মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা ব্লুম বার্নিকাট বলেছেন, খাদ্য উত্পাদন এবং নিরাপত্তায় বাংলাদেশ দারুণ অগ্রগতি করলেও কিছু অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত শক্তির দ্বারা অরক্ষিত। তিনি বলেন, বিশ্ব খাদ্য মূল্যের ওঠানামা, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, মৌসুমি বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ—এই সবকিছুই এখন পর্যন্ত যে অগ্রগতি হয়েছে তাকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে বিশেষ করে যারা দরিদ্র এবং সুবিধাবঞ্চিত তাদের উন্নয়নের জন্য এখনও অনেক কিছু করতে হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি হোটেলে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ইউএসএআইডি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে শান্তির জন্য খাদ্য কর্মসূচি ২০১০-২০১৫: সাম্প্রতিক অর্জন ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে সরকার দেশে দারিদ্র্যের হার ৪৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তাসহ নানা সূচকে অনেক এগিয়ে গেছে। তবে এখনো যেটুকু প্রতিবন্ধকতা আছে তা কাটিয়ে উঠতে সরকার নানামুখী কর্মসূচি নিচ্ছে। অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব শাহ কামাল ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় সচিব আব্দুল মালেক। সূচনা বক্তব্য রাখেন ইউএসএআইডির মিশন ডিরেক্টর ইয়ানিনা জেরুজালেস্কি।
যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বলেন, গত ৪৫ বছর ধরে বাংলাদেশ নাগরিকদের খাদ্য নিরাপত্তা উন্নয়নে দারুণ অগ্রগতি করছে। আমরা বাংলাদেশের অসাধারণ অর্জন প্রত্যক্ষ করেছি। বাংলাদেশ এখন চাল উত্পাদনে প্রায় স্বনির্ভর। চরম দারিদ্র্য গত কয়েক বছরে এখন অনেকটাই কমে এসেছে, স্বাস্থ্যসেবার জন্য মানুষ আরো সুযোগ পাচ্ছে এবং তারা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সুস্থ ও উত্পাদনশীল।
তবে বার্নিকাট বলেন, প্রায় তিন কোটি বাংলাদেশি এখনো হতদরিদ্র এবং ক্রমাগত অপুষ্টিতে ভুগছে। বিশেষজ্ঞরা হিসাব করে দেখেছেন যে কমপক্ষে ছয় কোটি বাংলাদেশি প্রতিবছর ছয় থেকে সাত মাস পর্যাপ্ত খাদ্য পায় না। এই পরিবারগুলো দিনে তিনবেলা খাবার ও সুষম খাদ্য পায় না। শিশুদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি আরো ভয়াবহ। ২০১৪ সালের জনতাত্ত্বিক এবং স্বাস্থ্য জরিপের উপাত্ত খুবই পীড়াদায়ক। পাঁচ বছরের নিচের ৩৬ শতাংশ শিশু তাদের বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত লম্বা নয় অথবা খর্বাকৃতি। এটি শিশুদের স্বাস্থ্যে ও বুদ্ধিবৃত্তিতে প্রভাব ফেলে। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করছে।
মার্কিন এই কূটনীতিক বলেন, গত পাঁচ বছরে ইউএসএআইডি ‘শান্তির জন্য খাদ্য’ কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশের দরিদ্র ও অরক্ষিত ৩৫ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছেছে। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা মোকাবিলার জন্য এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র ও অরক্ষিত মানুষদের জন্য এই বছর ইউএসএআইডি পাঁচ বছর মেয়াদি ১৮ কোটি ডলারের নতুন প্রকল্প শুরু করতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, গত পাঁচ বছরের সাফল্যের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ‘শান্তির জন্য খাদ্য’ কর্মসূচি নতুন পর্যায়ে তিনটি চলমান লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে। তা হলো— স্থানীয় কৃষিপণ্যের উত্পাদন, ভোগ ও বাজার বৃদ্ধি করার মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা বাড়ানো; খাদ্যাভ্যাস উন্নত ও পরিবারগুলোকে তাদের সন্তানদের পর্যাপ্ত খাবার সরবরাহে সহায়তা করার মাধ্যমে অপুষ্টির হার কমানো এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি ও দুর্যোগ পরবর্তী ব্যবস্থা আরো দ্রুত ও সাফল্যের সাথে গ্রহণ করতে সরকারি সংস্থা ও কমিউনিটিগুলোকে সাহায্য করার মাধ্যমে দুর্যোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট আরো বলেন, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, অপুষ্টি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধে একদিনে অথবা এক বছরে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়। এই সমস্যাগুলো সমাধানে সরকারের সব পর্যায়, দাতা কমিউনিটি, সুশীল সমাজ ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে ।
অনুষ্ঠানে ইউএসএআইডির মিশন ডিরেক্টর ইয়ানিনা জেরুজালেস্কি বলেন, ‘শান্তির জন্য খাদ্য’ কর্মসূচির আওতায় ২০১০ সালের মে মাস থেকে বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় থাকা বাংলাদেশের সাড়ে ছয় লাখ পরিবারের গবাদিপশুর স্বাস্থ্য, কৃষি, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসহ গ্রামীণ জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সাহায্য করেছে ইউএসএআইডি। চলতি বছর এই কর্মসূচি শেষ হয়েছে। নতুন করে ১৮ কোটি ডলারের কর্মসূচি আবার শুরু হতে যাচ্ছে। ইউএসএআইডির অনুদানে পরিচালিত কর্মসূচিটি বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় কেয়ার, সেভ দ্য চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল এবং এসিডিআই/ভিওসিএ বাস্তবায়ন করে।
বন্যপ্রাণী পাচার রোধে কর্মশালা:আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট গতকাল মিরপুরের পুলিশ স্টাফ কলেজে ‘বন্যপ্রাণী পাচার রোধ কর্মশালা: বাঘ রক্ষা ও সংরক্ষণ ২০১৫’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন। কর্মশালাটি বুধবার উদ্বোধন করেন ইউএসএআইডির মিশন ডিরেক্টর ইয়ানিনা জেরুজালেস্কি এবং বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. কামাল উদ্দীন আহমেদ। দুদিনের এই কর্মশালায় বিচারক, শিক্ষাবিদ, কৌঁসুলিসহ পুলিশ, বন মন্ত্রণালয়, কাস্টমস, কোস্টগার্ড ও এনজিওর ৬০ জনেরও বেশি প্রতিনিধি অংশ নেন। কর্মশালায় সুন্দরবনে বাঘের বর্তমান সংখ্যা, আন্তঃসংস্থা সহযোগিতা, বন্য প্রাণী পাচার অপরাধ আইন, তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থার উত্কৃষ্ট উদাহরণ এবং ভবিষ্যত্ পাচার বন্ধে অ্যাকশন প্ল্যানের ওপর উপস্থাপনা ও প্যানেল আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানটির আয়োজন ও পৃষ্ঠপোষকতা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস অফিস অব ওভারসিজ প্রসিকিউটোরিয়াল ডেভেলপমেন্ট, অ্যাসিসটেন্স অ্যান্ড ট্রেনিং (অপড্যাট), যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের জাস্টিস ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ট্রেনিং অ্যান্ড অ্যাসিসটেন্স প্রোগ্রাম (ইসিট্যাপ), যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ইউএসএআইডি) এবং পররাষ্ট্র দফতরের আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্য ও আইন-শৃঙ্খলা অ্যাফেয়ার্স ব্যুরো (আইএনএল)।
