বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উলানিয়া গ্রাম। পাশেই মেঘনা নদী। সন্ধ্যা নামলেই নদীর তীরে বসে ইয়াবার হাট। ১০-১৫টি মোটর সাইকেলে করে আসেন বিক্রেতারা। এলাকাবাসী জানান, এরা কেউই এই গ্রামের বাসিন্দা নয়। সন্ধ্যা হলেই এরা উপজেলা সদর থেকে আসেন। মোটর সাইকেলে ঘুরে ইয়াবা বিক্রি করেন। এই সময়টায় রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের আনাগোনা বাড়ে।
জানা গেছে, এক/দেড় বছর ধরে গ্রামের নির্জন এই স্থানে ইয়াবা বিক্রি চলছে। উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে গ্রামের রাস্তাগুলোতে এখন ফেরি করে ইয়াবা বিক্রি হয়। সহজলভ্য হওয়ায় গ্রামের কিশোর-তরুণেরাও এ মরণ নেশায় ঝুঁকে পড়ছেন।
মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর থেকে জানা যায়, উলানিয়া গ্রামের মতো সারাদেশের প্রত্যন্ত এলাকার চিত্রও একই রকম। গত কয়েক বছরে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা শহরের পাশাপাশি গ্রামেও ব্যাপকভাবে এটি ছড়িয়ে দিয়েছেন। এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনের তেমন কোনো তত্পরতা না থাকায় গ্রামে ইয়াবার জমজমাট ব্যবসা চলছে। সেবনকারীর সংখ্যা বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে বলে অধিদফতর সূত্রে জানা যায়।
জানা যায়, সর্বনাশা ইয়াবা দেশজুড়ে ভয়ংকর ছোবল মারছে। কেবল তরুণরা নয় প্রায় সব শ্রেণি-পেশার লোক এই নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছেন। কেউ জেনে, আবার কেউ না জেনেই বিপন্ন করছেন নিজের জীবন।
সূত্র বলছে, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মধ্যেও অনেকে রয়েছেন ইয়াবাসেবী। ছাত্র সংগঠনগুলোতে তো অভাব নেই ইয়াবাসেবীর। এমন কি কিছু পুলিশ ও রাজনীতিক পর্যন্ত জড়িয়ে পড়েছেন এই মরণনেশায় এবং ইয়াবা বাণিজ্যে। ফলে দেশে ইয়াবাসেবীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
গতকাল মঙ্গলবার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়েই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সবার সামগ্রিক প্রচেষ্টার মাধ্যমেই মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মন্ত্রী বলেন, যারা মাদক সেবন করে তারা নিজেরাও বিপদগামী হয়, একই সঙ্গে তাদের পরিবারকেও বিপদে ফেলে। মাদকের কারণে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। তিনি বলেন, শুধু র্যাব, পুলিশ, বিজিবি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর দিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বাবা-মা, স্কুল-কলেজের শিক্ষক, মসজিদের ইমামসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের বলতে হবে মাদক সেবন খারাপ।
পুলিশের আইজি একেএম শহীদুল হক ইয়াবা পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, প্রতিদিন ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করছে পুলিশ। তবে ইয়াবার ব্যাপকতা অনেক বেড়েছে। তাই পুলিশের একার পক্ষে ইয়াবা রোধ করা সম্ভব নয়। ইয়াবা রোধে সচেতনতা বাড়াতে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। সহায়তা দরকার সকল প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দলের।
অন্যদিকে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, গত একমাসে ২৫ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে র্যাব। এসময় র্যাবকে লক্ষ্য করে একজন ইয়াবা ব্যবসায়ী গুলি ছুঁড়লে র্যাবের পাল্টা গুলিতে তিনি নিহত হন। ইয়াবা প্রতিরোধে র্যাব সর্বাত্মক চেষ্টা করছে বলে তিনি জানান।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইয়াবার ব্যবহার মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে যাওয়ায় সমাজে নিষ্ঠুরতা ও হত্যাকাণ্ডসহ নানা অপরাধ বাড়ছে। ইয়াবা আসক্তরা নিজের বাবা-মাকে খুন করতেও দ্বিধা করে না। ইয়াবা নিতে নিতে তারা একেকজন মানববোমায় পরিণত হয়। মনুষ্যত্ব বলে কোন কিছুই তাদের ভিতরে অবশিষ্ট থাকে না। খুনের পর খুন কিংবা অপরাধ করলেও এ নিয়ে তাদের ভিতরে কোন অনুশোচনা হয় না।
রাজধানীর চামেলীবাগে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ছাত্রী ঐশী তার পুলিশ ইন্সপেক্টর পিতা ও মাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইয়াবা খেতে খেতে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে সেবনকারীর পুরো মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে যায়। বিষন্নতা চরম আকার ধারণ করে, সৃষ্টি হয় নিষ্ঠুরতা। ঐশীর ভেতরও একই ধরনের পরিবর্তন ঘটায় সে তার পিতা-মাতাকে হত্যা করেছে।
