পুঁজিবাজারে কারসাজি কমাতে স্বল্প পুঁজির কোম্পানিগুলোর জন্য পৃথক বোর্ড বা বাজার (ট্রেডিং প্লাটফর্ম) করা হচ্ছে। এ বোর্ডে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ার শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ও বড় বিনিয়োগকারীরাই ক্রয় করতে পারবেন। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই এ বোর্ড চালু করা যাবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
পৃথক এ বোর্ড চালু হলে স্বল্প মূলধনী কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করতে পারবে, যা স্বল্প মূলধনী কোম্পানিগুলোর বিকাশে সহায়ক হবে।
বিএসইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, স্বল্প পুঁজির কোম্পানিগুলোর শেয়ার কম থাকায় এ কোম্পানিগুলো ঘিরে কারসাজি করা সহজ হয়। কয়েকজন বড় বিনিয়োগকারী মিলে কোম্পানিগুলোর শেয়ার ক্রয়/বিক্রয় করে শেয়ার দর ওঠানামায় প্রভাব রাখতে পারেন। বিভিন্ন সময়ে স্বল্প মূলধনী কোম্পানিগুলোকে ঘিরেই কারসাজি হয়েছে। তাই এসব কোম্পানি নিয়ে পৃথক বোর্ড করার পরিকল্পনা করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তাছাড়া বর্তমানে ন্যূনতম ৩০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন না হলে কোনো কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারে না। তাই স্বল্প পুঁজির কোম্পানিগুলো ব্যাংক থেকে বেশি সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালায়। স্বল্প মূলধনী কোম্পানির জন্য পৃথক বোর্ড হলে ছোট মূলধনের কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হয়ে শেয়ারবাজার থেকে মূলধন তুলতে পারবে।
বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত এ বোর্ডের জন্য স্বল্প মূলধনী কোম্পানির সংজ্ঞা চূড়ান্ত হয়নি। পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণের ভিত্তিতে তা নির্ধারণ করা হবে। তবে ৩০ কোটি টাকার কম পরিশোধিত মূলধনী কোম্পানিকে স্বল্প মূলধনী হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সঙ্গে আনুষঙ্গিক কয়েকটি বিষয় যোগ করা হবে। যার ভিত্তিতে কোম্পানিগুলো এ বোর্ডে তালিকাভুক্ত হতে পারবে।
পৃথক বোর্ড প্রসঙ্গে বিএসইসির কমিশনার আরিফ খান জানিয়েছেন, স্বল্প মূলধনী কোম্পানিগুলোর জন্য পৃথক প্লাটফর্ম করার ফলে ছোট ছোট কোম্পানিগুলো বাজার থেকে মূলধন তুলতে পারবে। বিশেষ করে তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। এছাড়া ভেঞ্চার অর্থায়ন এবং প্রাইভেট ইক্যুইটি অরগানাইজেশনগুলোর বিকাশেও শেয়ারবাজারে অবদান রাখতে পারবে।
স্টক এক্সচেঞ্জের কর্মকর্তারা বলছেন, বাজারে প্রায়ই স্বল্প মূলধনী কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বাড়ে বা কমে। যা বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলে। স্বল্প মূলধনী কোম্পানির শেয়ার সংখ্যা কম হওয়ায় সহজেই এর দর প্রভাবিত করা যায়। ফলে কারসাজি করার ক্ষেত্রে এ ধরনের কোম্পানিকেই টার্গেট করা হয়। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে শেয়ারবাজারে ধস নামার পর স্টক এক্সচেঞ্জ এবং শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা কোম্পানির মূলধনের আকারের ওপর ভিত্তি করে স্বল্প মূলধনী কোম্পানিগুলোর জন্য পৃথক ট্রেডিং বোর্ড করার দাবি করেছিল। এর পর নানা সময়ে স্টক এক্সচেঞ্জের পক্ষ থেকে এ দাবি করা হয়। তাছাড়া এ বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য উভয় স্টক এক্সচেঞ্জের পক্ষ থেকে ধারণাপত্রও দেয়া হয়েছে। বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা এবং স্টক এক্সচেঞ্জের প্রস্তাবের ভিত্তিতে চলতি বছরে এসে বিএসইসি পৃথক বাজার গঠনের ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়। ইতোমধ্যে পৃথক ট্রেডিং প্লাটফর্ম করার বিধি বিধান প্রস্তুত করেছে বিএসইসি। যা ডিসেম্বরের মধ্যেই চূড়ান্ত হতে পারে। চূড়ান্ত হওয়ার পরই বাজার চালু করা হবে। সম্প্রতি স্বল্প মূলধনী বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলো যাতে শেয়ারবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করতে পারে, এমন উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। প্রতিবেশী দেশ ভারতের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রকরাও এ ধরনের কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে আনতে তালিকাভুক্তির শর্ত শিথিল করার কথা ভাবছেন।
জানা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মূলধন বিবেচনায় কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচনার জন্য আলাদা বাজার ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে যেসব কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়, তাদের লিস্টিং ফিসহ আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচও কম হয়। তাছাড়া কোম্পানিগুলোর মূলধন বিবেচনায় অন্যান্য নিয়ম কানুন কিছুটা আলাদা। বিভিন্ন দেশে এটিকে অল্টারনেটিভ মার্কেট বলে। বিশ্ব বাজারের এ ধরনের পৃথক বোর্ডের অভিজ্ঞতা নিতে ভারত, তুরস্ক, লন্ডন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাক স্টক এক্সচেঞ্জের সাথে বর্তমানে বিএসইসি অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, আমাদের দেশে এ ধরনের বাজার গড়ে উঠলে ছোট মূলধনী কোম্পানির শেয়ারদর প্রভাবিত করার সুযোগও কমে আসবে। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা রক্ষা পাবেন। তাছাড়া স্বল্প মূলধনী কোম্পানিগুলোও শেয়ারবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহের সুযোগ পাবে।
আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস্-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান এ সম্পর্কে বলেন, এ ধরনের পৃথক বোর্ড করায় স্বল্প মূলধনী কোম্পানিগুলোও বাজার থেকে মূলধন তুলতে পারবে। এতে দেশের বিনিয়োগে শেয়ার বা জারের অবদান বাড়বে। শেয়ারবাজার আরও বিস্তৃতি লাভ করবে। তাছাড়া স্বল্প মূলধনী কোম্পানিগুলো ঘিরে যেহেতু কারসাজির প্রবণতা বেশি, তাই সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কারসাজির হাত থেকে কিছুটা স্বস্তি পাবেন। এ ধরনের উদ্যোগ খুবই ইতিবাচক। তবে এ বোর্ডে যেসব কোম্পানি তালিকাভুক্ত হবে তাদের সঠিক বাছ-বিচার করে তালিকাভুক্তির অনুমোদনে বিএসইসিকে সতর্ক থাকতে হবে।
