গণতন্ত্র খুঁজে পাচ্ছেন না সামরিক শাসকদের পরামর্শকরা :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০১৫, ০৩:৪৭

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যারা দেশে গণতন্ত্র নেই বলছেন, তাদের অনেকেই অতীতে উর্দি পরা সামরিক শাসকের পরামর্শক ছিলেন। অবাধ তথ্য প্রবাহের সুযোগ নিয়ে সামরিক শাসনের এসব সুবিধা ভোগীরা এখন দেশে গণতন্ত্রের শিক্ষা দিচ্ছেন। যেসব বিকৃত তথ্য সমাজের ক্ষতি করে, মানুষকে বিভ্রান্ত করে তা বন্ধ করতে তিনি সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি নির্দেশ দেন।

 
গতকাল বুধবার সার্কিট হাউজ রোডে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর প্রাঙ্গণে তথ্য ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে যারা সংবিধান সংশোধনের কথা বলেছেন তাদের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, তারা যখন এই কথাগুলো বলেন, তখন তাদের অতীত চেহারাগুলো আমার সামনে চলে আসে। তারাই এক সময় অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী মিলিটারি ডিকটেটরদের উপদেষ্টা ছিলেন, কেউ তাদের সাথে চাকরি করেছেন আবার কেউ তাদের একটু করুণা ভিক্ষার জন্য ধরনা দিয়ে পড়ে থেকেছেন, পদলেহন করেছেন। তখন কিন্তু তাদের এই চেতনাগুলো ছিল না। মনে হচ্ছে তখন তাদের চেতনার দুয়ারটা বন্ধ ছিল। তিনি বলেন, আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মুক্ত বুদ্ধিরচর্চা করার সুযোগ করে দিয়েছে। কথা বলার অধিকার সবার আছে এবং সকলে কিন্তু কথা বলেও যাচ্ছে। যা মনে আসছে, মুখে আসছে বলে যাচ্ছে। আর গণতন্ত্র পাওয়ার এই সুযোগে উনাদের বুদ্ধির দুয়ার এত খুলে যাচ্ছে যে, আরো চাই আরো চাই করছেন। আর এই আরো চাইয়ের যে ক্ষতিকারক দিকটা সেটা তারা চিন্তা করছেন না। এটা করতে গিয়েই কিন্তু মাঝখানে আরেকটা ধাক্কা এসেছিল। সরকারের সমালোচকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যখন যতটুকু সুযোগ পাচ্ছে, তাদের চাহিদার মাত্রা ততটুকু বেড়ে যাচ্ছে। এটা ভালো। চাহিদা থাকা ভালো। এতে আমরা আপত্তি করব না। আমরাও চাই গণতন্ত্র আরো বিকশিত ও সুসংহত হোক। তবে ১৯৯৬ সালের আগে এবং ২০০১ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত কি অবস্থায় ছিলো, কতটুকু কথা বলতে পেরেছেন সেটুকুও তারা যেন একটু চিন্তাভাবনা করেন। আওয়ামী লীগের শাসনামল ছাড়া কখনোই কেউ কথা বলার সুযোগ পায়নি বলে দাবি করেন তিনি। প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ আয়োজিত এক বৈঠকে ‘বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং গণতন্ত্রের স্বার্থে সংবিধান সংশোধন হওয়া জরুরি’ বলে মন্তব্য করেন একাধিক বক্তা। এজন্য সংবিধান সংশোধনের জন্য কমিশন গঠনের তাগিদও দেয়া হয় ওই বৈঠক থেকে।
 
জীবন্ত মানুষকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যার মতো নোংরা কাজ আর হতে পারে না। অথচ আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াত জোট সেটাই করেছে। তারা এ দেশের মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দেশের উন্নয়নের গতিকে তারা স্থবির করে দিতে চেয়েছিল। বিএনপি-জামায়াত যাতে আবারো দেশে কোনো ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালাতে না পারে সেজন্য জনগণকে সচেতন করতে হবে। আর এ গুরু দায়িত্ব পালন করতে পারে গণমাধ্যম। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে এমন কথা বা কাজ না করতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, কেউ কারো ধর্মে আঘাত দিয়ে কোনো কাজ করবে না এবং বলবে না। প্রত্যেক ধর্মের মানুষের তার ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ভোগ করবে। সেইভাবেই আমরা বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চাই।
 
