মধ্যবর্তী নির্বাচনের আশায় বিএনপি, সরকারের ‘না’

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০১৫, ২৩:৫৬

২০১৯ সালের আগেই ‘মধ্যবর্তী’ বা ‘আগাম’ নির্বাচনের আশা করছে বিএনপি। এতে সরকারকে রাজি করানোর লক্ষ্যে দলটি নিজেদের এতোদিনের অনড় অবস্থান থেকে নড়ে নির্বাচনকালীন ‘অনির্বাচিত ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক’ সরকার ব্যবস্থার দাবি থেকে সরে এসেছে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা পেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেও নির্বাচনে যেতে আপত্তি নেই— মুখে না বললেও বিএনপির ভেতরের অবস্থান এখন এমনই। তবে আগাম নির্বাচনে এখন পর্যন্ত সায় নেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের। বরং বিএনপি অবস্থান বদলের পরেও আওয়ামী লীগ নেতা ও সরকারের মন্ত্রীদের কেউ কেউ পরিষ্কার করেই বলেছেন ‘সংবিধান অনুযায়ী ২০১৯ সালেই একাদশ সংসদ নির্বাচন হবে।’

 
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম গতকাল সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনও বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী হবে। আশা করি, সবাই সেই নির্বাচনে অংশ নেবে।’ মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রশ্নে তার কৌশলি জবাব ছিল ‘মধ্যবর্তী নির্বাচনের কোনো আলোচনাই আমাদের দলের মধ্যে হয়নি। প্রধানমন্ত্রীও এই বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনা করেননি। তবে প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক ক্ষমতা আছে। প্রধানমন্ত্রী যদি লিখিতভাবে রাষ্ট্রপতির কাছে অনুরোধ করেন, সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নতুন নির্বাচন দিতে, তাহলে যে কোনো সময় হয়ে যেতে পারে। উনি ইচ্ছা করলে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতেও পারেন, নাও পারেন। উনি যদি প্রয়োজন মনে করেন, যে কোনো সময় হবে। না হলে যথাসময়ে হবে।’
 
আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের বিভিন্ন নেতা বর্তমান সরকারের প্রায় শুরু থেকেই ‘২০১৯ সালের আগে নির্বাচন নয়’ বলে আসলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে প্রথমবারের মতো বলেছিলেন ‘তারা জানে-২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে মাধ্যমে গঠিত বর্তমান সরকারের মেয়াদ ৫ বছর। তা সত্ত্বেও কেন এই নাশকতা?’
 
বিএনপির স্থায়ী কমিটির তিনজন সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের দু’জন উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর মধ্যস্থতায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত কয়েক দফা বৈঠকে এক ধরনের অঘোষিত ও মোটামুটি মতৈক্য হয়েছিল। সরকারি দলের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে নির্বাচন করতে হচ্ছে, এরপর সবার সঙ্গে আলোচনা করে আরেকটি নির্বাচন করা যেতে পারে। সরকারি দলের এই ‘আশ্বাসে’ তখন নির্বাচনে এক ধরনের নীরব সমর্থনও ছিল বিএনপির। বিএনপির এখন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আশার পেছনে তখনকার ওই ‘আশ্বাস’কেও ভিত্তি হিসেবে ধরা হচ্ছে বলে জানান দলটির এই নেতারা।
 
৫ জানুয়ারির নির্বাচনে দলের মৌন সমর্থনের বিষয়টি সরাসরি স্বীকার না করলেও এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বলেছিলেন ‘তারানকো সাহেবের উপস্থিতিতেই যেসব বৈঠক হয়েছিল, সেখানেই আওয়ামী লীগ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল স্বল্পতম সময়ের মধ্যে আরেকটি নির্বাচন দেয়ার, এখন অস্বীকার করলে তো কিছু করার নেই’। তবে ফখরুলের এই দাবি ‘অসত্য’ বলে এই প্রতিবেদককে জানান ওই বৈঠকগুলোতে উপস্থিত থাকা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও বর্তমানে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু।
 
বিএনপির মধ্যবর্তী নির্বাচনের টার্গেটের বিষয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, দেশে বর্তমানে গণতন্ত্র অবরুদ্ধ হয়ে রয়েছে। এই অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে হলে সকল দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হওয়া জরুরি। এখানে বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়া মুখ্য নয়, জনগণের ভোটাধিকার ফিরে পাওয়াই মূল বিষয়।
 
