দল গোছাতে পারছে না আওয়ামী লীগ

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০১৫, ০০:১৩

রাজপথে নেই রাজনৈতিক শক্ত প্রতিপক্ষ। সর্বত্রই ফাঁকা মাঠ! রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন অনুকূল পরিবেশেও দল গোছাতে পারছে না আওয়ামী লীগ। বিএনপি-জামায়াত জোটকে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করার পর কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিক কর্মসূচি নিয়ে সারাদেশে আওয়ামী লীগের তত্পর থাকার কথা। কিন্তু সাংগঠনিক কাজে মন নেই দলটির অধিকাংশ নেতার। দলের হাইকমান্ডের বারবার নির্দেশনার পরও এখনো তৃণমূলের সম্মেলন সম্পন্ন হয়নি। সারাদেশের ৭৫টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ১৭টি জেলায় মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি বিরাজ করছে। ৫৫টি জেলায় তিন বছরেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। দলের প্রভাবশালী নেতাদের জেলায় এক থেকে দেড় যুগ ধরে সম্মেলন হচ্ছে না। দলের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের জেলা কিশোরগঞ্জে আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয় না প্রায় দেড় যুগ।

 
২০১২ সালের ২৭ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়েছে। পরবর্তী সম্মেলনের সময় আসার উপক্রম হলেও এখনো পর্যন্ত কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। জানা গেছে, আগামী ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় সম্মেলনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগেই তৃণমূলের সম্মেলন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে শোকাবহ আগস্টের ৪০ দিনব্যাপী কর্মসূচির পর আগামী ১০ সেপ্টেম্বর থেকে মাঠে নামবেন দলের সাধারণ সম্পাদক। প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ২৯ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
 
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমের খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেছে, সন্ত্রাস-নাশকতানির্ভর রাজনীতির পথে গিয়ে বিএনপি এখন অনেকটা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আর বিএনপির সন্ত্রাস-জঙ্গিনির্ভর প্রধান রাজনৈতিক মিত্র জামায়াত এখন রয়েছে অস্তিত্বের সঙ্কটে। রাজপথে রাজনৈতিক কৌশলে বিএনপি-জামায়াতকে পরাজিত করে এখন অনেকটাই স্বস্তিতে রয়েছে আওয়ামী লীগ। আর এটাই সময়ের ব্যবধানে এখন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে দলটিতে। হঠাত্ করেই যেন নিষ্ক্রিয়, নিষ্প্রভ হয়ে পড়েছে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম। বিএনপি-জামায়াতের ভয়াল সন্ত্রাস-নাশকতা ঠেকাতে সারাদেশেই দলটিতে যে ‘চেন অব কমান্ড’ গড়ে উঠেছিল, রাজনৈতিক সুসময়ে তা যেন অতীতের চেয়েও বেশি ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। এতে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম।
 
আওয়ামী লীগের অতীত ইতিহাস থেকে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে ছিল, শত প্রতিকূলতার মধ্যেও সংগঠনের এমন অবস্থা ছিল না। সত্তর ও আশির দশকেও ১২ মাসের মধ্যে ৯ মাসই কেন্দ্রীয় নেতারা মফস্বলে থাকতেন। এমন কোনো থানা বা ইউনিয়ন নেই, এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নেতারা সাংগঠনিক সভা করে দলকে চাঙ্গা রাখতেন। বৈরী অবস্থায় প্রাণান্ত পরিশ্রম করে দলকে সংগঠিত করার পাশাপাশি নেতাকর্মীদের পাশে তারা দাঁড়িয়েছিলেন। পঁচাত্তর পরবর্তী বহুধা বিভক্ত ও বিধ্বস্ত আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন শেখ হাসিনা। ১৯৮১ থেকে ’৯৬ এই ১৫টি বছর ঝড়-ঝঞ্ঝা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বারবার প্রাণনাশের চেষ্টায় একের পর এক ভয়াল হামলা উপেক্ষা করে তিনি দলকে সুসংগঠিত করেন। শুধু দলকেই শক্তিশালী করেননি, সারাদেশ ছুটে বেড়িয়ে গণমানুষের আস্থা-বিশ্বাস অর্জনেও সক্ষম হন। তবে দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্য নেতাদের নিষ্ক্রিয়তায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম অনেক ঝিমিয়ে পড়েছে।
 
