ঢলের পানিতে ভাসছে কক্সবাজারের ২শ’ গ্রাম

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০১৫, ০১:০৬

টানা ভারী বর্ষণ ও মাতামুহুরী নদী দিয়ে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে ভাসছে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার দুই শতাধিক গ্রাম। অন্তত আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। পানিতে তলিয়ে গেছে বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি, বীজতলা ও চিংড়ি ঘের। পানিতে ডুবে অন্তত তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বান্দরবানের সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সমুদ্র বন্দরে ৩ নম্বর ও নৌ বন্দরে ২ নম্বর সতর্ক সংকেত থাকায় গতকাল রবিবার বেলা ১২টা থেকে আভ্যন্তরীণ নৌ-রুটে ৬৫ ফুটের নিচে সকল লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

 
চকরিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, শনিবার রাত থেকে উপজেলার আঠার ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকার দুইশ’ গ্রামের অন্তত আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার রূপ নিয়েছে। মাতামুহুরী নদীর প্রবল স্রোতে উপজেলার চিরিঙ্গা ইউনিয়নে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। পৌরশহর রক্ষাবাঁধের বড় একটি অংশ পানির চাপে ভেঙে যাওয়ায় ৮ নম্বর ওয়ার্ডের নামার কোচপাড়া, ভাঙারমুখ এলাকার কমপক্ষে শতাধিক বসতবাড়ি মুহূর্েত পানিতে তলিয়ে যায়। বানের পানিতে আটকা পড়ে উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নের একব্যক্তি ও পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ভরামুহুরীস্থ কলেরা হাসপাতাল এলাকায় বানের পানিতে ডুবে এক শিশু মারা গেছে। পানিতে ভেসে গেছে উপজেলার কয়েকশত চিংড়ি প্রকল্পের অন্তত শত কোটি টাকার মাছ। তলিয়ে গেছে বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি ও বীজতলা। চকরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর আলম জানান, বেশির ভাগ এলাকায় টিউবওয়েল পানিতে ডুবে থাকায় বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার চলছে।
 
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ সাহেদুল ইসলাম বলেন, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে উপজেলার বেশির ভাগ ইউনিয়ন বন্যা প্লাবিত হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতির চিত্র ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে।
 
রামু (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, রামু উপজেলায় ৫ দিনের প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বন্যা দেখা দিয়েছে। বাঁঁকখালী নদীর পানি দুইদিন ধরে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রবল বর্ষণে ডুবে গেছে মহাসড়ক, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ও অন্তত ২০ হাজার বসতবাড়ি। রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসুদ হোসেন জানান, উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রশাসন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রামু উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রিয়াজ উল আলম জানান, বিগত সময়ের ভয়াবহ বন্যায় উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় পুরো অঞ্চলটি অরক্ষিত হয়ে যায়, তাই বন্যার পানি সহসা নিম্নাঞ্চলে প্রবেশ করতে পারছে।
 
লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট , খালের বেড়িবাঁধ ও ফসলের ক্ষতি হয়েছে। বড়হাতিয়া এলাকায় গতকাল রবিবার সকালে মৃত নুরুজ্জামানের পুত্র কবির আহমদ ডিপজল (৫০) বিলে মাছ শিকারের জাল হতে মাছ আনতে গিয়ে পানিতে ঢলে পড়েন। স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসলে তিনি মারা যান।
 
অভ্যন্তরীণ রুটের লঞ্চ চলাচল বন্ধ
 
বরিশাল অফিস জানায়, সকাল থেকেই প্রবল বাতাসের সঙ্গে থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সারাদিনে সূর্যের দেখা মেলেনি। কালো মেঘে অন্ধকার হয়েছিলো পুরো দক্ষিণাঞ্চল। বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের উপ-পরিচালক আবুল বাশার মজুমদার জানান, সমুদ্র বন্দরে ৩ নং ও এখানকার নৌ বন্দরে ২ নম্বর সতর্ক সংকেত থাকায় গতকাল রবিবার বেলা ১২টা থেকে আভ্যন্তরীণ নৌ-রুটে ৬৫ ফুটের নিচে সকল লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সকল ধরনের নৌযান ও মাছ ধরার ট্রলারকে উপকূলের কাছাকাছি অবস্থান করতে বলা হয়েছে।
 
সেনবাগ (নোয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, টানা ভারী বর্ষণে গতকাল রবিবারও নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলা ও পৌরসভার আরো নতুন নতুন এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
 
সারা দেশের সঙ্গে বান্দরবানের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
 
বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, টানা বর্ষণে বান্দরবানের প্রধান সড়কে পানি জমে যাওয়ায় সারাদেশের সঙ্গে দ্বিতীয় দিনের মত সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। অবিরাম বর্ষণ ও ঢলে বান্দরবানে জেলা শহর, লামা, আলীকদম এবং নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় বহু মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। সাঙ্গু ও মাতামুহুরী দুইটি নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল রবিবারও সকাল থেকে বান্দরবানসহ আশপাশের এলাকায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত ছিল।
 
লামা (বান্দরবান) সংবাদদাতা জানান, বান্দরবানের লামা পৌর সদরসহ লামা উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। মাতামুহুরী নদীতে বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে অধিকাংশ এলাকা। প্রধান সড়কে উপর দিয়ে ৬-৭ ফুট পানির ধারা প্রবাহিত হচ্ছে।
 
রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি জানান, একটানা বর্ষণে রাঙ্গামাটির শহরের বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসে মানুষের বসতবাড়ি হুমকির মুখে পড়েছে। লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার কাজ শুরু হয়েছে।
 
ঝড়ে শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত
 
নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, ঝড় ও ভারী বর্ষণে জেলার সুবর্ণচর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ও আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে। গতকাল রবিবার সকালে বয়ে যাওয়া ঝড় ও ভারী বর্ষণে চর আমানউল্লাহ ইউনিয়নে সাতাসদ্রোন, নোয়াপাড়া, আমানউল্লাহ গ্রাম ও চর মজিদ এবং পূর্ব চরবাটা এলাকায় কাঁচা ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়।
 
ফুলগাজীতে পানি দ্রুত নামছে
 
ফেনী প্রতিনিধি জানান, ফুলগাজী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মফিজুর রহমান বলেছেন রবিবার সকাল থেকে ফুলগাজীতে মুহুরী ও কহুয়া নদীর পানি বিপদ সীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
 
হাতিয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত
 
হাতিয়া (নোয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, ভারী বর্ষণ ও সাগর উত্তাল থাকায় প্রবল জোয়ারের পানিতে হাতিয়া দ্বীপের অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
 
নাঙ্গলকোটে বন্যা
 
নাঙ্গলকোট (কুমিল্লা) সংবাদদাতা জানান, কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। বন্যায় উপজেলার সাতবাড়িয়া ইউনিয়নসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের হাজার হাজার পরিবারের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।
 
তানোরে আউশ ধানের ক্ষতি
 

রাজশাহী অফিস জানায়, কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা বন্যার পানিতে তানোরের নিচু এলাকার কয়েকশ’ একর জমির আউশ ধান তলিয়ে গেছে। এতে কৃষকরা অভাবনীয় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। উপজেলা কৃষি অফিস ও কৃষকরা জানায়, বিল কুমারী বিলের ধার ও নিম্ন এলাকায় রোপিত কয়েকশ’ একর জমির আউশ ধান বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।