সকাল ৮টায় স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া আমেনা। কিন্তু আকাশে মেঘ। বৃষ্টি হতে পারে, ডুবে যেতে পারে স্কুলে যাওয়ার একমাত্র বাহন নৌকাটি। তবুও ঝুঁকি নিয়ে রওয়ানা হতে হয়। সামান্য ঢেউয়ে নৌকা উল্টে যাওয়ারও শঙ্কা আছে। আবার খোলা নৌকায় তীব্র রোদের তাপও সহ্য করতে হয়। এভাবে নানা জানা-অজানা শঙ্কা নিয়ে চার কিলোমিটার হাওর পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন স্কুলে আসে আমেনা। শুধু আমেনা না, রহিম, আলিমসহ হাওর এলাকার সব শিক্ষার্থীকেই আসতে হয় একমাত্র বাহন নৌকায়।
আবার স্কুলে আসার পরও তৈরি হয় নতুন শঙ্কা। ছোট নৌকা, সামান্য বৃষ্টির পানি জমলেই ডুবে যায়। এ কারণে কখনো কখনো আকাশে মেঘ দেখলেই স্কুল ছুটি দেয়া হয়, যাতে বৃষ্টি শুরুর আগেই বাড়ি ফেরা যায়। আবার হঠাত্ সজোরে বৃষ্টি শুরু হলেও ছুটির পর স্কুলে বসিয়ে রাখা হয়– কখন বৃষ্টি থামবে। বৃষ্টি না থামলে রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। আবার রাতের হাওরের নীরবতাও শিক্ষার্থীদের মনে ভীতি তৈরি করে।
সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার বেহেলী ইউনিয়নের হাওর বেষ্টিত দুর্গম এলাকার হালির হাওরের হাওড়িয়া আলীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্কুলটির চারপাশেই হাওর। তিন কক্ষের স্কুলটি ছাড়া আর কোন জায়গা নেই যেখানে শিশুরা খেলাধুলার সুযোগ পায়। একটি নৌকাই স্কুলের শিক্ষার্থীদের আনা-নেয়ার একমাত্র বাহন। এই স্কুলের ৭৫ শিক্ষার্থীকে আনা-নেয়ার কাজ করছে ৬৫ বছর বয়সী আলফাজ উদ্দিন। শিক্ষার্থী প্রতি অভিভাবকদের কাছ থেকে নিচ্ছেন ৫০ টাকা, আলফাজ উদ্দিন অসুস্থ হয়ে পড়লে স্কুলে যাওয়ার ক্ষেত্রে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। বিকল্প কোন ব্যবস্থাও নেই। স্কুলের প্রধান শিক্ষক তোফাজ্জল হোসেন জানান, স্কুলে ৭৫ জন শিক্ষার্থী থাকলেও উপস্থিত হয় ৫০ থেকে ৫৫ জন। এটি ডবল শিফটের স্কুল। দু’বারে শিক্ষার্থীদের আনা-নেয়া করা হয়, জানালেন নৌকার মাঝি আলফাজ উদ্দিন। যে স্কুলের শিক্ষার্থী বেশি তাদের আনা-নেয়া করতে অনেক সময় লেগে যায়। অপেক্ষা কখন নৌকা আসবে, কখন ঘরে ফিরবে।
হাওর এলাকার হরিণাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাওরিয়া আলীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাধানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে হাওরের শিক্ষার্থীদের এ চিত্র দেখা গেছে। এমন চিত্র হাওর এলাকার প্রতিটি স্কুলেরই। এ উপজেলায় ১৯২টি গ্রামে ১২৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। যার বেশিরভাগই হাওর এলাকার। যাদের সবাইকেই কম বেশি ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে আসতে হয়। স্থানীয় এক অধিবাসী বলেন, এখানকার শিক্ষার্থীরা ঝুঁকি নিয়েই স্কুলে আসে। অনেক সময় নৌকা ডুবে যায়। তবে হাওর এলাকার শিশুরা সাঁতার জানে; এ কারণে হতাহতের ঘটনা নেই।
