জেলা পরিষদ নির্বাচন সক্রিয় বিবেচনায়

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০১৫, ০০:০০

জেলা পরিষদ নির্বাচনের বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন গতকাল বুধবার এ কথা বলেছেন। তিনদিনের জেলা প্রশাসক সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে নিজ মন্ত্রণালয়ে ডিসিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য প্রকাশ করেন।

 
প্রসঙ্গত, বর্তমানে জেলা পরিষদগুলোতে অনির্বাচিত সরকার মনোনীত প্রশাসক রয়েছেন। এদের মেয়াদ আইনী কাঠামোতে অনির্দিষ্ট। তবে ইতিপূর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেলা পরিষদের নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বলেছিলেন। যদিও বিষয়টি বেশিদূর এগোয়নি। মন্ত্রীর এ বক্তব্যের পর ধারণা করা হচ্ছে জেলা পরিষদে অনির্বাচিত প্রশাসকের অবসান হতে চলেছে।
 
সচিবালয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে ডিসিদের সঙ্গে ৩৯টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের তথ্য আদান-প্রদান চলছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসেইন ভূইঞা সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করছেন। গতকাল পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, ভূমি, প্রবাসী কল্যাণ, পররাষ্ট্র, শিল্প, বাণিজ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ, খাদ্য, বিদ্যুত্ বিভাগ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, কৃষি, পানি সম্পদ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ডিসিদের মতবিনিময় হয়। এতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী , উপমন্ত্রী এবং সচিবরা উপস্থিত ছিলেন।
 
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তার বক্তব্যে সুপেয় পানি নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। তার মতে, গভীর-অগভীর নলকূপের মাধ্যমে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে গিয়ে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। বিকল্প হিসাবে জরুরিভাবে গ্রামগঞ্জের অব্যবহূত পুকুর সংস্কার এবং নতুন নতুন জলাধার নির্মাণ করে পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। তিনি বলেন, গভীর-অগভীর নলকূপের মাধ্যমে সুপেয় পানিও নিশ্চিত হচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে আর্সেনিকসহ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অনেক উপাদান শরীরে প্রবেশ করছে। রোগ-বালাই ছড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
 
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ডিসিদের প্রস্তাব অনুযায়ী পৌরসভাগুলোতে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিতে ডিসির কোন প্রতিনিধি রাখা যুক্তিযুক্ত হবে বলে মত দেন। বৈঠকে স্থানীয় সরকার বিষয়ে মোট ১৭ দফা প্রস্তাবনা উত্থাপন করা হয়। পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের পক্ষ থেকে  বলা হয় প্রধানমন্ত্রীর দারিদ্র্য বিমোচনে অগ্রাধিকার প্রকল্প হচ্ছে একটি বাড়ী একটি খামার। এই প্রকল্প কমিটিতে জেলা প্রশাসকরা সভাপতি। প্রকল্পের সার্বিক কার্যক্রম তদারকিতে ডিসিদের ভূমিকা রাখার কথা বলেন মন্ত্রী। 
 
পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়:পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ডিসিদের উদ্দেশ্যে বলেন, বর্তমানে বিশ্বায়নের ফলে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক পরিবেশগত সমস্যাই বিশ্বে এক নম্বর সমস্যা। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াই আমাদের লক্ষ্য। তিনি বলেন, বিশ্বায়নের বিরূপ পরিস্থিতি যাদের দ্বারা সৃষ্ট এর আর্থিক ক্ষতি তাদেরকেই পুষিয়ে দিতে হবে। তিনি বলেন, ডিসিদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। অনেক আইন-কানুন প্রয়োগেও সমস্যা হয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে সাধ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে জনসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
 
পরিবেশ মন্ত্রী বলেন, একদিনে সব সমস্যার সমাধান হবে না। অনেক ইটভাটা পরিবেশের সমস্যা করে। কিন্তু রাতারাতি পরিবেশবিমুখ ইটভাটা তুলে দেয়া হলে অবকাঠামোর উন্নয়ন থেমে যাবে। সেদিকে লক্ষ্য রেখে পর্যায়ক্রমে পরিবেশ সম্মত ইটভাটা তৈরিতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে পরামর্শ দেন মন্ত্রী।
 
