বিশ্বের সর্ববৃহত্ গণতান্ত্রিক যে দেশ পরিচিত সেই দেশের পার্লামেন্টের অচলাবস্থা কাটছে না। চলতি বর্ষাকালীন অধিবেশনে এখন পর্যন্ত একদিনও কাজ হয়নি। সেই ঐতিহ্য বজায় রেখে গতকাল শুক্রবারও প্রায় কোনো কাজই হয়নি সংসদের দুই কক্ষে। সংসদের টেবিলে উত্থাপিত হয়নি গুরুত্বপূর্ণ কোনো ফাইলও। ফলে সরকার এবং বিরোধীদের অনড় অবস্থানের কারণে দেশটির গণতন্ত্র যেন স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। সংসদকে সচল করতে প্রধানমন্ত্রী মোদী সরকার আজ আবার সর্বদলীয় বৈঠকের ডাক দিয়েছেন। তবে গতকাল শুক্রবার স্পিকারের উদ্যোগে ডাকা সর্বদলীয় বৈঠক ব্যর্থ হয়। গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে পার্লামেন্ট অচল হয়ে পড়েছে।
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে কালামের মৃত্যুর কারণে স্থগিত করা পার্লামেন্টের লোকসভার অধিবেশন তিন দিন পর গতকাল সকাল ১১টায় শুরু হয়। স্পিকার সুমিত্রা মহাজন সংসদের অধিবেশন চালানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। কিন্তু কংগ্রেস এমপি সংসদে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন যাতে দাবি করা হয়, সাবেক আইপিএল প্রধান ললিত মোদী ইস্যুতে সুষমা স্বরাজের ভূমিকায় প্রধানমন্ত্রী মোদীকে পার্লামেন্টে বিবৃতি দিতে হবে। এ সময় কংগ্রেসের এমপিকে প্ল্যাকার্ড নামিয়ে ফেলার অনুরোধ করেন স্পিকার। স্পিকার বলেন, আমি আপনাকে প্ল্যাকার্ড নামাতে বলছি, আমি আপনার নাম প্রস্তাব করবো, আপনি বলবেন, আপনি যা করছেন সেটা আইন বিরুদ্ধ। কিন্তু স্পিকারের কথায় কর্ণপাত করেননি ওই এমপি। রাজ্যসভায়ও কংগ্রেস একই দাবি করে এবং অধিবেশন অচল হয়ে পড়ে।
সোনিয়া গান্ধীকে কটাক্ষ, স্পিকারে সর্বদলীয় বৈঠক, সব দলের সঙ্গে বৈঠকের আশ্বাস এতকিছুর পরও সংসদ চলার ইঙ্গিত মিলেনি। বরং আজও শনিবারও সংসদ চলতে দেয়া হবে না বলে জানিয়ে কংগ্রেসের মল্লিকার্জুন খার্গে বলেছেন, অতীতে বিজেপি যেভাবে বিরোধিতা করে সংসদ অচল করে এসেছিল, আমরাও সেই পথ নিয়েছি।
গুরদাসপুর অস্ত্রে কংগ্রেসকে কোণঠাসা করে সংসদ সচল করার কৌশল নিল নরেন্দ্র মোদী সরকার। রাজ্যসভায় গতকাল গুরদাসপুরে সন্ত্রাসবাদী হানা নিয়ে বিবৃতি দেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। কিন্তু রাজনাথ যতক্ষণ বিবতি দিয়েছেন, সেই পুরো সময়টাই কংগ্রেস সাংসদরা বিক্ষোভ দেখান এবং ‘নরেন্দ্র মোদী হায় হায়’ বলে স্লোগান দিয়ে যান। ফলে রাজনাথের বিবৃতির পর রাজ্যসভায় ওই সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ নিয়ে কোনও আলোচনা হয়নি এবং কংগ্রেসের বিক্ষোভের জেরে রাজ্যসভা মুলতুবি করে দেন ডেপুটি চেয়ারম্যান পি জে কুরিয়েন। কিন্তু এরপর কংগ্রেসের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চেয়ে রাজ্যসভার নেতা ও কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি সংসদ ভবন চত্বরে বলেন, ‘গুরদাসপুরের সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের পিছনে আছে সীমান্তপারের সাহায্য। তাই পুরো দেশ এক হয়ে তার মোকাবিলা করবে, সংসদে তার আলোচনা হবে, বিরোধীরা প্রশ্ন করবে, এটাই প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু কংগ্রেস দেশের সুরক্ষা নয়, নিজেদের তুচ্ছ রাজনীতিকে প্রাথমিকতা দিয়েছে। তাই তারা সংসদ চলতে দেয়নি। সোনিয়া গান্ধীকে জানাতে হবে, কেন তার দল গুরদাসপুর নিয়ে আলোচনা হতে দিল না?’
