইট এবং শিক্ষামূলক ভ্রমণ, জনহিতকর কাজের মতো ১২ টি বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া দু’দেশের নাগরিকদের যাতায়াতে ছিল বিধিনিষেধ। এবার তা শিথিল হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, চলতি বছরেই ১৫ লাখ মার্কিন পর্যটক কিউবা ভ্রমণ করবেন। এর ফলে কিউবার রাজস্ব খাতে অতিরিক্ত ২০০ কোটি ডলার জমা পড়বে।
সিএইচটিএ’র ওই শ্বেতপত্রে আরও বলা হয়েছে, গত কয়েক বছরে কিউবা শুধু সিগার আর চিনি রপ্তানি করেই বসে থাকেনি। পর্যটনকে আকর্ষণীয় করে তুলতে তারা নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে অন্য দেশগুলোর স্বার্থ যাতে বিঘ্নিত না হয়, সেটাও তাদের দেখতে হবে।
কিউবার এই পদক্ষেপগুলো কী? এর মধ্যে যেমন রয়েছে সঠিক বিপণন, তেমন রয়েছে সফল ভাবে পরিচালিত পাঁচটি সরকারি হোটেল চেইন। এর পাশাপাশি রয়েছে কানাডা এবং ইউরোপের বেশ কিছু দেশের হোটেল ব্যবসায়ে লগ্নি। অন্য দিকে চলেছে পুরোনো প্রাসাদ এবং হাভানা বন্দরের আধুনিকীকরণ এবং একাধিক গলফ কোর্স নির্মাণ।
এই ব্যাপারে বিশেষ ভাবে উদ্যোগী হয়েছেন কিউবার বর্তমান প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রো। ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে কিউবা যেন সব পেয়েছির দেশ। রাজধানী হাভানা হল ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের বৃহত্তম শহর। এখানকার বহু কেল্লা ও গির্জার বয়স ৪০০ বছরেরও বেশি। পুরোনো হাভানা শহর এখন ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। শহরে ছড়িয়ে রয়েছে একাধিক ব্যালে স্কুল, সালসা নাচ, থিয়েটার ও ফিল্ম ক্লাব। রয়েছে ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বেলাভূমি। বাস, ট্যাক্সি ও সাইকেলে ভ্রমণ করলে পকেটে টান পড়বে না। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে এবং ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা তাদের লেখার প্রেরণা পেতেন এই হাভানা থেকেই।
সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, কিউবা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে দুই দেশের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে ঠিকই, কিন্তু ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের কোটি মানুষের কাছে তা কিছুটা হলেও অস্বস্তি টেনে এনেছে!