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, কয়েকটি কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ওপর এখন পূর্ণ মনোযোগ দিচ্ছে দলটি। বিশেষ করে, দলের শত শত নেতা-কর্মী বছরের পর বছর কারাবন্দী, তাদের অনেকে কারাগারে অসুস্থ, সারাদেশে বহু নেতা-কর্মী অসংখ্য মামলার খড়্গ মাথায় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পরিবার-পরিজন ছেড়ে ফেরারি, মামলার ভার সইতে না পেরে অনেকে রাজনীতিতেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন—কেউ কেউ চলে যাচ্ছেন সরকারি দলে; মূলত দলের এসব নেতা-কর্মীকে স্বাভাবিক জীবনে ও রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই আগাম নির্বাচনের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ অনেকের বিভিন্ন মামলার বিচারকাজ পরিণতির দিতে এগোচ্ছে। আগাম নির্বাচনের প্রত্যাশার পেছনে এটিও অন্যতম অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য। এছাড়া দলটির বিশ্বাস, সরকারে যেই থাকুন—অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে এবং ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারলে ক্ষমতার বদল হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
 
বিএনপির এই চিন্তাধারার প্রমাণ মেলে দলটির অন্যতম ‘থিংকট্যাংক’ হিসেবে পরিচিত ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দিনের বক্তব্যেও। তিনি ইত্তেফাককে বলেছেন, ‘সরকারে কে থাকল সেটি মুখ্য নয়। নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ হলে, নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেয়া হলে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ নির্বাচন কাজে সম্পৃক্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিরপেক্ষ থাকলে এবং অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোটের নিশ্চয়তা পেলেই বিএনপি নির্বাচনে যাবে।’
 
তবে দীর্ঘদিনের তত্ত্বাবধায়ক দাবি থেকে খালেদা জিয়ার সরে আসা এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসার বিষয়টিকে অন্যভাবেও দেখছেন ক্ষমতাসীনরা। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল শরিক জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, ‘নির্বাচন খালেদা জিয়ার দাবি নয়। নিজেকে মামলা থেকে বাঁচানোর জন্যই তিনি এখন তত্ত্বাবধায়ক ছেড়ে নির্বাচনের কথা বলছেন।’
 
বিএনপির মধ্যবর্তী নির্বাচন ভাবনার বিষয়ে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদও বলেছেন, ‘২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারির পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ নিয়ে অন্য কোনো রূপরেখা বা ভাবনায় কাজ হবে না।’
 
মধ্যবর্তী বা আগাম নির্বাচন প্রশ্নে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে ‘না’ বলা হলেও আশা ছাড়ছে না বিএনপি। আগাম নির্বাচনে সরকারকে রাজি করাতে নতুন করে দেশি-বিদেশি চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে দলটি। যার অংশ হিসেবে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান রোজার ঈদেও দিন রাতে গুলশানে নিজ বাসায় বিদেশি কূটনীতিকদের নৈশভোজে আপ্যায়নের মাধ্যমে বিএনপির সর্বশেষ রাজনৈতিক অবস্থানও জানিয়েছেন।
 

বিএনপি নেতারা মনে করছেন, নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা প্রশ্নে খালেদা জিয়ার নমনীয়তা রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ যোগ করবে। গণফোরাম সভাপতি ও দেশের প্রবীণ আইনজ্ঞ ড. কামাল হোসেন বৃহস্পতিবার চা-চক্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিয়ে বসে গণতন্ত্র ফেরানোর জন্য যেসব উদ্যোগের কথা বলেছেন, সেটিও সম্ভাব্য এই মেরুকরণেরই অংশ। ড. কামালের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বিএনপির মুখপাত্র ড. আসাদুজ্জামান রিপন গতকাল বলেছেন, ‘আমরা জেদাজেদির রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। নির্বাচন প্রশ্নে আমরা জেদ ধরে বসে নেই। সরকারেরও জেদ ধরে বসে থাকা উচিত নয়। মধ্যবর্তী একটি অবাধ নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকারের উচিত বিশিষ্ট নাগরিকদেরসহ দেশের সকল পক্ষের সঙ্গে সংলাপ শুরু করা।’