টানা বর্ষণের কারণে দেশের বিভিন্নস্থানে বন্যাকবলিত মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। এখনো কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে আছে। ধসে পড়ছে কাঁচা ঘর। হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। শত শত খামারের মাছ ভেসে গেছে বন্যার পানিতে। ফরিদপুর, বাগেরহাটসহ কয়েকটি এলাকার বাঁধ ভেঙে গেছে, এতে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে ওই সব এলাকার মানুষ। ব্যুরো অফিস ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর।
খুলনা অফিস জানায়, জেলার নয়টি উপজেলার দেড়শতাধিক গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এসব গ্রামের বিদ্যাপীঠসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জলমগ্ন। স্থানীয় নদ-নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ৩/৪ ফুট উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে। অপরদিকে হাজার হাজার হেক্টর জমির রোপা আমনের বীজতলা ও সবজি ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। ডুমুরিয়া উপজেলার অধিকাংশ ইউনিয়নের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। অসংখ্যা কাঁচা ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে। সদরসহ অধিকাংশ গ্রামীণ রাস্তাঘাট এখন পানির নিচে। এ উপজেলায় ১৬ হাজার গলদা, ৮ হাজার বাগদা, ৫ হাজার পুকুর, সরকারি সাহায্যপুষ্ট ২৩টি মাছের খামার ও ব্যক্তি মালিকানাধীন ৫৩টি সাদা মাছের ঘের রয়েছে।
পাইকগাছা উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। উপজেলার দশটি ইউনিয়নের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে চাঁদখালী ইউনিয়নে। বর্তমানে এই ইউনিয়নের ২০টি গ্রামের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দী। জলাবদ্ধতার কারণে এই ইউনিয়নের অসংখ্য কাঁচা ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে ।
সুন্দরবন সংলগ্ন কয়রা উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের প্রায় ৫০টি গ্রাম ও বিল পানির তলে। এই উপজেলার নদী-খালে বাঁধ ও পাটা দিয়ে মাছ চাষ করায় বিলের পানি সুষ্ঠুভাবে নিষ্কাশন হতে পারছে না। এতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ১০ হাজার হেক্টর জমির আমন বীজতলা পানিতে তলিয়ে গেছে।
এছাড়া বটিয়াঘাটা, রূপসা, তেরখাদা ও দিঘলিয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ও বিল জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে।
বাঘা (রাজশাহী) সংবাদদাতা জানান, পদ্মায় দিন দিন বেড়ে চলেছে পানি। সেই সাথে আতঙ্কের ছাপ পড়ছে বাঘার চর রাজাপুর (নতুন) ইউনিয়নের প্রায় ১৫ হাজার মানুষের। অনেকে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। এখানকার বহু আবাদি ফসল ইতিমধ্যে ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে।
লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে লোহাগাড়ার অর্ধশতাধিক সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা কৃষিবিভাগ জানায়, উপজেলায় ২০ হেক্টরের অধিক সবজি ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। উপজেলা প্রকৌশলী প্রতিপদ দেওয়ান জানান ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো বর্তমান অর্থবছরে সংস্কার করা হবে।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, জেলায় বন্যায় কৃষিখাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঘরে তোলার আগ মুহূর্তে আউশ ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ক্ষতি হয়েছে আমনের বীজতলা। মৌসুমি সবজিও বন্যার পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। এতে দরিদ্র কৃষকরা জীবন ধারণ নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। কৃষি অধিদপ্তর জানায়, চট্টগ্রামে ১৪ হাজার হেক্টর আউশ ও ৪ হাজার হেক্টর আমনের বীজতলা পানিতে ডুবে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফরিদপুর প্রতিনিধি জানান, জেলার ডিক্রীরচর ইউনিয়নের ধলারমোড় এলাকায় ফের ধসে গেছে পদ্মানদীর তীরে করা শহর রক্ষা বাঁধের প্রায় ১০০ মিটার। ধসের ঘটনায় আতংকিত নদীপাড়ের বাসিন্দারা। বুধবার ভোরে শহর রক্ষা বাঁধের বিশাল অংশে ফাটল দেখতে পায় এলাকাবাসী।
বাবুগঞ্জ (বরিশাল) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার আগরপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ চরফতেপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের টিনশেডের ভবন ধসে পড়েছে। ফলে মঙ্গলবার থেকে ওই স্কুলের পাঠদান বন্ধ রয়েছে। স্কুলটির সহকারী শিক্ষক মো. মিজানুর রহমান জানান, স্কুলটিতে দু’শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে।
নাঙ্গলকোট (কুমিল্লা) সংবাদদাতা জানান, বন্যায় উপজেলার অর্ধলক্ষাধিক লোক পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বন্যাকবলিত এলাকার লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন। ডাকাতিয়া নদী তীরবর্তী ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শত-শত মত্স্য প্রজেক্টের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। উপজেলা শিক্ষা অফিস ৩৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে বন্যা কবলিত ঘোষণা করে সাময়িক পরীক্ষা স্থগিত করেছে।
বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে জেলার পাঁচটি উপজেলায় সাতটি পয়েন্টে বাঁধের ৫১০ মিটার ভেঙে গেছে। বিভিন্ন এলাকায় আরো ৬০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ অধিক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ দ্রুত মেরামত করা না হলে যে কোন সময়ে ভেঙে একের পর এক গ্রামে জোয়ারের পানি ঢুকে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা গ্রামবাসীর। বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইনদ্দীন বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভাঙন কবলিত এলাকার বাঁধে জরুরি ভিত্তিতে মেরামতের কাজ শুরু করা হয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে বরাদ্দের প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।
চকরিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার একাধিক বদ্ধ জলমহালের স্লুইস গেট বন্ধ থাকায় মাতামুহুরী নদীতে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার পানি সহজে নামতে পারছে না। এ অবস্থার ফলে গত তিনদিন ধরে উপকুলীয় অঞ্চলের মানুষ ভাসছে বানের পানিতে।
এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বন্যা কবলিত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে সহায়তার জন্য ১১ হাজার ম্যাট্রিকটন চাল ও ছয় কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ দিয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর জেলা প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী এ বরাদ্দ থেকে অর্থ ও চাল দিচ্ছে। গতকাল এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়েছে।