প্রখ্যাত মনোরোগ বিজ্ঞানী ডা. মোহিত কামাল বলেন, দেশকে রক্ষা করতে ইয়াবা প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা ব্যতীত আর কোন বিকল্প নেই। রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে ইয়াবা প্রতিরোধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি। কারণ হিসেবে বলেন, শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র ইয়াবার বিস্তার এভাবে চলতে থাকলে সমাজ জুড়ে খুনসহ জঘন্য অপরাধ আশংকাজনক হারে বেড়ে যাবে এবং শিক্ষিত তরুণ সমাজের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ইয়াবাসহ সব ধরনের মাদক রোধে আমাদের পর্যাপ্ত জনবল নেই। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের হাত অনেক লম্বা। এই শক্তিমানদের বিরুদ্ধে আমরা শূন্য হাতে লড়াই করে যাচ্ছি। তবে ইয়াবা প্রতিরোধে সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। ঘরে ঘরে ইয়াবা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। আর সেটার সময় এখনই।
মনোরোগ বিজ্ঞানীর সাবধান বাণী: ডা. মোহিত কামাল সাবধান করে বলেন, আমার কাছে দেশের প্রধান প্রধান ছাত্র সংগঠনের প্রথম সারির নেতারা চিকিত্সার জন্য আসেন। এরা ইয়াবায় আসক্ত। তারাই কিনা একসময় দেশের নেতৃত্বে আসবে। তখন অবস্থা কোন পর্যায়ে যাবে ভাবা যায়! তিনি বলেন, এখনই ইয়াবা প্রতিরোধ করতে হবে। অন্যথায় ১০ বছর পরে পুরো প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যাবে। তখন ইয়াবা আগ্রাসন প্রতিরোধ করা দুঃসাধ্য হয়ে যাবে। থাইল্যান্ডে ইয়াবা প্রতিরোধের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, থাইল্যান্ডে একসময় বাংলাদেশের মতো ইয়াবা ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে গ্রামে। তরুণ, নারী-পুরুষের বেশিরভাগই ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়ে। উপায় না দেখে সরকার ৫০০ ইয়াবা ব্যবসায়ীর তালিকা করে প্রকাশ্যে তাদের গুলি করে হত্যা করেছে।
এছাড়া মাদক প্রতিরোধে কঠোর আইন করে থাই সরকার। ৫-৬টি ইয়াবা কারও কাছে পেলে ৭-৮ বছরের জামিন অযোগ্য সাজা, ১০০ বা এর অধিক পিস ইয়াবা পেলে যাবজ্জীবন, ৫০০ বা তার অধিক পেলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়। এখন থাইল্যান্ডে ইয়াবা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে বলে তিনি জানান।
৪২ পয়েন্ট দিয়ে আসে ইয়াবা: মিয়ানমারে উত্পাদিত ইয়াবা ট্যাবলেট কক্সবাজার জেলার অন্তত ৪২টি পয়েন্ট দিয়ে দেশে প্রবেশ করে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরসহ বিভিন্ন প্রশাসন এ প্রবেশ পথগুলো চিহ্নিত করেছে। পুলিশ র্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার ও জড়িতদের গ্রেফতার করে। কিন্তু তারা আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে বের হয়ে পুনরায় ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। জানা গেছে, সর্বনাশা ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বেশিদিন আটকে রাখা যায় না। স্থানীয় প্রায় সকল প্রশাসনের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মী এ ব্যবসায় জড়িত। ব্যবসার টাকার ভাগ মাঠ থেকে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত যায়।
আলোচিত ২৩১ বর্গকিলোমিটার এলাকা: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, ইয়াবা পাচারের রুট টেকনাফ, কক্সবাজার এবং রাঙ্গামাটির ২৩১ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। কেবল টেকনাফেই রয়েছে ইয়াবা পাচারের ৩০টি রুট। চলতি বছরও দেশটি সফরকালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক বিষয়টি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন।
হুন্ডিতে ইয়াবার টাকা লেনদেন: হুন্ডির মাধ্যমে ইয়াবার টাকা লেনদেন হচ্ছে বলে জানা গেছে। হুন্ডির মাধ্যমে মিয়ানমারে এই টাকা পাচার করা হয়। প্রতি মাসে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা এভাবে মিয়ানমারে কোটি কোটি টাকা পাচার করছে। আবার অনেকে মেয়েদের নামে বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট খুলে টাকা লেনদেন করছে। এতে বেসরকারি ব্যাংক বেশি ব্যবহার হচ্ছে।
ইয়াবা ব্যবসায়ীর তালিকা: সমপ্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বৃহত্তর চট্টগ্রামের ৭৬৪ জন ইয়াবা ব্যবসায়ীর নামের তালিকা যুক্ত করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য মতে, ওই তালিকায় এক এমপি ও তার চার ভাইসহ টেকনাফ পৌরসভার ২৫১ জনের নাম রয়েছে। এছাড়া ওই তালিকায় স্থান পেয়েছে মহেশখালী উপজেলার ৬ জন ও বান্দরবান জেলার ২৯ জনের নাম। একই সঙ্গে মিয়ানমারের উচ্চ পর্যায়ের ৩৬ ইয়াবা গডফাদারের নাম রয়েছে। আলাদা করে রয়েছে টেকনাফের আলোচিত ৭ প্রভাবশালী এবং ৭ পুলিশ কর্মকর্তার নাম।
মূল হোতারা অধরা: বিজিবি, পুলিশ, কোস্টগার্ড, গোয়েন্দা পুলিশ, র্যাব, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর থেকে শুরু করে দেশের সকল আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ইয়াবা উদ্ধারে তত্পর থাকলেও এখনও অধরাই রয়ে গেছে তালিকাভুক্ত শীর্ষ ইয়াবা গডফাদাররা।
