চিত্রনাট্যে নতুনত্ব নেই! থাই পুলিশের কাছ থেকে বাঁচতে কেন্দ্রীয় চরিত্র মাহী অচেনা এক যুবককে চুমু’ খেয়ে বসে, এরকম নায়িকাদের বাঁচার প্রক্রিয়াও অন্য অনেক হিন্দি ছবিতে রয়েছে বটে এবং সেই ‘এক খান চুমু’র ভেতরে ঘুরতে ঘুরতেই ওমের গল্প ফুরায় প্রায়, ওদিকে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ইন্টারপোল অফিসার অমিত হাসান থাই পুলিশকে ভাঙা ভাঙা বাংলায় নয়, সাবলীল বাংলাতে অনবরত নির্দেশনা দিচ্ছেন! গল্পের এতসব অসংলগ্নতার পরও ছবির রিভিউ-এ এই চোখ জুড়িয়ে যাওয়ার এই শিরোনামে মনে হতেই পারে আমি খানিক হয়তো তাচ্ছিল্য করছি ছবিটিকে। কিন্তু আদতে মোটেও তা নয়।
‘অগ্নি টু’ ছবিটি তরুন মেধাবী নির্মাতা ইফতেখার চৌধুরীর এ যাবত কালের মাস্টারস্ট্রোক বলা যায়। কারণ অনুমেয় গল্পে ছবি চলতে থাকলেও ছবির দারুন গতি দর্শক চোখকে অস্বস্তি দেয় না। সাথে অবশ্যই বাড়তি পাওনা অ্যাকশন দৃশ্যে মাহীর দুর্দান্ত অভিনয় এবং আশীষ বিদ্যার্থীর সাবলীল সংলাপের মুগ্ধতা।
আরেকটি বাড়তি আগ্রহ তো আগে থেকেই কাজ করেছিল এই ছবিটির জন্য, তা হলো ছবিটির আইটেম নাম্বার। ‘ম্যাজিক মামনি’ খ্যাত এই মাহী নতুন ভাবে ধরা দিল। একই সাথে রোমান্টিক গানগুলিতে দারুণ ক্যামেরার কাজ চোখ ধাঁধায়। বলিউডের কোনো নতুন ছবি দেখছি কি না!
এছাড়া এমনিতে পরিচিত ইঁদুর বেড়াল খেলার ভেতরেই ছবিটি সীমাবদ্ধ। মাহী অর্থাৎ অগ্নির বয়ফ্রেন্ডকে খুন করার পর সেই খুনের বদলা নিতেই পাইথন গ্র“পের সাথে পাঞ্জা লড়ার ছবিতে একে একে সেই বাহিনীর সবাইকে খুন। কিন্তু সেখানে ধোঁকাবাজ হিসেবে হঠাৎ ওম’কে পাইথনের সঙ্গী হিসেবে দেখিয়ে যে অবাক করার চেষ্টা করেছেন, একই ভাবে মাহীর এই শক্তির উৎস, কিংবা তার এই গ্যাং এর একটা রেফারেন্স দেখালে তা দর্শক হিসেবে আমাদের হাস্যকর অবাক হওয়া থেকে বাঁচাতো। এরকম চিত্রনাট্যের নানান দূর্বলতাগুলো খুব শক্তভাবে ঢেকে দিয়েছেন নির্মাতা ইফতেখার তার অসাধারণ চিত্রগ্রহন ও কোরিওগ্রাফীতে।
তবে ভারত-বাংলাদেশের দর্শককে মাথায় রেখে চার্চে মাহীর আগমন, যাতে ধর্মীয় কোনো টানাপোড়েন তৈরি না হয়, এছাড়া একাধিক গানের বাংলা, হিন্দির মিশেলকেও সেন্সর বোর্ড বেশ সহযাত্রী হিসেবেই সাপোর্ট দিয়েছেন দেখা গেল দুই বাংলার ছবি ব্যবসার স্বার্থেই। বিষয়টি ইতিবাচক। এরপরও সিনেমা হলে অন্তত এটুকু বলার সুযোগ পায়নি যে, মেধাবী নির্মাতা ইফতেখার তার অ্যাকশন জেসমিন এ যেমন ‘রাউডি রাঠোর’ এর ফ্রেম টু ফ্রেম নকল করেছিলেন। এখানে তার চর্চা নেই। বরং নির্মাতা তার সর্বোচ্চ মেধার মূল্যায়ন করেছেন। যেখানে পুরো ছবিতে অনেক খুটিনাটি গল্পের দূর্বলতা ছবির অনবদ্য গতিতে মুগ্ধতা এনেছে। একই ভাবে এবারের ঈদের ফুল অব এন্টারটেইনমেন্ট ছবি ‘লাভ ম্যারেজ’ বা কাব্যিক ক্লাসিক ছবি ‘পদ্ম পাতার জল’ এর পাশাপাশি এই মাহী’র ‘অগ্নি টু’ এর মতো ছবি ঢালিউডকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। ভালো ছবির উদাহরণ হিসেবে নতুন কিছু যোগ দিয়েছে। বানিজ্যিক ছবির প্রায় সব উপকরণ দিয়ে সাজানো ছবির সকল অনুসঙ্গের নান্দনিকতার পাশাপাশি গল্পের কাঠামো নিয়ে পরিচালক যদি আরো একটু টেবিল ওয়ার্ক করতেন তবে দর্শকেরা অপার মুগ্ধতায় হয়তো বারবার দেখার অনুপ্রেরণা পেত।
তবু এই ছবির চমৎকার কিছু গানের চিত্রায়ন, দারুণ লোকেশন, কিছু অ্যাকশ এবং অবশ্যই ম্যাজিক মামনি দেখার জন্য বারবার আসতে মন চাইবেই। এইবা কম কী-সে? তাই ঢালিউড এখন দুর্দান্ত গতিতেই এগিয়ে যাচ্ছে। নয়তো শাকিব খানের একক দাপটের এই ইন্ডাষ্ট্রিতে নায়িকা নির্ভর ছবি দেখতে ‘অগ্নি টু’ এর রিপিট দর্শকও নজর কাড়লো। হলের পেছনের সীটে অনবরত দুই বন্ধু ছবির গল্প বলে দিচ্ছে। এর পরে এই, এরপরের সীনটার জন্যই তো আবার আসলাম।
বাহ। বাজেটের বাহাদূরী কোনো মূল্যায়ন হতে পারে না কোনো ছবির, সেটা সিনেমা অজ্ঞরাও বলবেন। এ ছবিতে তাই গল্পের টানটান বা কাটাকুটির খেলাটা আরেকটু বাড়ালে তা অনবদ্য কিছু হয়ে যেত।
তাতে কী! নিশ্চয় ইফতেখার তার পরের ছবির জন্য সেই রসদ জুগিয়েই লড়বেন। কারণ বাকি সব কিছুতেই নির্মাতা এখন যে পুরোপুরি পোক্ত হয়ে গেছেন।
দর্শক হিসেবেও তাই সেই প্রত্যাশার বাড়িতে নেমন্তন্য খাবার অপেক্ষায় থাকলাম ইফতেখারের পরের ছবির জন্য!
