আফিমখোর ‘কমলাকান্ত’

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০১৫, ১২:৫৯

নাট্যবেদের ষষ্ঠ প্রযোজনা ‘কমলাকান্ত’ নাটকটির ওপেনিং প্রদর্শনী দেখার সুযোগ ঘটল ৮ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ হলে। এ নাটকটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘কমলাকান্ত’ অবলম্বনে নাট্যরূপ দিয়েছেন নাসরীন মুস্তাফা। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কমলাকান্ত’ নামটি অক্ষুণ্ন রেখে কিছুটা যোজন-বিয়োজন করে স্বকাল ও স্বভূমির উপর দাঁড় করিয়ে একটি সমকালীন নাটক আমাদের উপহার দিয়েছেন নাট্যকার নাসরীন মুস্তাফা। আর এই নাটকটি মঞ্চে প্রয়োগ করেছেন নাট্যব্যক্তিত্ব ও বিশিষ্ট নাট্য নির্দেশক গোলাম সারোয়ার। কমলাকান্ত আফিমে বুঁদ হয়ে থাকা একজন লেখক। আর লেখকমাত্রই তো লেখার আফিমে বুঁদ হয়ে যাওয়া এক মনুষ্য সন্তান! আর দশজন যেভাবে ভাবে, সেভাবে সে ভাবে না। সে তো আফিম না খেলেও সমাজ তাকে আফিমের তকমা পরিয়েছে অনেক আগে থেকেই। তাই কমলাকান্তদের জ্ঞাতে অজ্ঞাতে আফিম খেতেই হয়। নইলে তার লেখা আসে না। ফিলোসফি আওড়াতে পারে না। কমলাকান্তরা আফিম না খেলেও তাকে আফিমখোর হতে হয়। সমাজের ভেতরের সত্যটাকে বা অসঙ্গতিটাকে কমলাকান্তরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন, যা মেনে নিতে পারেন না রাষ্ট্র তথা কর্তাব্যক্তিরা। এই কমলাকান্তদের মেরেও ফেলতে পারেন না সমাজের ঊর্ধ্বতনরা। তাই তাদের আসন টিকিয়ে রাখার জন্য তারা আফিমখোর হিসেবে কমলাকান্তদের চালিয়ে দেন। তাতে সাপও না মরে লাঠিও না ভাঙে। তাই তো এ নাটকে কমলাকান্ত আফিমখোর। আফিমের পয়সা জোগাতে সে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় লেখে। কমলাকান্ত একটি অসাধারণ চরিত্র। লোকে কমলাকান্তকে পাগলই জানে। কমলাকান্তের কাজকর্ম-চলাফেরা-কথাবার্তা প্রথাগত থেকে আলাদা। কমলাকান্ত আফিম সেবন করে। আফিমের নেশা যখন তুঙ্গে অথবা জমে ওঠে যখন নেশা, তখন সমাজের তিক্ত সত্যগুলো তার চিন্তায় বাসা বাঁধে। এসব চিন্তাভাবনা নিয়ে কমলাকান্ত লেখে যা কিনা ভীষ্মদেব খোশনবিস ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার মাধ্যমে প্রচার করে। অন্যদিকে প্রসন্ন গোয়ালিনীর মঙ্গলা নামের গাভিটির দুধের প্রতি আসক্তি আছে কমলাকান্তের। একদিন প্রসন্ন গোয়ালিনীর গাভিটি চুরি গেল। গাভি খুঁজে পাওয়া যায় না। একসময় চোরকে ধরা গেল। গাভিটি চিহ্নিত করতে সাক্ষ্য দেবে কমলাকান্ত। এই সাক্ষ্য দিতে এসে কমলাকান্ত বাঁধিয়ে দিল গোল বা বিপত্তি। এভাবেই নাট্যাখ্যান এগিয়ে চলে সিরিয়াস মুডে হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিতে। এ রকম সহজ-সরল গল্পের ঝাপি থেকে বেরিয়ে আসে আফিমখোর কমলাকান্তের চিন্তাপ্রসূত পতঙ্গ, কুকুর, বিড়াল, গোলাপ, মল্লিকাবৃক্ষ প্রমুখ চরিত্রসকল। সে সকল চরিত্রের মুখ দিয়ে বলিয়ে নেয় সমাজের সুন্দর রূপের কথা। সেই সাথে নগ্ন-কুিসত রূপও আমাদের দেখিয়ে দেয় আফিমখোর কমলাকান্তের চরিত্ররা। তাই তো নাটক দেখার পর আফিমের ঘোরেই রাত দিন গুজরান করছি। কমলাকান্তের মতো আরও হাজারো কমলাকান্তের আফিমের নেশা না কাটুক। আফিমের ঘোর কাটলেই বেঘোরে ঘুমাবে সমাজপতিরা! সুখনিদ্রায়। কিন্তু প্রসন্ন গোয়ালিনীরা যে জেগে জেগে গরু খুঁজছে। যা তার একমাত্র রোজগারের পথ। গোয়ালিনী কোর্টের দ্বারস্থ হয়ে আদৌ নিজের গরু পাবে নাকি চোরকে যৌক্তিক চোর বানিয়ে আফিমখোর কমলাকান্ত চোরকে ভালো মানুষ বানিয়ে খালাস করবে! নাকি শেষ পযন্ত গাভিটির দুধের সোয়াদে সোয়াদে প্রসন্ন গোয়ালিনীর পক্ষে সাক্ষ্য দেবে? হঠাত্ গাভিটি কোর্টকে অমান্য করে নেচে ওঠে। পৃথিবীর সকল শৃঙ্খলকেই যেন ‘না’ করে দড়ি ছিঁড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। শুরু হয় আরেক নাটক শৃঙ্খল মুক্তির নাটক। নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে রূপদান করেছেন মোস্তাফিজুর রহমান, টিপু খান, প্রমি আশরাফ, লিমন হোসেন, জহিরুল ইসলাম, কানন আহমেদ, বাবুল, সুমাইয়া সরকার, এমএইচ পলাশ, ফারজানা মুক্তো, ইমরান, রিমন, পাভেল কুমার সাহা, সাহেদ আহম্মেদ, রাবেয়া রাবু, আবুল কাশেম রাতুল প্রমুখ। একেবারে নতুন নাট্যকর্মীদের নিয়ে প্রযোজনাটির অভিনয় দুর্বলতা ও প্রথম প্রদর্শনী হিসেবে টুকটাক ভুলভ্রান্তি থাকতেই পারে। তবে এটুকু হলফ করেই বলতে পারি, বাংলা নাট্যভ্রমণে আরও একটি সফল নাটকের প্রায়োগিক ভাবনা যুক্ত হলো। যেনবা থিয়েটারেরই মুক্তি ঘটল গোলাম সারোয়ার, নাসরীন মুস্তফা তথা নাট্যবেদের যৌথ মিথষ্ক্রিয়ায়।