যুবলীগ নেতা মিল্কী হত্যার দুই বছর

র‌্যাবের চার্জশিটভুক্ত ১১ আসামি

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০১৫, ০১:১৬

দুই বছরেও কুল-কিনারা হয়নি যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিলকী হত্যাকাণ্ডের তদন্ত। এমনকি শনাক্ত হয়নি জড়িত ও পরিকল্পনাকারীরা। ক্লু উদঘাটন করা যায়নি হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত সংস্থা র্যাবের দেয়া চার্জশিট ও তদন্তে অসঙ্গতির অভিযোগ এনে বাদী মেজর রাশেদুল হক খান মিলকীর (নিহত মিলকীর ছোট ভাই) আপত্তির কারণে নতুন করে তদন্ত করছে পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি)। বাদীর অভিযোগ,  মামলা নষ্ট করতে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়েছে। অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর গত ১ বছর ধরে মামলাটি সিআইডি তদন্ত করছে। তবে এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের ক্লু উদঘাটন ও জড়িতদের বিষয়ে স্পষ্ট কোন ধারণা নেই তাদের কাছে।

 
এ হত্যা মামলায় গতকাল মঙ্গলবার মতিঝিল এজিবি কলোনী এলাকা থেকে তানজিম মাহমুদ তানিম নামে এক যুবককে সিআইডি পুলিশ গ্রেফতার করেছে। সিআইডি তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেছে আদালতে। আগামী বৃহস্পতিবার রিমান্ডের শুনানির দিন ধার্য করেছে আদালত। 
 
এ হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার উত্তম কুমার বিশ্বাস জানান, গত ২৩ জুন তিনি মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন। এর আগে আরো দুইজন কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করেছেন। তারা অন্যত্র বদলি হওয়ায় এখন তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি জানান, সম্প্রতি মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা (র্যাবের কাছে তদন্তাধীন অবস্থায়) র্যাব-১-এর এএসপি কাজেমুর রশিদ সিআইডিতে এসেছেন। তিনি তার সময়ে তদন্তাধীন যেসব বিষয় পেয়েছেন তা সিআইডিকে জানিয়েছেন। এই মামলায় র্যাবের ১২ জনকে আসামি করে চার্জশিট দেয়া হয়। পরে মামলার বাদী আদালতে এ চার্জশিটের ব্যাপারে নারাজি দেন। সেখানে অভিযোগ  করা হয়, র্যাবের অভিযুক্ত ১২ জনের মধ্যে মাত্র ৫ জন এ হত্যার সঙ্গে জড়িত। বাকি ৭ জন জড়িত নয়। যারা জড়িত এ ব্যাপারে সন্দেহভাজনদের একটি তালিকা র্যাবের কাছে দেয়া হয়েছিল। র্যাব ঐসব আসামিকে আটক না করে এ চার্জশিট দিয়েছে। এ কারণে বাদীর দেয়া তালিকার ঐ ৭ জনকে আটক করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়া এই মামলায় হত্যার পেছনে পরিকল্পনাকারী বা নেপথ্যের নায়কদের খোঁজা হচ্ছে। ঘটনাটি খুব গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে শিগগির চার্জশিট দেয়া হবে।
 
সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, এ মামলা তদন্ত করতে ৩টি বিষয়ে র্যাবের কাছে চিঠি দিয়েছে সিআইডি। এগুলো হলো- নিহত রিয়াজুল হক খান মিলকীর ব্যবহূত মোবাইল ফোনের সিডিআর, (কললিস্ট যাচাই ডকুমেন্ট), র্যাবের বন্দুকযুদ্ধে নিহত তারেকের জবানবন্দি ও নিহত মিলকীর ব্যবহূত মোবাইল ফোন মামলার বাদীর কাছ থেকে নেয়ার পর তা সিজার লিস্টে উঠানো হয়েছে কিনা সে তথ্য প্রমাণের কাগজ। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত ২টি পাজেরো গাড়ি, ১টি প্রাইভেটকার ও ২টি মোটর সাইকেলের মালিকানা যাচাইয়ের জন্য বিআরটিএতে চিঠি পাঠিয়েছে সিআইডি। র্যাব এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে কিনা তার কোন নথি র্যাবের দেয়া চার্জশিট অথবা মামলার নথিতে উল্লেখ নেই।
 
সিআইডির মামলা তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এ হত্যার ঘটনায় র্যাবের হাতে গ্রেফতার ১১ জন বর্তমানে জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে গেছেন। এদের মধ্যে মিলকীর গাড়ি চালক মারুফ রেজা সাগরের স্ত্রী ফাহিমা ইসলাম লোপা দেশের বাইরে ভারতে আত্মগোপন করেছেন। সিআইডির একটি সূত্র জানায়, লোপা তার সকল সম্পদ বিক্রি করে দিয়ে বাইরে চলে গেছেন।
 
মামলার বাদী রাশেদুল হক খান মিলকী সিআইডির কাছে অভিযোগ করেছেন যে, হত্যার ঘটনায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়া আসামিরা এখন সবাই জামিনে। হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল ও ওয়াহিদুল আলম আরিফ দেশ ছেড়ে পালিয়ে আমেরিকায় রয়েছেন। তাদের গ্রেফতারের কোন উদ্যোগ নেই। এমনকি মিলকীকে যে গুলি করেছিল সেই আমিনুলও জামিন পেয়ে দেশের বাইরে আত্মগোপন করেছেন।
 