মন্ত্রী বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠ ক্রমেই উঁচু হচ্ছে। তাপমাত্রার হেরফের ঘটছে। মন্ত্রীর বিবেচনায় গড়ে তাপমাত্রা দেড় থেকে দু্ই ডিগ্রি সেলসিয়াস কমিয়ে রাখতে হবে। এ জন্য প্রচুর গাছ লাগানো একটি উপায় হতে পারে। তিনি সুন্দরবন সুরক্ষার উপরও জোর দেন। ডিসিরা পরিবেশ আদালতের পরিধি বাড়ানোর সুপারিশ করেন।
 
পরিবেশ সংরক্ষণ আইন সংশোধন করা সম্পর্কিত ডিসিদের সুপারিশ প্রসঙ্গে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, বিষয়টি মন্ত্রণালয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবে। সম্ভব হলে এটি মোবাইল কোর্ট আইনের তফশীলে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা নেয়া হবে। মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবও বক্তব্য দেন।
 
শিল্প মন্ত্রণালয়: দেশের বিভিন্ন জেলায় বিদ্যমান খালি শিল্প প্লট যথাযথভাবে বরাদ্দের বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা চেয়েছেন জেলা প্রশাসকরা। শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু সাংবাদিকদের জানান, বৈঠকে জেলা প্রশাসকরা দেশের বিভিন্ন জেলায় বিদ্যমান খালি শিল্প প্লট যথাযথ বরাদ্দের বিষয়ে আমার নির্দেশনা চেয়েছেন। যেমন- মৌলভীবাজারে একটি মত্স্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া কোন্ জেলার কোথায়, কী ধরনের শিল্প কারখানা গড়ে তোলা উচিত সে বিষয়েও তারা দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি বলেন, খালি শিল্প প্লটের বিষয়টি সরকারের নজরে রয়েছে। এগুলো বরাদ্দের উদ্যোগ নেয়া হবে।’
 
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়: রপ্তানি বাড়াতে জেলা ভিত্তিক অন্তত একটি পণ্য চিহ্নিত করার জন্য জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। চলমান জেলা প্রশাসক সম্মেলনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এ নির্দেশনা দেন।
 
বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, বৈঠকে রপ্তানি বাড়ানো, রফতানি পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণের বিষটির ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। ‘এক জেলা এক পণ্য’ এই নীতির আলোকে জেলা প্রশাসকদের তাদের জেলায় একটি রপ্তানিযোগ্য পণ্য চিহ্নিত করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। গত দুই বছর রমজান মাসে দেশের সকল জেলায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখা ও দেশকে ফরমালিনমুক্ত করার বিষয়ে জেলা প্রশাসকরা কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন। এ জন্য আমি তাদের ধন্যবাদ জানিয়েছি। এছাড়া ভেজালমুক্ত পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসকদের সহায়তায় সারাদেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কমিটি গঠন করা হয়েছে। ভেজাল পণ্য সরবরাহের অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৬ হাজার ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৩ কোটি টাকার অধিক জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
 
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বিভিন্ন সমস্যাগুলো স্থানীয়ভাবে সমাধানের জন্য জেলা প্রশাসকদের সুযোগ দেয়ার কথা ভাবছে সরকার। জেলা প্রশাসক সম্মেলনে পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কার্য অধিবেশন শেষে সাংবাদিকদের একথা বলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী। 
 
তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বাংলাদেশের জেলা প্রসাশক ও ভারতের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের মধ্যে নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তাই স্থানীয় নানা সমস্যার সমাধান স্থানীয়ভাবে করা গেলে আমাদের জন্য সুবিধা হবে।
 
তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে আরো অনেকগুলো সীমান্ত হাট হচ্ছে। বিভিন্ন সীমান্তে যেখানে রেলওয়ে সংযোগ ছিল, সেগুলো আবার চালু করা হচ্ছে, আগরতলার সঙ্গে নতুন সড়ক-রেল যোগাযোগ, ত্রিপুরা থেকে বিদ্যুত্ আমদানি, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থীসহ চলমান নানা সমস্যার বিষয়ে জেলা প্রসাশকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
 

পররাষ্ট্র মন্ত্রী বলেন, বিদেশ প্রবাসীরা মৃত্যুবরণ করলে তাদের লাশ দ্রুত দেশে আনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি বলেন, বৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে স্বল্প অভিবাসন ব্যয়ে শ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। আশা করি এবার অবৈধভাবে সাগরপথে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা কমে যাবে।