নেতাকর্মীদের চাপ :থানায় পুলিশ সদর দপ্তরের চিঠি

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০১৫, ২৩:৫৯

ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় একশ্রেণির নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রশাসন চলছে এমন অভিযোগ পেয়ে নড়ে চড়ে বসেছে পুলিশের হাইকমান্ড। পুলিশের আইজি রাজধানীসহ দেশের সকল থানায় এই বিষয়ে জানতে চিঠি পাঠিয়েছেন। আগামী সাতদিনের মধ্যে চিঠির জবাব প্রতিবেদন আকারে জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।  গত ২৬ জুলাই ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় ‘নেতাকর্মীদের চাপে পুলিশ’ এই শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে জানানো হয়, মামলা নেয়া থেকে শুরু করে আসামি গ্রেফতার বা ছেড়ে দেয়ার বেশিরভাগ হয় ওই সব নেতাকর্মীর ইশারায়। আর এসব নেতা পাতি-নেতারা আশ্রয়-প্রশ্রয় পাচ্ছে ক্ষমতাসীন দলেরই একটি বিশেষ অংশের কাছে।

 
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানী ও এর বাইরের ৩০টি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) চিঠি পাওয়ার বিষয়টি ইত্তেফাকের কাছে নিশ্চিত করেছেন। তারা ওই প্রতিবেদনের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, এক শ্রেণির স্থানীয় সুবিধাবাদী নেতাকর্মীদের চাপে আছে পুলিশ। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে যা প্রকাশিত হয়েছে, প্রকৃত পরিস্থিতি তার চেয়েও ভয়াবহ বলে তারা মন্তব্য করেন। তারা জানান, অনেক সময় মামলা নেয়া-না নেয়া এসব নেতাকর্মীদের মর্জির উপর নির্ভর করে। দাপট ধরে রাখতে কেউ কেউ পছন্দের ওসি ও এসআইকে বদলি করিয়ে নিজের এলাকায় নিয়ে আসে। আর ওসিরা কথামতো না চললে সংসদ সদস্যরাও কখনো কখনো ‘জামায়াত-শিবিরের সমর্থক’ বলে সরকারের কান ভাঙিয়ে বদলির হুমকি দেন।
 
পুলিশ সদর দপ্তরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, সংসদ সদস্যরা ওসি, এসপিদেরকে ফোন করে নানা রকম চাপ দিতে থাকেন। এটা সত্যিই লজ্জাজনক। কোন কিছু বলার থাকলে তারা পুলিশ সদর দফতরে জানাতে পারেন। আমরা তো সেবা দেয়ার জন্য বসে আছি। ওনারা নিজেদের সম্মান নিজেরা না রাখতে পারলে আমাদের কি করার আছে। তাদের কারণেই কোথাও কোথাও গ্রাম পর্যায়ের পাতি-নেতারা পর্যন্ত থানা পুলিশের উপর চোখ রাঙানির সাহস পায়।
 
পুলিশের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানায়, বর্তমান সরকারের অর্জন অনেক। পুলিশ বাহিনীসহ সকল বাহিনীকে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। তবে সরকারের এই অর্জন ম্লান হয়ে যাচ্ছে এসব সুবিধাবাদী নেতাকর্মীর কর্মকাণ্ডের কারণে।
 
জানা গেছে, আলোচনা-সমালোচনার শীর্ষে থাকা এসব সুবিধাবাদী নেতা-কর্মীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে মাঠ পর্যায়ে সরকারের দুর্নাম হচ্ছে। থানায় দালালি, জমি দখল, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, সরকারি-বেসরকারি নিয়োগ-বাণিজ্য, মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে এরা। এদের উপার্জনের অন্যতম রাস্তা হচ্ছে আসামি ধরিয়ে দেয়া ও ছাড়িয়ে আনা। এরা অনেক সময় চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের ছাড়িয়ে নিতেও সুপারিশ করে। অনেক সময় এ নিয়ে ক্ষমতাসীনদের দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র গ্রুপিংও সৃষ্টি হয়। একপক্ষ কোন আসামিকে ছাড়তে বললে অন্যপক্ষ বাধা দেয়। দুই পক্ষের মাঝে পড়ে পুলিশকে অনেক সময় অহেতুক ও হয়রানিমূলক বদলির শিকার হতে হয়।
 
এদিকে, অনেক এলাকার সংসদ সদস্যরাও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে এসব থানার ওসিরা নেতাদের কথার বাইরে যেতে পারেন না।
 
এদিকে নেতাদের তদবির প্রসঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (গোয়েন্দা) মনিরুল ইসলাম গত বুধবার তার ফেসবুক পেজে এক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘‘আমরা (পুলিশ) এ যুগের নীলকণ্ঠ। পচনধরা সমাজের ভদ্রবেশী মানুষেরা (কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত) তাদের ভেতরকার আবর্জনা আর দুর্গন্ধ পুলিশের উপর চাপিয়ে নিজেদের লেবাস ঠিক রাখেন আর কথায় কথায় পুলিশের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করেন!
 
আজ দেশের একজন কুখ্যাত চোরাচালানী (সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা চেয়ারম্যান রিয়াজ উদ্দিন) গ্রেফতারের পর চাপ প্রয়োগ করে ছাড়িয়ে নিতে একজন মাননীয়ের সশরীরে দৌড়ঝাঁপের যে নমুনা দেখলাম তাতে হতাশ হলাম। কেননা, ইনি হলেন সেই ব্যক্তি যিনি টেলিভিশন টক শোতে কথায় কথায় পুলিশের দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে এনে পুলিশ সম্প্রদায়কে তুলোধুনা করেন! আলেকজেন্ডার বেঁচে থাকলে সেলুকাসকে উদ্দেশ করে কি মন্তব্য করতেন কেউ অনুমান করতে পারলে দয়া করে জানাবেন!’’
 

ওই স্ট্যাটাসের মন্তব্যে ডিবির উপ-কমিশনার (উত্তর) শেখ নাজমুল আলম লিখেছেন, ঐ মাননীয়কে আমি নিজেই বলেছি ডিবিতে কিন্তু কোন তদবির কাজে আসবে না। কারণ আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করি। আইনগত যা হবে, তাই করব। তাকে সোজা আদালতে যেতে বলেছি।