সিআইডি সূত্র জানায়, ২৯ জুলাই গুলশান-১ নম্বরে সপার্জ ওয়ার্ল্ডের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় যুবলীগ নেতা রিয়াদুল হক খান মিলকীকে। এ হত্যাকাণ্ডের পরপরই ঐ মার্কেটের সিসি টিভির ফুটেজ পর্যালোচনা করে মিলকীর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর যুবলীগের জাহিদ সিদ্দিকী তারেককে গ্রেফতার করে র্যাব। ঘটনায় মিলকীর ছোট ভাই রাশেদুল হক খান বাদী হয়ে ১১ জনের নাম উল্লেখ করে গুলশান থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ঐ মামলায় আসামি করা হয় যুবলীগ নেতা এসএস জাহিদ সিদ্দীকি তারেক, তুহিনুর রহমান ফাহিম, সৈয়দ মোস্তফা আলী রুমি, শাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল, মো. সোহেল, জাহাঙ্গীর মণ্ডল, জাহিদুল ইসলাম টিপু ও ওয়াদুল আলম আরিফ, রাশেদ মাহমুদ, সাইফুল ইসলাম ওরফে নুরুজ্জামান ও সুজন হাওলাদারকে। এর মধ্যে র্যাব গ্রেফতার করে ফাহিমা ইসলাম লোপা, জাহাঙ্গীর মণ্ডল, শাহিদুল ইসলাম, আমিনুল ইসলাম ওরফে আরিফ, সোহেল মাহমুদ, চুন্নু মিয়া, মো. আরিফ, ইব্রাহিম খলিল উল্লাহ, রফিকুল ইসলাম চৌধুরী এবং শরীফ উদ্দিন চৌধুরীকে। র্যাব এই ১১ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার চার্জশিটও দেয়। তবে বাদীর এজাহারনামী আসামি থেকে বাদ যায় তুহিনুর রহমান ফাহিম, সৈয়দ মোস্তফা আলী রুমি, রাশেদ মাহমুদ, সাইফুল ইসলাম ওরফে নুরুজ্জামান, সুজন হাওলাদার,  জাহিদুল ইসলাম টিপু ও ওয়াহিদুল আলম আরিফ।
 
সূত্র আরো জানায়, নারাজি পিটিশনে বাদীর অভিযোগ ছিল, র্যাব এজাহারে থাকা মূল ৭ আসামিকে বাদ দিয়ে চার্জশিট দিয়েছে। এছাড়া যাদের গ্রেফতার করেছে তাদের ভালোভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। হত্যাকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম মতিঝিলে জমি বিরোধের কারণ চার্জশিটে বলা হয়নি। একই সঙ্গে আসামিদের টেস্ট আইডেন্টিফিকেশন (টিআই প্যারেড) করা হয়নি। টিআই প্যারেড হলো সাক্ষীদের সামনে আসামিদের শনাক্তকরণ মহড়া। হত্যাকাণ্ডের সময় মূল আসামিকে গ্রেফতার করা হলেও পরে সে বন্দুকযুদ্ধে মারা যায়। কিন্তু আহত অবস্থায় গ্রেফতার করার পর তার কাছে কোন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেয়া হয়নি। ঐ জবানবন্দি থাকলে হত্যাকাণ্ডের ক্লু সম্পর্কে অনেক উত্তর পাওয়া যেত।
 
এ ব্যাপারে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার উত্তম কুমার জানান, র্যাব যে ১১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছিল তাদের মধ্যে লোপা জামিন নিয়ে পালিয়ে গেছেন। বাকি ১০ আসামীকে পুনরায় আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এছাড়া র্যাবের চার্জশিট থেকে বাদ পড়া এজাহারনামীয় আসামি টিপু, বাবু ও এনামুল হককে গ্রেফতার করে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। কিন্তু হত্যার সঙ্গে তারা নিজেদের সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তারা বলেছে, হত্যাকারীদের সঙ্গে মিলকীর রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল। হয়তো আধিপত্য বিস্তার নিয়েই এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
 
তিনি আরো জানান, আসামিদের টিআই প্যারেড করার জন্য আদালতে একটি আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু আদালত সে আবেদন গ্রহণ না করায় তা নেয়া আর সম্ভব হয়নি। টিআই প্যারেডটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল এ মামলার জন্য। কারণ ঐ সময় মিলকীর গাড়িচালক ও মার্কেটের নিরাপত্তাকর্মীরা (সাক্ষী) বলেছিল তারা আসামিদের সামনাসামনি দেখলে চিনতে পারবে। ঐ সময় আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করা আসামিরাও এখন জামিনে আছেন। কয়েকজন পলাতক রয়েছেন।
 

সূত্র জানায়, যুবলীগ নেতা চঞ্চল ও আরিফ বর্তমানে আমেরিকায় অবস্থান করছেন। আর ভারতে আত্মগোপন করা লোপার স্বামী মিলকীর গাড়িচালক সাগর ফকিরাপুল এলাকায় এখনও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।