দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ছোট্ট জেলা মাগুরা। এখানে দু’টি সংসদীয় আসন। দু’টি আসনই আওয়ামী লীগের দখলে। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাগুরা-১ আসনের এমপি ডা. এম এস আকবর আকস্মিকভাবে কিছুদিন আগে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর গত ৩০ মে উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব:) এটিএম আব্দুল ওয়াহাব এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট বীরেন শিকদার বর্তমানে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী। মাগুরা শহরেই বাড়ি প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-২ সাইফুজ্জামান শিখরের। মাগুরায় সংসদীয় আসন দু’টি হলেও এমপি এখানে আছেন তিনজন। অপরজন সাইফুজ্জামান শিখরের বড় বোন কামরুল লায়লা জলি। তিনি সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য।
তবে মাগুরায় গ্রহণযোগ্য নেতার সংকট রয়েছে। জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি এ্যাডভোকেট আছাদুজ্জামান এমপি এবং সাবেক সভাপতি ও পৌর মেয়র আলতাফ হোসেনের মৃত্যুর পর আর কোন নেতা মাগুরায় সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি। বর্তমানে মাগুরার আওয়ামী লীগ দুইভাগে বিভক্ত। এ কারণে ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা নির্বাচনে অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হয়েছে। কয়েকজনের নিশ্চিত জয়ও হাতছাড়া হয়েছে।
মাগুরায় একেবারে ছোট কাজগুলোতেও ইদানিং বড়রা হস্তক্ষেপ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এক লাখ টাকার টেন্ডারও তাদের নজর এড়িয়ে যেতে পারছে না। আর উন্নয়ন বরাদ্দের অর্থ লুটপাট তো আছেই। আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে এখানে রয়েছে নানা অভিযোগ। গত বৃহস্পতিবার ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে শহরের দোয়ারপাড় কারিগরপাড়ায় অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ নাজমা খাতুন ও তার পেটের সন্তান গুলিবিদ্ধ হয়। বোমা ও গুলিতে মমিন ভুঁইয়া গুরুতর আহত হন। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ছাত্রলীগ কর্মী মিরাজ শেখ আহত হন। চিকিত্সকদের অনেক চেষ্টা করেও বোমা ও গুলিতে আহত মমিন ভুঁইয়াকে (৬৫) বাঁচানো যায়নি। গত শুক্রবার রাত একটার তিনি মারা যান। এ ছাড়া ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে চিকিত্সাধীন গুলিবিদ্ধ নবজাতকের অবস্থা সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন চিকিত্সকরা।
এদিকে মাগুরা সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদের উপ-নির্বাচন গত ২১ জুলাই অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে গ্রুপিংয়ের কারণে আওয়ামী লীগের কোন একক প্রার্থী ছিল না। নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী রুস্তম আলী। জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবু নাসির বাবলু নির্বাচনে পরাজিত হন। গত বৃহস্পতিবার এই দুই নেতার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে নান্নু শেখ (৪৫) নামে একজন নিহত হয়েছেন। শত্রুজিত্পুর ইউনিয়নের রুপদহ সুন্দরপুর গ্রামের এই ঘটনায় আরো অন্তত ১৭ জন আহত হন। নিহত নান্নু শেখ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকলাসের সমর্থক ছিলেন। ইকলাস আবু নাসির বাবলুর পক্ষে কাজ করেছিলেন। হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আছাদুজ্জামান নামে আহত একজন বলেন, ‘নির্বাচন পরবর্তী সময়ে জয়-পরাজয় নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। বৃহস্পতিবার সকালে রুস্তম আলীর সমর্থক সালামের লোকেরা নান্নু শেখকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে ও তার সমর্থিত লোকদের বাড়ি ঘরে ভাংচুর-লুটপাট চালায়। এরপর সংঘর্ষ বেধে যায়।
এছাড়া জেলা আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা রয়েছেন যারা নিজেদের কর্মী সমর্থকদের নিয়ে নিজ নিজ অফিসে বসেন। অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ কর্মী সমর্থকদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। ১৯৯৪ সালে জেলা আওয়ামী লীগের তত্কালীন সভাপতি অ্যাডভোকেট আছাদুজ্জামান এমপির মৃত্যুর পর এখানে আলোচিত নির্বাচন হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী কাজী সালিমুল হক নির্বাচিত হন। আসাদুজ্জামানই ছিলেন মাগুরার মানুষের জনপ্রিয় নেতা। সেই আদর্শ থেকে বিচ্যুত্ হয়েছে অনেকেই।
বিগত পৌর নির্বাচনে জেলার একমাত্র পৌরসভায় আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মরহুম আলতাফ হোসেন বিপুল ভোটে পৌর মেয়র নির্বাচিত হন। তার মৃত্যুর পর উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একক প্রার্থী দিতে ব্যর্থ হলে উপ-নির্বাচনে পৌর মেয়রের পদটি আওয়ামী লীগের হাত ছাড়া হয়। এখানেও কাজ করে জেলার প্রভাবশালী নেতাদের দ্বন্দ্ব। অথচ আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থীর ভোট বিজয়ী প্রার্থীর চেয়ে অনেক বেশি ছিল । এমনকি মাগুরা সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদের উপ-নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ একক প্রার্থী দিতে পারেনি। যদিও এখানে বিএনপির শক্তিশালী কেউ না থাকায় এ যাত্রায় পার পেয়েছেন রুস্তম আলী। মাগুরার রাজনীতির ব্যাপারে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী এ্যাডভোকেট বীরেন শিকদারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে জেলা বিএনপির মধ্যেও রয়েছে গ্রুপিং। রয়েছে দু’টি শক্তিশালী গ্রুপ। ফলে সরকার বিরোধী আন্দোলন তারা করতেই পারেনি। জেলা বিএনপির একটি অফিস দীর্ঘদিন বন্ধ। অনেক নেতাকর্মীর নামে মামলা থাকায় দলীয় কর্মকাণ্ডে কেউ অংশ নেন না। শহরে প্রচারিত রয়েছে অনেক নেতা সরকারি দলের সঙ্গে আতাত করে চলছেন। বিএনপির দলীয় কর্মকাণ্ড এখন অনেকটা স্থবিরতা চলছে। প্রকাশ্যে কোন কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায় না। অন্যদের অবস্থাও খুবই নাজুক।
আগামীকাল পড়ুনঃ উৎপাদন বেড়েছে ধানের, ঘুরে দাঁড়াচ্ছে অর্থনীতি।
