শিশু শ্রমিক থেকে ক্রিকেটার আনোয়ার আলী

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০১৫, ১৩:০০
মারকুটে শহিদ আফ্রিদির বিকল্প অলরাউন্ডার পেয়ে গেছে পাকিস্তান। শ্রীলংকায় সদ্যসমাপ্ত সফরের টি-২০ ক্রিকেটে নিজের জাত চিনিয়ে দর্শক আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছে গেছেন আনোয়ার আলী। যিনি শ্রীলংকার কলোম্বোতে অনুষ্ঠিত সিরিজের দ্বিতীয় টি-২০ ম্যাচে মাত্র ১৭ বলের মোকাবেলায় করেছেন ৪৬ রান। তার ওই ব্যাটিংয়ে ছিল চারটি নজরকাড়া ছয় এবং তিনটি চারের মার। আনোয়ার আলীর ওই ব্যাটিংয়ে ভর করে ম্যাচে শ্রীলংকার বিপক্ষে জয়লাভ করে পাকিস্তান।
 
শিশু শ্রমিক আনোয়ার বনে গেছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার। সম্প্রতি বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে কিশোর বয়সে কারখানার শ্রমিকের কাজ করা ২৭ বছর বয়সি এই ক্রিকেটার বলেন, এই অবস্থানে পৌঁছে দেয়ার জন্য আমি মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমার অতীত জীবন কেটেছে কঠিন সংগ্রামের মধ্যদিয়ে। এ সময় আমি একটি মোজা তৈরির কারখানায় কাজ করতাম। তবে স্বপ্ন দেখতাম পাকিস্তানের হয়ে খেলার।
 
নোবেল পুরস্কার বিজয়ী সমাজকর্মী মালালা ইউসুফজাই-এর জন্মস্থান সোয়াত উপত্যকার ছোট্ট গ্রাম জাকা খেল থেকে শিশু বয়সে শহরে চলে এসেছিলেন আনোয়ার আলী। শরিয়া আইন প্রচলনের নামে কট্টরপন্থী ইসলামী মৌলবাদীদের অত্যাচারে বসতভিটা ছেড়ে চলে আসা শরণার্থীদের সঙ্গে তার পরিবার সোয়াত উপত্যকা থেকে পাড়ি জমায় শহরে। করাচির রানদোয়ান শিল্পাঞ্চলে তারা নতুন বসতি গড়ে তোলে। আগেই পিতাকে হারানো আলী সেখানে একটি কারখানায় শিশু শ্রমিক হিসেবে দৈনিক ১৫০ রুপিতে কাজ শুরু করেন।
 
আলী বলেন, নিরাপত্তার খোঁজে করাচি এসে আমরা কঠিন জীবন কাটিয়েছি। এ সময় খাবার সংগ্রহের তাগিদেই আমাকে কাজ করতে হয়েছে। খেলার সুযোগ পাইনি।
 
তিনি বলেন, এ সময় আমি আমার বসকে বলতাম রাতের শিফটে আমার ডিউটি দেয়ার জন্য। তাতে দিনের বেলায় আমি ক্রিকেট খেলার সুযোগ পাব। বস দয়াপরবশ হয়ে আমার অনুরোধে সাড়া দেন ।
 
এ সময় ভাগ্যের জোড়ে স্থানীয় কোচ আজম খানের দৃষ্টিতে পড়ে যান আলী। যিনি বর্তমানে তার অভিভাবক ও পথপ্রদর্শক। 
 
খান বলেন, আমি তার মধ্যে অসাধারণ মেধা দেখতে পেয়ে ট্রায়ালে আসার প্রস্তাব দেই। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে যদি ট্রায়াল সম্পন্ন না হয় তাহলে সে কাজ করতে পারবে না। ফলে মজুরি থেকে বঞ্চিত হবে জেনে আমি তাকে বলি- সে যদি আসে তাহলে আমি তাকে ১৫০ রুপি দেবো।
 
পরেরদিন সে এসে ট্রায়ালে অংশ নেয়। সেখানে তার অসাধারণ বোলিং দেখে সবাই মুগ্ধ হয়।
 
খান বলেন, তবে তাকে নিয়মিত টাকা দেয়া আমার পক্ষে কষ্টকর ছিলো। সৌভাগ্যবশত সে করাচি ইলেক্ট্রিক দলে কাজ পেয়ে যায়। এরপর থেকে অবশ্য আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
 