এ তো বর্ষাকালের চিত্র। যখন হাওরে পানি থাকে না; তখনও ভিন্ন সমস্যা। কোন বাহনই তখন চলে না। পায়ে হেঁটে মাইলের পর মাইল দূরে স্কুলে আসতে হয় শিক্ষার্থীদের। দারিদ্র্যপীড়িত এলাকা হওয়ায় স্কুলে টিফিন নিয়ে আসে না কেউ। হাওর এলাকায় স্কুল ফিডিং কার্যক্রমও নেই। ফলে দরিদ্র শিশুরা ক্ষুধা নিয়ে ক্লাস করে। উপজেলার স্থানীয় এক অধিবাসী আমিরুল জানান, এখানকার স্কুলের শিক্ষার্থীরা অনেকে পানি খেয়েই পেট ভরে রাখে। ফলে পড়াশোনায় মনোযোগী হতে পারে না। বার্ষিক ফলও ভালো নয়। উপস্থিতিও কম।
হরিণাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, স্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে ১৫ জন শিক্ষার্থী থাকলেও উপস্থিত ছিল মাত্র পাঁচ জন। এ প্রসঙ্গে প্রধান শিক্ষক তুলি রানি বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় শিক্ষার্থীরা স্কুলে উপস্থিত হতে চায় না। তিনি জানান, আমিও অনেক কষ্ট করে স্কুলে আসি, যা না দেখলে বোঝানো যাবে না। স্থানীয় অধিবাসী আরিফুল হক জানান, হাওর এলাকার অধিকাংশ স্থান বর্ষা মৌসুমে ডুবে থাকে, নৌকা ছাড়া যাতায়াতের উপায় থাকে না। আবার নৌকায় করে স্কুলে যাওয়ার মতো পয়সা অনেকের নেই। অনেক সময় যে জায়গায় স্কুল সেখানে নিয়মিত যাতায়াতের জন্য কোনো নৌকাও পাওয়া যায় না। এ পরিস্থিতিতে অনেক শিশু বর্ষায় স্কুলে যেতে চায় না বা তাদের অভিভাবকরাও তাদের পাঠাতে চায় না। তাই স্কুল কর্তৃপক্ষ বা শিক্ষা বিভাগ থেকে বর্ষায় স্কুলে যাতায়াত করার জন্য নৌকার ব্যবস্থা করা উচিত।
যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকার কারণে শিক্ষকরাও স্কুলে আসেন না। প্রায়ই স্কুলে শিক্ষক অনুপস্থিত থাকে। স্কুলে যথাসময়ে উপস্থিত না থাকা, টাকার বিনিময়ে স্কুল এলাকার অন্য কাউকে শিক্ষক হিসাবে অনৈতিকভাবে দায়িত্ব দেয়াসহ নানা কারণে ১৫ শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এছাড়া মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়েছে শতাধিক শিক্ষককে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ২০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যেতে হয় শিক্ষকদের। উপজেলার ১০ থেকে ১২টি স্কুলের শিক্ষকরা দলবদ্ধ হয়ে ইঞ্জিনচালিত একটি নৌকায় স্কুলে আসেন। যার স্কুল কাছাকাছি তিনি যথাসময়ে স্কুলে পৌঁছলেও সবশেষে যার স্কুল তার পৌঁছতে ২ ঘন্টা দেরি হয়। যথাসময়ে পৌঁছার কোন উপায় নেই তার। আবার ফেরার সময় একই অবস্থা। যার স্কুল দূরে তাকে ২ ঘন্টা আগে রওনা দিতে হয়। নইলে নৌকা চলে যাবে। সবাইকে এক নৌকায় স্কুলে পৌঁছে দেয়ার কারণে সবারই স্কুলে পৌঁছতে দেরি হয়। আবার আগেই স্কুল ছুটি দিয়ে ফিরতে হয়।
স্থানীয়রা বলছেন, প্রচলন আছে অতীত কাল থেকে জামালগঞ্জের মানুষ, ‘মোটা চালের সেরেক ভাত’ পেটপুরে খেয়ে অশিক্ষার অন্ধকারে নিমজ্জিত থেকে দিব্যি আরামে নাক ডেকে ঘুমিয়ে কাটিয়েছে যুগের পর যুগ। মানুষ সচেতন হয়েছে। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে শিক্ষায় উন্নতি করতে পারছে না।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. নুরুল আলম ভুঁইয়া বলেন, হাওর এলাকার শিক্ষার্থীরা কষ্ট করেই স্কুলে আসা-যাওয়া করে। এ কারণে স্কুলে উপস্থিতিও কম। উপজেলা নির্বাহী অফিসার এসএম শফি কামাল বলেন, হাওরের শিক্ষা কষ্টের। অনেক কষ্ট করেই তাদের স্কুলে আসা-যাওয়া করতে হয়।
