১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে যে ভয়াবহ ঘটনা ঘটলো, বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সপরিবারে হত্যা করা হলো। এটি ছিল একটি নীল নকশা । স্বাধীনতার পরপরই যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল তারা শুধু নয় দেশের বাইরের কিছু বৃহত্ শক্তি যারা পাকিস্তানকে ভাঙতে চায়নি অর্থাত্ ৬ দফার ভিত্তিতে সাধারণ মানুষের মুক্তির ভিত্তিতে যে দেশ স্বাধীন হয়েছিল এটা তারা ভাল চোখে দেখতে পায়নি। কারণ তাদের ছিল শোষণ করার মানসিকতা এবং তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর উপর খবরদারি করতে পারবে না, তাদের উপর আর নির্ভর করবে না এই হীন মানসিকতার জন্যই তারা এই ঘটনা ঘটিয়েছিল।
স্বাধীনতার পরপরই দেখলো শেখ মুজিব যেভাবে বাংলাদেশের সংবিধান রচনা করলেন, সমাজতন্ত্র ভিত্তিক একটি অর্থনৈতিক নির্ভর যে অবকাঠামো তৈরি করলেন এতে তারা শংকিত হয়ে ওঠলো আরো বেশি। এবং সেই সময় বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছর পর বাকশাল নামে যে রাজনৈতিক মঞ্চ তৈরি করলেন এবং এ দেশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য যে আইন প্রণয়ন করলেন তাতে আমাদের শত্রুরা এবং বিদেশি আগ্রাসী শত্রুরা শংকিত হয়ে উঠলো। কারণ এই বাকশাল ভিত্তিক অর্থনৈতিক মুক্তির বিষয়টি যদি দাঁড়িয়ে যায় তাহলে এদেশকে পদানত করা ও শোষণকরা কঠিন হয়ে যাবে। সর্বতোভাবে বাংলাদেশ নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে একটি দৃষ্টান্তমূলক স্বাধীন দেশ হিসাবে বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে যাবে। এটা তারা সহ্য করতে পারলো না বলে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য কুচক্রী মহল নীল নকশার তৈরি করে এবং একই সঙ্গে ৬ দফার অপব্যাখ্যা ও ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিক্ষোব্ধ ও সন্দেহপ্রবণ করার পায়তারা করলো। অথচ বাকশাল কখোনই এ দেশের মানুষের অকল্যাণের জন্য করা হয়নি। বঙ্গবন্ধুর মূল বিষয়টিই ছিল তিনি সারা দেশকে ৬০টি জেলায় ভাগ করলেন এবং এর প্রত্যেক জেলার জন্য নিজস্ব উত্পাদন, বন্টন ও স্বায়ত্বশাসন ব্যবস্থা করলেন। কোন জেলায় যদি উত্পাদন কম হয় বা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকে সেজন্যে কেন্দ্রিয় শাসন ব্যবস্থা তা দেখভাল করবে, সে সঙ্গে উত্পাদন বাড়াবে। এমন একটি সুন্দর প্রক্রিয়া শাসন ব্যবস্থা ছিল বাংলাদেশের সর্বোত্তম শাসন ব্যবস্থা। এটিকে স্তব্ধ করবার জন্যই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার পরপরই স্বাধীনতার পক্ষের অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের অনেককে জেলে বন্দি করা হলো। যেমন-তাজউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামরুজ্জামান প্রমুখ। তিন মাসের মাথায় আমরা দেখতে পেলাম আরেকটি ভয়াবহ রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। জেলখানায় নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো তাদেরকে। সারা পৃথিবীতে এই ধরনের জঘন্য হত্যার কোন নজির নেই।
পরবর্তীকালে আমরা দেখি বাংলাদেশের ক্ষমতায় পরপর এলেন মোশতাক গং এবং রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও হত্যাযজ্ঞের পর ক্ষমতায় বসলেন জিয়াউর রহমান এবং ইতিমধ্যেই যারা বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিল, ৩০ লক্ষ্য মানুষেরে হত্যা করেছিল, যারা পাকহানাদার বাহিনীর দোসর ছিল সেই তাদের নেতা গোলাম আজমসহ ৮৬ জন যুদ্ধাপরাধী ও হত্যাকারী যাদের বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বাতিল করেছিলেন এবং যাদেরকে যুদ্ধাপরাধী হিসাবে বিচারের ব্যবস্থা নিচ্ছিলেন তাদের সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দিয়ে দেশের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিল জিয়াউর রহমান, শুধু এটাই নয়, তাদেরকে ক্ষমতায় বসানো হলো এবং তাদের অনেকেই বাংলাদেশের মন্ত্রিত্বও পেলেন। সুতরাং আমরা জানি ১৫ আগস্টের বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল কারণ কি এবং কারা বেনিফিশিয়ারী বেশি, তা পরিষ্কার হয়ে যায়। সেই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখছি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর শুরু হলো, বঙ্গবন্ধু হত্যার যে বিচারটি হয়েছে এবং বর্তমানে যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে সেই জিয়াউর রহমান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত দলটি জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়ে তারা এখনও এদেশের স্বাধীনতার শক্তিকে, দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তারা নানান ইস্যু তোলে হরতাল, পেট্রোলবোমা মেরে নিরীহ মানুষকে হত্যা, যানবাহনকে জ্বালিয়ে দেয়া, সাধারণ মানুষের জীবন-যাপন কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়ার জন্যে যে ধ্বংসলীলা চালিয়ে গিয়েছিল তা বঙ্গবন্ধু কন্যা, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশের মানুষের আশা-ভরসা, প্রধান চালিকাশক্তি শেখ হাসিনা তার দুশাহসিক চিন্তা, চেতনা ও মেধার স্ফূরণ ঘটিয়ে সব বাধা অতিক্রম করে চলেছেন। তাই সাধারণ মানুষ সমস্ত অপশক্তিকে রুখে দেবে, কোন অপশক্তি বাংলাদেশের উন্নতিকে ব্যাহত করতে পারবে না। কারণ বঙ্গবন্ধু শুধু স্বাধীনতা দিয়ে যাননি তিনি এক একজন মানুষকে স্বাধীনতার সংগ্রামের শক্তি ও চেতনা মননে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং এখন প্রতিটি বাঙালিই এক একটি শেখ মুজিবুর রহমান।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু
[লেখক: চিত্রশিল্পী]