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও গ্রুপিংয়ের কারণেই বিভিন্ন জেলার সম্মেলন বিলম্বিত হচ্ছে। কোথাও কোথাও সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার পরও তা বাতিল করা হচ্ছে। আর এ সবের পেছনে জেলার কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রভাব রয়েছে বলে স্থানীয় নেতারা মনে করেন। একই কারণে সম্মেলন হওয়া ৫৫টি সাংগঠনিক জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটি দীর্ঘদিন ধরে হচ্ছে না। এতে হতাশা ও কোন্দল আরো বাড়ছে। অনেক স্থানে অভ্যন্তরীণ বিরোধ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে যশোর জেলা আওয়ামী লীগের কোন্দল অনেকটা প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি সম্মেলনের মাধ্যমে এর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হলেও এখনো পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। নতুন কমিটির সধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারের সাথে স্থানীয় পাঁচ এমপির বিরোধ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
 
গাজীপুর মহানগর ও নারায়ণগঞ্জ মহানগরকে জেলা শাখার মর্যাদা দেয়ায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক জেলা ৭৩ থেকে বেড়ে ৭৫ এ দাঁড়িয়েছে। এই ৭৫টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ইতোমধ্যে ৫৫টির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। রংপুর বিভাগের ৯টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে গাইবান্ধা, খুলনা বিভাগের ১১টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে চুয়াডাঙ্গা, বরিশাল বিভাগের ৭টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে পিরোজপুর, ভোলা ও ঝালকাঠী, সিলেট বিভাগের ৫টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে সুনামগঞ্জ, চট্টগ্রাম বিভাগের ১৩টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে চাঁদপুর, কুমিল্লা ও কক্সবাজারে এবং ঢাকা বিভাগের ২১টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জে সম্মেলন বাকি রয়েছে। এদিকে রাজশাহী বিভাগের ৯টি সাংগঠনিক জেলার সবগুলোয়ই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। তিনি দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্মেলন সম্পন্ন করতে পারায় তাকে ঢাকা বিভাগের বাড়তি দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এছাড়া নবগঠিত গাজীপুর মহানগর ও নারায়ণগঞ্জ মহানগর শাখা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কায় মাদারীপুর জেলা শাখায় সম্মেলন ছাড়াই কমিটি গঠন করা হয়েছে।
 
কিশোরগঞ্জ জেলায় সর্বশেষ সম্মেলন হয় ১৯৯৭ সালে। ওই সময় সভাপতি নির্বাচিত হন বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ, সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক গোলাপ। মোঃ আবদুল হামিদ স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর এ কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সৈয়দ ওয়াহিদুল ইসলাম। তিনি সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের চাচা। ১৯৯৯ সালে শামসুল হক গোলাপ মারা যাওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন শাহাবুদ্দিন ঠাকুর। ২০০৭ সালে শাহাবুদ্দিন ঠাকুরের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দলের দায়িত্ব পান এম এ আফজল। গত বছরের ২৮ জুন এ জেলার সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করা হলেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করা হয়। গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলন হয় ২০০৪ সালে। ৩ বছর মেয়াদি এ কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন মোহাম্মদ আলী খান আবু মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী এমদাদুল হক। আবু মিয়া গত বছর মারা গেলে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পান রাজা মিয়া বাটু। দলের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জেলা সুনামগঞ্জে সম্মেলন হয় না ১৮ বছর ধরে। সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদককে দিয়ে চলছে এ জেলার সাংগঠনিক কার্যক্রম। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এ জেলার সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করা হলেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করা হয়। দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, কাজী জাফর উল্লাহ ও কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য আবদুর রহমানের জেলা ফরিদপুরে আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয় না ১০ বছর। ২০০৫ সালে এ জেলার সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। দলের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও ইউসুফ হোসেন হুমায়ুনের জেলা ভোলায় ২০০৫ সালে সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর নিজ জেলা ঝালকাঠীতে সম্মেলন হয় ২০০৬ সালে। দলের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক ড. আব্দুর রাজ্জাকের জেলা টাঙ্গাইলে ২০০৪ সালে এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার জেলা চাঁদপুরে আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২০০৫ সালে।
 

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল-আলম হানিফ জানান, দলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত রয়েছে। এর আগেই সবগুলো জেলা সম্মেলন সম্পন্ন করে কেন্দ্রীয় সম্মেলনের উদ্যোগ নেয়া হবে।