গণমাধ্যমে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা চাই, সমালোচনা হোক। সেই সমালোচনা গঠনমূলক হতে হবে। সমালোচনা যেন কেউ বিকৃত না করে, মানুষকে বিভ্রান্ত না করে। যতটুকু ভালো কাজ করেছি, সমালোচনার সাথে সাথে সেটুকুও বলার যেন সাহস থাকে। সরকারের উন্নয়নের চিত্রও গণমাধ্যমে উঠে আসা দরকার। ভালো কাজের প্রচারের প্রতিফলন যেন ঘটে, মানুষ যাতে বুঝতে পারে যে তাদের জীবন মান উন্নত হচ্ছে। আজ আমরা যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি, সেখান থেকে যাতে আমরা সরে না যাই। সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে জনসচেতনা সৃষ্টি করতে গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশে যাতে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মাথাচারা দিয়ে উঠতে না পারে সেজন্য এর ক্ষতিকর দিকগুলো প্রচার করতে হবে। বিশেষ করে শিশু মনে প্রভাব ফেলে এমন বিষয়ও প্রচারে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা তথ্য কিভাবে উপস্থাপন হচ্ছে, জনগণ কিভাবে নিচ্ছে এটা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে তথ্যগুলো মানুষের উপকারে আসে সেগুলো যেন মানুষের কাছে পৌঁছায়। যে তথ্যগুলো মানুষের ক্ষতি করে বিশেষ করে আমাদের শিশু, তরুণদের বিকৃত রুচি কিংবা চারিত্রিক বিকৃতি না ঘটাতে পারে, সে বিষয়ে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। ক্ষতিকর তথ্য প্রবাহ বন্ধে তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তথ্য মন্ত্রণালয়কে ক্ষতিকর তথ্য প্রবাহ বন্ধে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে।
 
গণতান্ত্রিক সমাজ তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার মুক্তবুদ্ধি চর্চার সুযোগ নিশ্চিত করতে চায়। আর এ জন্য সরকারি গণমাধ্যমের পাশাপাশি দেশে কাজ করছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বেসরকারি গণমাধ্যম। এ পর্যন্ত ৩২টি বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল, ২৪টি এফএম বেতার কেন্দ্র এবং ৩২টি কমিউনিটি রেডিও পরিচালনার অনুমতি দেয়া হয়েছে। বেসরকারি বেতারের অনুমোদনও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই দেয়া হয়েছে। কোনো সরকার তো অতীতে এই সাহসই পায়নি। প্রধানমন্ত্রী হাসতে হাসতে বলেন, আমার বেশ মজাই লাগে। আমরাই দিলাম বেসরকারি টেলিভিশন। আর সেখানে বসে আমাদের সমালোচনাটাই যেন সব থেকে বেশি। সুযোগটা যে আমরা করে দিয়েছি, যারা বলেন, তারা মনে হয় মনে রাখেন না। বেসরকারি টেলিভিশনের কর্ণধারদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজে বিত্তবান ব্যক্তি যারা আছেন, ব্যবসা বাণিজ্য করে মোটা টাকা কামাই করছেন। তারা একটা টেলিভিশন কিনে নিয়ে বসে থাকলে আর ব্যবসার কথা চিন্তা করলে চলবে না। এর মাধ্যমে সমাজকে উন্নত করতে, জনগণের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। একই সাথে বাঙালি হিসাবে আমাদের যে চিন্তা, চেতনা, সংস্কৃতি রয়েছে, শিক্ষা রয়েছে- সেগুলো আরও যাতে বিকশিত হয়, সে বিষয়গুলোর দিকেও বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে।
 
প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের সফলতা তুলে ধরে বলেন, ১৬ কোটি মানুষের দেশে ১২ কোটি ৬৮ লাখ সিম আছে। এ সুযোগটা কে দিয়েছে? আওয়ামী লীগ সরকার করে দিয়েছে। ডিজিটাল সেন্টার আমরা চেয়েছি। গণযোগাযোগ অধিদপ্তর, গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটসহ সব সংস্থাকে পারদর্শী হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২?১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিণত করব। সেটার জন্য প্রচার দরকার। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, সেটা প্রচার করা এবং সামনে নিয়ে আসা দরকার। ইনশাল্লাহ, আর কেউ বাংলাদেশকে আটকাতে পারবে না। এ বিশ্বাস আমাদের আছে। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে।
 
তথ্য সচিব মর্তুজা আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবাহান চৌধুরী, তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদের স্থায়ী কমিটির সভাপতি এ কে এম রহমত উল্লাহ, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ লিয়াকত আলী খান প্রমুখ। ৬০ কোটি টাকার বেশি অর্থ ব্যয়ে ১৬ তলা তথ্য ভবনের নির্মাণ কাজ ২০১৬ সালের মধ্যে শেষ হবে। এ ভবনে অফিস স্থাপনের পাশাপাশি আধুনিক লাইব্রেরি, গবেষণা কেন্দ্র, ফিল্ম প্রজেকশন হল, অডিটোরিয়াম, ডিজিটাল তথ্য ভাণ্ডার থাকবে।