থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রে জোড়া বোমা বিস্ফোরণে অন্তত ২৭ জন নিহত হয়েছে। গতকাল সোমবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় ইরাওয়ান শ্রাইন নামে খুব পরিচিত একটি মন্দিরের বাইরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে আহত হয়েছে ২৫ জনের বেশি। নিহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। এদের মধ্যে বিদেশি পর্যটকও রয়েছেন। তবে চীন ও তাইওয়ানের পর্যটক বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। হামলার দায় তাত্ক্ষনিকভাবে কেউ স্বীকার করেনি। খবর বিবিসি, ব্যাংকক পোস্ট, দ্য নেশন, রয়টার্স ও এনডিটিভি’র।
পুলিশ জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬ টা ৫৫ মিনিটে ইরাওয়ান শ্রাইনের সামনে রাজপ্রাসং ইন্টারসেকশনে একটি মোটরসাইকেলের পিছনে বেধে রাখা বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এর কিছুক্ষণ পর দুটি ট্যাক্সিতেও বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণে মন্দিরটির আশেপাশের লোকজন হতাহত হয়েছে। প্রধান সড়কে জ্বলে যাওয়া মোটরসাইকেল পড়ে থাকতে দেখা গেছে। ঘটনার পরপরই সেনাবাহিনী এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেখানে ছুটে যান। কর্মকর্মতারা সেখানে দুটি অবিস্ফোরিত বোমা পড়ে থাকতে দেখেন। সেনাবাহিনীর একটি বোমা বিশেষজ্ঞ দল বোমাগুলো নিষ্ক্রিয় করেন। জাতীয় উপ-পুলিশ প্রধান আয়েক আংসানানোদ বলেন, ‘এই মুহূর্তে বলা যায়, ব্যাংককের কেন্দ্রস্থলে মোটরসাইকেল বোমাসহ একটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।’ এতে মানুষ হতাহত হয়েছে বলে জানালেও এ ব্যাপারে বিস্তারিত আর কিছু জানাতে পারেননি তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, রাস্তায় অনেক মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখেছেন তারা। ঘটনাস্থলে আশেপাশে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মানুষজনের হুড়োহুড়িতে রাস্তায় যানজটের কারণে জরুরি সেবা দিতে আসা অ্যাম্বুলেন্স ও নিরাপত্তা বাহিনীর গাড়ি সেদিকে যেতে সমস্যায় পড়ে।
দেশটিতে গুজব ছড়িয়ে পড়েছে যে, প্রধানমন্ত্রী প্রাইয়ূত চান ও চা জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন এবং মঙ্গলবার সকল স্কুল-কলেজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছেন। ব্যাংক অব থাইল্যান্ড জানিয়েছে, ব্যাংক বন্ধ রাখার ঘোষণার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভুয়া। থাইল্যান্ডের উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী প্রাউইত ওয়াংসুয়ান নিহত এবং আহতদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে জানান, শিগশিগরই জানানো হবে এই হামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত না কি সন্ত্রাসী হামলা। জেনারেল প্রাউইত বলেন, এটা পরিষ্কার যে, এই নৃশংস ঘটনার পরিকল্পনাকারীরা দেশের অর্থনীতি এবং পর্যটন কেন্দ্রকে বিনষ্ট করার জন্যই হামলা চালিয়েছে। কারণ তারা রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। এজন্য মানুষ মারাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। নিরাপত্তা বাহিনী হামলার জন্য দক্ষিণের মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সন্দেহ করছে।
পুলিশ জানিয়েছে, বিস্ফোরণস্থল থেকে ৩০ মিটার দূরে ইলেক্ট্রিক সার্কিট পাওয়া গেছে। বোমাটি ছিল খুবই শক্তিশালী। আফগানিস্তান এবং ইরাকে যে ধরনের বোমা হামলা চালানো হয় সেই ধরনের বোমা ছিল এগুলো। আহতদের বেশিরভাগই এশিয়ার পর্যটক বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের পুলিশ জেনারেল হাসপাতাল এবং চুলালংকরন মেমোরিয়ান হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতরা অনেকে চীনা দোভাষী চাচ্ছেন। ফলে সেখানে চীনের নাগরিক রয়েছেন। পুলিশ আয়তাকারে ২শ থেকে ৩শ মিটার ব্যাপী এলাকা ঘিরে রেখেছে। তবে তারা জানিয়েছে, সেখানে আরো কোনো বোমা নেই। তারপরও তদন্তের স্বার্থে স্থানটি ঘিরে রাখা হয়েছে। ঘটনার পর সারা দেশের পর্যটনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সিলম, পাথুমওয়ান, থং লর এবং সুখুমবিত রোডে ব্যাপক হারে তল্লাশি অভিযান চালায় পুলিশ।
ব্যাংকক খুব জনপ্রিয় একটি পর্যটন কেন্দ্র। প্রতি বছর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকরা আসেন বিশেষ করে পশ্চিমা দেশ থেকে। ব্যাংককের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই মন্দিরটি খুবই সুুপরিচিত। একটি পাঁচতারা হোটেলের পাশেই এর অবস্থান। ইরাওয়ান শ্রাইন স্থাপনার মূল আকর্ষণ চারদিকে চারদিকে মুখ খচিত সোনালী রঙের একটি মূর্তি যেটি হিন্দু ধর্মের ব্রক্ষ্মার একটি রূপ। যাকে থাই ভাষায় ‘প্রা রম’ বলা হয়। মন্দিরটি হিন্দু ধর্মের হলেও বৌদ্ধ ধর্মের বহু অনুসারীও প্রতি বছর এখানে আসেন প্রার্থনা করতে। কিছুদিন আগে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এখানেই হয়েছিল। ব্যাংককে রাজনৈতিক বিক্ষোভ মাঝে মাঝে দেখা গেলেও এ ধরনের বোমা হামলার ঘটনা বেশ বিরল।