আলী বলেন, আমার মরহুম পিতা কখনো আমার ক্রিকেট খেলার পক্ষে ছিলেন না। কিন্তু যখন তিনি আমার খেলা দেখলেন এবং খেলা থেকে আমার রোজগার হচ্ছে দেখলেন তখন তার মনোভাবে পরিবর্তন আসে।
 
পরবর্তীতে পাকিস্তান অনূর্ধ্ব-১৯ দলে ডাক পান আলী। ওই দলটিই ২০০৬ সালে শ্রীলংকায় জয় করে জুনিয়ার বিশ্বকাপের শিরোপা। প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে চীরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে নাস্তানাবুদ করে তার ‘বানানা সুইং’ বোলিং। ম্যাচে পাকিস্তানের দেয়া ১০৯ রানের জবাবে ৭১ রানেই অলআউট হয়ে যায় ভারত। যেখানে আলী ৩৫ রানে তুলে নেন প্রতিপক্ষের ৫ উইকেট। 
ওই সময় আলীর শিকারে পরিণত হন রোহিত শর্মা, চেতেশ্বর পুজারা, রবীন্দ্র জাদেজার মতো নামজাদা ক্রিকটাররা। যারা বর্তমানে ভারতের জাতীয় দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দুই বছর পরেই পাকিস্তানের সিনিয়র দলে অভিষেক ঘটে আনোয়ার আলীর। কানাডায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অনুষ্ঠিত টি-২০ ম্যাচে মাত্র দুই ওভার বল করে ১৯ রানের বিপরীতে কোনো উইকেট না পাওয়ায় দল থেকে ছিটকে পড়তে হয় তাকে। ফলে দলের প্রধান অলরাউন্ডার হিসেবে অংশ নেন আবদুল রাজ্জাক। 
 
পরবর্তী ৫ বছর পেশাদার ক্রিকেটের বদৌলতে আনোয়ার তার পরিবারকে আর্থিক অনটন থেকে মুক্তি দিয়ে একটি পরিপাটি বাড়ি নির্মাণ করে দেন। এ সময় তিনি ইংল্যান্ডের ল্যাংকাশায়ারের হয়ে ক্রিকেট খেলতে থাকেন। তবে আন্তর্জাতিক ম্যাচে ফেরার লক্ষ্য থেকে একবারের জন্যও বিচ্যুত হননি। শেষ পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রমের ফলে তিনি সফলতার মুখ দেখেন।
 
আলী বলেন, আমি আমার বোলিং ও ব্যাটিং নিয়ে কাজ করেছি। একই সঙ্গে মনোযোগ দিয়েছি ফিল্ডিংয়ের প্রতি। এসব আমাকে ২০১৩ সালে পাকিস্তান জাতীয় দলে ফিরে আসতে সহায়তা করে। 
 
২০১৩ সালের নভেম্বরে আলী এবং আরেক প্রতিশ্রুতিশীল অলরাউন্ডার বিলওয়াল ভাট্টির নৈপুণ্যে পাকিস্তান দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে স্বাগতিকদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিকভাবে সিরিজ জয় করে। ওই সিরিজেই দু’জনের ওডিআই অভিষেক ঘটেছিল, যা তারা স্মরণীয় করে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
 
তবে দীর্ঘদিন অনিয়মিত থাকার পর পাকিস্তান জাতীয় দলে আলী নিজের অবস্থান সংহত করেছে সাম্প্রতিক শ্রীলংকা সফরের মাধ্যমে। 
 
কোচ ওয়াকার ইউনিস বলেন, শ্রীলংকা সফর দিয়েই আলী দলে পাকাপোক্তভাবে স্থান নিশ্চিত করেছে বললে মিথ্যা বলা হবে না। তার ফিল্ডিং অসাধারণ। সেই সঙ্গে ব্যাটিং ও বোলিংয়েও সে উন্নতি করেছে। যদি কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে উন্নতির এই ধারা ধরে রাখতে পারে তাহলে আগামী দিনে সেই হবে আমাদের প্রধান অলরাউন্ডার। 
 
সূত্র: বাসস।