রাজধানীতে জলাবদ্ধতা দুর্ভোগে নগরবাসী

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০১৫, ০০:৪৯

মৌসুমি বায়ুর কারণে ঢাকাসহ সারাদেশে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। বৃষ্টিতে রাজধানীজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। পানি জমে নগরীর অলিগলিসহ প্রধান সড়কগুলোতে জলাবদ্ধতার কারণে নগরবাসীর দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। এতে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানীর রায়ের বাজার এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে মারাত্মক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করেছে। অতি বৃষ্টির কারণে নিম্নাঞ্চলে গড়ে উঠা একাধিক বস্তির ভিতর পানি ঢুকে পড়েন। ইট ও বাঁশের সাহায্যে ঘরের চৌকি উঁচু করে কোন মতে জীবন যাপন করছেন শত শত দরিদ্র মানুষ। স্কুল, কলেজ ও অফিসগামী মানুষ বিপাকে পড়েছেন। অনেকে জুতা খুলে তা হাতে নিয়ে পথ চলতে বাধ্য হন।

 
এদিকে রামকৃষ্ণ মিশন রোডের পেয়াদা পাড়া মোড়ে জমে আছে হাঁটুপানি। ময়লাযুক্ত ওই পানি মাড়াতে গিয়ে চরম অসহায় বোধ করছেন অনেকে। জলাবদ্ধতা প্রতিবছরই হয়। দুর্ভোগও পিছু ছাড়ে না।
 
গত কয়েক দিন ধরে গুড়ি গুড়ি ও মাঝেমধ্যে ভারি বৃষ্টিপাত হওয়ায় জুরাইন, শ্যামপুর, পোস্তগোলা, খিলগাঁও, মাদারটেক, শেকের জায়গা, মধ্য বাড্ডা থেকে শুরু করে কুড়িল পর্যন্ত এলাকা, উত্তর বাড্ডা, আনন্দনগর, বাইদারটেক, সাঁতারকুল, নূরেরচালা, ছোলমাইদ, নর্দা, শাহজাদপুর, বড়কাঁঠালিয়া, জগন্নাথপুর, ভাটারা, ইস্টার্ন প্লাস বিপণিবিতানের সামনে, শান্তিনগর, মৌচাক, মালিবাগ, নয়াপল্টন, পুরানা পল্টন, বংশাল, কে এম দাস লেন, অভয় দাস লেন, দিলকুশা, শেরেবাংলা নগর, রামপুরা, পরীবাগ, মিরপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, শুক্রাবাদ, পুরান ঢাকার অনেক এলাকায় গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত জলাবদ্ধতা ছিল। এসব এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, বর্ষা শুরু হলেই রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কাজ শুরু করে দেয় ঢাকা ওয়াসা। এ সময় বৃষ্টি হলে পানি জমে জলাবদ্ধতাসহ সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হতে হয়। সামান্য বৃষ্টিতে রাজধানীর সড়কগুলো জলাশয়ে পরিণত হয়। পানি ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতরেও।
 
কর্তৃপক্ষ সঠিক সময়ে রাস্তা এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার না করার কারণেই পানি সরতে পারছে না। সৃষ্টি হচ্ছে স্থায়ী জলাবদ্ধতার।
 
ভুক্তভোগী আনোয়ার হোসেনের অভিযোগ, পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকা, জরাজীর্ণ রাস্তার সংস্কার না হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই এ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। রাজধানীজুড়ে সৃষ্ট এ জলাবদ্ধতায় ছিন্নমূল, শ্রমজীবী এবং অফিসগামী মানুষদেরই বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয়।
 
মতিঝিলের ব্যাংক কর্মকর্তা গোবিন্দ্র চন্দ্র দে বলেন, এ এলাকায় ব্যাংকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু সামান্য বৃষ্টি হলেই এলাকার মূল রাস্তাসহ বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। হাঁটু পর্যন্ত পানি জমে রাস্তায় এবং সেই পানি পার হয়েই সকলকে অফিসে যেতে হচ্ছে। এছাড়া বৃষ্টির কারণে অনেকের ব্যবসা-বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফুটপাতের খুচরা ব্যবসায়ীরা দোকান খুলতে পারেন না। আর যারা খুলেন তাদের তেমন বেচাকেনা নেই।
 
জলজটের নানা কারণ
 
নগরবিদ অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, একটি আধুনিক নগরে দু’ধরনের ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকা চাই-একটি বৃষ্টি ও গৃহস্থালির পানি নিষ্কাশনের জন্য, অন্যটি পয়ঃবর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য। কিন্তু ঢাকাসহ প্রধান নগরগুলোতে সে ব্যবস্থা নেই। ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান বলেন, শুধু বর্ষা নয়, যেকোনো সময় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হলে কিছু সময়ের জন্য জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবেই। কারণ বর্তমানে ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থায় ১০ থেকে ২০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন করা সম্ভব নয়। তবে তিনি জলজটের জন্য খাল দখল হয়ে যাওয়া, নদীগুলো খনন না করাসহ সিটি করপোরেশন ও রাজউকের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডকেও দায়ী করেন।
 
সহজেই ঢাকার জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব
 
ঢাকা মহানগরের জলাবদ্ধতা সহজেই দূর করা সম্ভব বলে মনে করেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. শহীদুল হাসান। তার মতে, ঢাকা নগরীকে যানজটমুক্ত করা হয়তো জটিল কিন্তু জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসীকে পুরোপুরি পরিত্রাণ দেয়া সম্ভব। ঢাকার পানি নিষ্কাশনের জন্য স্টর্ম ড্রেনেজ লাইনগুলো সব সময় পরিষ্কার রাখা ও ড্রেনেজ সিস্টেমগুলোর দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকা মহানগরের জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব। এর জন্য শুধু প্রয়োজন সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও সঠিক সমন্বয়।
 

ঢাকা সিটি করপোরেশন (উত্তর ও দক্ষিণ) সূত্রগুলো বলছে, নগরীর মাত্র ২৫ শতাংশ (১৪০ বর্গকিমি) এলাকা ওয়াসার ড্রেনেজ ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ঢাকার জন্য এ ব্যবস্থা নিতান্তই অপর্যাপ্ত। এমনকি ৮ কিলোমিটার বিস্তৃত বক্স কালভার্টের অধিকাংশই গড়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ অনেক খাল দখল করে। ফলে এখন নগরীতে ঘণ্টায় মাত্র ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলেই তা ড্রেনেজ কাঠামোর ধারণক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। ভূমির ওপর নির্মিত ২ হাজার ৪৬০ কিলোমিটার বিস্তৃত ড্রেনের অর্ধেকেরও বেশি ময়লা-আবর্জনা জমে বন্ধ রয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি জমে যাচ্ছে। ঢাকা ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এ ডি এম কামরুল আলম চৌধুরী জানান, সেগুনবাগিচা বক্স কালভার্টে দৈনন্দিন গৃহস্থালি ও বারোয়ারি বর্জ্য জমে শক্ত হয়ে অনেকটা অংশ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বৃষ্টি হলে আশপাশের এলাকায় পানি জমে। তবে ঢাকার কোথাও পানি বেশিক্ষণ জমে থাকে না।