রাজ্যসভায় কংগ্রেস যেভাবে রাজনাথের বিবৃতির সময়েও বিক্ষোভ দেখিয়ে গিয়েছে, তাতে পরিষ্কার সংসদ অচল করার নীতি থেকে তারা সরে আসছে না। পরে জেটলির অভিযোগের জবাব দিয়েছেন রাজ্যসভায় কংগ্রেসের উপনেতা আনন্দ শর্মা ও দলের মুখপাত্র রণদীপ সিং সূরজেওয়ালা। আনন্দ শর্মা বিষয়টিকে মোদী-শরিফ আলোচনার দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে সরকারকে পাল্টা চাপে ফেলতে চেয়েছেন। আনন্দ শর্মার বক্তব্য হল, ‘আমরা তো সংসদে একসুরে গুরদাসপুরের ঘটনার নিন্দা করেছি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদের দাবি নিয়ে একটা কথাও বলছেন না? আমরা আগে জানতে চাই, প্রধানমন্ত্রী কী আশ্বাস পেয়ে নওয়াজ শরীফের সঙ্গে আবার আলোচনা শুরু করলেন? আর সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার পরীক্ষিত রেকর্ড কংগ্রেসের আছে। এটা খুবই দুঃখের রাজ্যসভার নেতা এভাবে গুরদাসপুরের ঘটনা নিয়ে রাজনীতি শুরু করে দিলেন।’
কংগ্রেসকে চাপে রাখতে জেটলি অবশ্য চেষ্টার কোনও ত্রুটি করেননি। তিনি বলেছেন, ‘গুরদাসপুরের ঘটনার পর সারা দেশের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হবে সেটাই স্বাভাবিক ছিল। কংগ্রেস তো তাদের প্রতীকী বিক্ষোভ গত দু-সপ্তাহ ধরে চালিয়েছে। আজ অন্তত তারা দেশের স্বার্থে সংসদ চলতে দিতো। কিন্তু সেই সুযোগও তারা গ্রহণ করল না। দেশের স্বার্থের থেকে তারা নিজেদের তুচ্ছ রাজনৈতিক স্বার্থকে বড় করে দেখল। সংসদ চালানোর দায় এখন পুরো কংগ্রেসের।’ জেটলি এভাবে দুটো বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছেন। প্রথমত, সংসদ চালনোর জন্য কংগ্রেসের সঙ্গে আলোচনা বা এই ধরনের প্রয়াসে সরকার ঝাঁপাবে না। বরং কংগ্রেসের ওপর দায় চাপিয়ে বসে থাকবে। দ্বিতীয়ত, কংগ্রেস যে এনডিএ সরকারের মন্ত্রী বা বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীদের ইস্তফার দাবি করছে, সেটা নেহাতই তুচ্ছ রাজনৈতিক দাবি। তার থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল গুরদাসপুর নিয়ে আলোচনা।
সংসদের অচলাবস্থা কাটানোর উপায় খুঁজতে গতকাল সর্বদলীয় বৈঠক ডেকেছিলেন স্পিকার সুমিত্রা মহাজন। সেখানে কংগ্রেসের নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে, তৃণমূলের লোকসভার নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় সহ অধিকাংশ বিরোধী নেতাই জানিয়ে দেন যে, সংসদ চালু রাখার দায়টা হল সরকারের। তারা আলোচনা করুক, পথ বের করুক। আর সুদীপ জানিয়ে দেন, ওয়েলে নেমে বিক্ষোভ দেখানো যাবে না, এটা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। প্রশ্ন এটা হতে পারে যে, কতদূর যাওয়া উচিত। বৈঠকে খাড়গে ও জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া যেভাবে কথা বলেছেন, তাতে স্পষ্ট তাঁরা আগের অবস্থানে অনড় আছেন। সুষমা ও দুই মুখ্যমন্ত্রী পদত্যাগ না করলে তারাও সংসদ অচল রাখবেন। কংগ্রেস নেতা মল্লিকার্জন খড়গে বলেন, ‘সরকার তথা বিজেপিকে ব্যবস্থা নিতেই হবে। দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে বিক্ষোভ চলবে’।
গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ
ইয়াকুব মেমনের দেহ নিয়ে যাত্রা বা তার শেষকৃত্যের কোনও ছবি বা ভিডিয়ো প্রকাশ করা যাবে না। সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধে পুলিশের জারি করা এই নির্দেশে তৈরি হল নতুন বিতর্ক। বৃহস্পতিবার ১৩ ঘণ্টার জন্য এই নির্দেশ জারি করেন ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (অপারেশনস) সঞ্জয় বারকু্ল। জানিয়ে দেন, বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা থেকে মাঝরাত পর্যন্ত এই ফতোয়া বলবত্? থাকবে। এরপরই সব টিভি চ্যানেলগুলি ইয়াকুবের মৃতদেহ নিয়ে যাত্রা ও তাঁর শেষকৃত্যের সমপ্রচার বন্ধ করে দেয় কয়েকটি টিভি চ্যানেলে নোটিসটিও দেখানো হয়। বলা হয়, মেমন একজন বিশ্বাসঘাতক বলেই তার শেষকৃত্যের সমপ্রচার করা হবে না। কারণ তারা এক জন বিশ্বাসঘাতকের শেষকৃত্যের সমপ্রচার করে তাকে ‘হিরো’র মতো পরিচিতি দিতে চায় না। পুলিশি রিপোর্টে দাবি, জনসাধারণের শান্তি বিঘ্নিত হতে পারে সে কথা ভেবেই সংবাদমাধ্যমের উপর এই নিষেধাজ্ঞা। তাছাড়া এই সমপ্রচার হলে জনসাধারণের নিরাপত্তা বিঘ্নিত ও সরকারি সম্পত্তি নষ্ট হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে পুলিশ। - সূত্র : ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস, জি নিউজ, আনন্দবাজার পত্রিকা, এই সময়।
