সবধরনের জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করার বিষয়টি আগেই অর্থমন্ত্রী জানিয়েছিলেন। এর মধ্যে গতকাল গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম আরেক দফা বাড়ানো হল। তেলের দামও সমন্বয় করা হবে শিগগির। কিন্তুু সরকারের এই সিদ্ধান্তে আপাতত সাধারণ জনগণ খুশি হতে পারেনি। ভোক্তা পর্যায়ে সরাসরি দাম বৃদ্ধির বিষয়টি সময়োচিত হয়নি বলেও কারো কারো অভিমত। বিশেষ করে বর্তমানে রাজধানীর কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে অন্যান্য পণ্য ও সেবার দাম যেখানে মানুষের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি করছে, এর উপর সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধির প্রভাব, বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির মধ্যে গ্যাস-বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধি যে সীমিত আয়ের জনগোষ্ঠীকে আরো বাড়তি চাপে ফেলবে-সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পে-কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়ন এবং অন্যান্য খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আয় বৃদ্ধি ছাড়া সরকারের কোন উপায় ছিল না। এর সঙ্গে সরকারের ওপর চাপও ছিল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের কিস্তির টাকা পেতে গ্যাস-বিদ্যুত্ তথা জ্বালানির দাম সমন্বয়ের চাপ ছিল। এই অর্থ পেতে অর্থমন্ত্রী আইএমএফের সকল শর্ত মানার অঙ্গীকারও করেছেন। সেই অবস্থান থেকে সরকারের সরে আসার কোন উপায় ছিল না।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান এ আর খান গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে প্রস্তাব এসেছিল দাম বাড়ানোর। আরো অনেক কিছু বিবেচনা করেই দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়টিও উল্লেখ করেন। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে আসায় এ খাতে ভর্তুকির বদলে বরং বিপুল পরিমাণ অর্থের সাশ্রয় হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের অনেকেই বলেছেন, সরকারের এই সিদ্ধান্তে মূলত নিম্নমধ্যবিত্তরাই বেশি ভোগান্তির শিকার হবেন। যে বাড়তি চাপ তৈরি হবে তা সামাল দিতে জনগণকে বাড়তি আয়ের খোঁজ করতে হবে। কিন্তুু সে সুযোগও খুব বেশি নেই বলে তাদের অভিমত।
অন্যদিকে সিএনজি’র (রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস) দাম বৃদ্ধির ফলে পরিবহন খরচও বেড়ে যাবে। সিএনজি চালিত যানের মাধ্যমে পরিবাহিত পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়াটাও স্বাভাবিক। গণপরিবহন- যেগুলো সিএনজি ব্যবহার করে, তার ভাড়াও বাড়বে। এসব সামাল দেয়া নগরবাসীর জন্য কষ্টকরই হবে।
গৃহস্থালীতে ব্যবহূত গ্যাস নিয়ে অনেকেই বলেন, তরলীকৃত গ্যাস (এলএনজি) ব্যবহার বাড়াতে হবে। কিন্তু তরলীকৃত গ্যাসের বাজার এখন সিন্ডিকেটের দখলে। সরকার নির্দিষ্ট দাম ঠিক করে দিলেও বাজারে তিন থেকে চারগুণ বেশি দামে এলএনজি বিক্রি হচ্ছে। একটি মুষ্টিমেয় গোষ্ঠীর হাতে থাকায় সাধারণ জনগণের পক্ষে এলএনজি ব্যবহার আরো বেশি ভোগান্তির ব্যাপার।
বিদ্যুত্-গ্যাসের দাম বাড়ানোর সমালোচনা করেছেন শিল্পোদ্যোক্তারাও। বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের মতামত উপেক্ষা করে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক নয়। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও দেশীয় বাজারে সমন্বয় করা হয়নি। এরই মধ্যে আবার বিদ্যুত্-গ্যাসের দাম বাড়লো। এর ফলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগীদের সাথে টিকতে পারবো না। ইতিমধ্যে রপ্তানি আয় কমে গেছে। নানামুখী কারণে গার্মেন্টস খাতের উত্পাদন ব্যয় বেড়েছে ২৫ শতাংশ। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুত্ ও গ্যাসভিত্তিক শিল্পের উত্পাদন খরচ আরো বাড়বে। তিনি বলেন, শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা উচিত।
আবার অনেকে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিকে ‘সামঞ্জস্যকরণ’ বলে মন্তব্য করেছেন। পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানোটা আসলে সামঞ্জস্যকরণ। দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা আগে থেকেই ছিল। গ্যাসের দাম কৃত্রিমভাবে কম ছিল। বিশেষ করে গৃহস্থালীর ক্ষেত্রে। এলএনজি দিয়ে ব্যবহার করলে যেখানে সাড়ে তিন হাজার টাকার মতো ব্যয় হয়। সেখানে বর্তমানে গৃহস্থালীতে ব্যয় হচ্ছে মাত্র সাড়ে চারশ’ টাকার মতো। যা বাড়িয়ে সাড়ে ছয়শ’ টাকা করা হয়েছে। এটি প্রয়োজন ছিল।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানো প্রসঙ্গে ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কথা অনেক দিন ধরেই হচ্ছিল। বর্তমানে বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট উত্পাদনে প্রায় ৭ টাকার মতো খরচ পড়ে। আর সরকার পায় গড়ে সাড়ে ৪ টাকার মতো। সুতরাং এই ভর্তুকি কমাতে সামঞ্জস্যকরণ দরকার ছিল। তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমায় বিদ্যুতের উত্পাদন খরচে সরকার কিছুটা সুবিধা পাচ্ছে। তবে সেটাও কতদিন থাকবে তা নির্দিষ্ট নয়।