অন্ধকার ঘর থেকে গেল অন্ধকারেই। অথচ যাদের বিদ্যুত্ সংযোগ আছে তাদের ঘরেই স্থাপন হয়েছে সোলার প্যানেল। শুধু তাই নয়, অস্তিত্ব নেই এমন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নামে সোলার প্যানেল বরাদ্দ নিয়ে তা আত্মসাত্ করা হয়েছে। বরাদ্দের গম তুলে নেয়া হয়েছে রাস্তা-ঘাট সংস্কার না করেই। এভাবেই নয়-ছয় হয়েছে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন বরাদ্দের।
সমপ্রতি সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায় সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি (কাবিখা), কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) ও টেস্ট রিলিফ (টিআর) প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র পাওয়া যায়। প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা সরকারি দলের নেতাকর্মী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি হওয়ায় সহজেই তারা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে নামসর্বস্ব কাজ দেখিয়ে বেশির ভাগ টাকা আত্মসাত্ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সরেজমিনে উপজেলার ধামাইনগর ইউনিয়নের ক্ষিরিতলায় গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্পে উল্লেখিত ‘ক্ষিরিতলা দক্ষিণপাড়া জয়দুর্গা’ মন্দিরের কোন অস্তিত্ব নেই। তবে ‘ক্ষিরিতলা জয়দুর্গা’ নামে একটি মন্দির আছে কিন্তু সেখানে সোলার প্যানেল স্থাপনের মত অবকাঠামোগত অবস্থা নেই। আবার একই এলাকায় ‘সোনাকান্দর জয়দুর্গা মন্দিরের’ নামে একটি সোলার প্যানেল বরাদ্দ করা হলেও এই মন্দিরে বিদ্যুত্ সংযোগ আছে। তাই নিয়ম অনুযায়ী এখানে সোলার প্যানেল বরাদ্দ হওয়ার কথা নয়। এলাকাবাসীর অভিযোগ—স্থানীয় মেম্বার সোলার প্যানেল দুটি বিক্রি করে টাকা আত্মসাত্ করেছেন।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার নৃপেন্দ্রনাথ মাহাতো বলেন, ক্ষিরিতলা জয়দুর্গা মন্দিরে ছাউনি নেই তাই এখানে সোলার প্যানেল বসানো হয়নি। আর অন্যটিতে আগে থেকেই বিদ্যুত্ সংযোগ রয়েছে।
তাহলে এ দুটি মন্দিরের নামে সোলার প্যানেল বরাদ্দ হলো কিভাবে? এসব বরাদ্দতো স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের চাহিদা অনুযায়ীই হয়ে থাকে। এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সোলার প্যানেল ২টি ঠিকাদারকে ফেরত দেয়া হয়েছে।
এদিকে বিদ্যুত্ সংযোগ রয়েছে এমন ব্যক্তির বাড়িতেও কাবিখা কর্মসূচির আওতায় সোলার প্যানেল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। উপজেলার ঘুরকা ইউনিয়নের ঘুরকা গ্রামের বাসিন্দা প্রগতিশীল নারী প্রচেষ্টা (পিএনপি) এনজিও সংস্থার নির্বাহী পরিচালক নিস্কৃতি দাশের বাড়িতে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। যদিও তার বাড়িতে অনেক আগে থেকেই বিদ্যুত্ সরবরাহ রয়েছে। এ ব্যাপারে নিস্কৃতি দাশের স্বামী প্রভাষক গৌতম কুমার কুন্ডুর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি এর সত্যতা স্বীকার করে বলেন, বাড়িতে বিদ্যুত্ সরবরাহ থাকলেও একটি ঘরে নেই। ঐ ঘরে সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে।
উপজেলায় টিআর, কাবিখা, কাবিটা প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের আরো ঘটনা জানা গেছে। ধানগড়া ইউনিয়নের জয়ানপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে মাটি ভরাট প্রকল্পে বরাদ্দ করা হয় ৯ টন গম। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ না করেই বরাদ্দের গম তুলে নেয়া হয়। পরে এলাকাবাসী ইউএনও বরাবরে লিখিত অভিযোগ করলে সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে ইউএনও এবং পিআইও অভিযোগের সত্যতা প্রত্যক্ষ করেন। পরে প্রকল্প কমিটির সভাপতিকে নোটিস করা হলে তারা কাজটি সম্পন্ন করার জন্য সময় প্রার্থনা করেন। এ প্রসঙ্গে প্রকল্প কমিটির সভাপতি স্থানীয় যুবলীগ নেতা মীর ওবায়দুল ইসলাম মাসুম ইত্তেফাককে বলেন, আবহাওয়া খারাপ থাকার কারণে মাটির কাজ করা যায়নি।
একই উপজেলার ধুবিল ইউনিয়নের আমশাড়া ফাজিল মাদ্রাসা মাঠে মাটি ভরাট না করেই প্রকল্প কমিটির সভাপতি সম্পাদক বরাদ্দকৃত ৯ টন গম আত্মসাত্ করেছেন বলে ইউএনও বরাবরে এলাকাবাসী অভিযোগ করেন। পরে প্রশাসনের পদক্ষেপে সেখানে কাজ শুরু করা হয়েছে।
উপজেলার অন্যান্য প্রকল্পের চিত্রও প্রায় একই রকম। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে রায়গঞ্জ উপজেলায় টিআর, কাবিখা ও কাবিটার মোট ৪৭৬টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পগুলোর মধ্যে ছিল রাস্তা-ঘাট সংস্কার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাঠে মাটি ভরাট, সেলার প্যানেল স্থাপন ইত্যাদি।
কাবিখার (সাধারণ) ১৫টি প্রকল্পে ১৫৬ দশমিক ৭৩ টন চাল, ১২টি প্রকল্পে ১৫৬ দশমিক ৫১ টন গম, কাবিখার (বিশেষ) ২০টি প্রকল্পে ১৬৫ টন চাল, ৯টি প্রকল্পে ৮১ টন গম, ১২টি প্রকল্পে নগদ ২২ লাখ ৪০ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। টিআর-এর (সাধারণ) ৮৫টি প্রকল্পে ১৩৮ টন চাল, টিআর (বিশেষ) ৯৩টি প্রকল্পে ১৬৫ টন চাল ও ২৫০টি প্রকল্পে নগদ ৭৬ লাখ ৫১ হাজার ৭৫২ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এছাড়া প্রতিটি সোলার প্যানেলের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ২৫ হাজার থেকে ২৭ হাজার ৮৫০ টাকা।
সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন বরাদ্দের বাস্তবায়নে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে রায়গঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) কামরুল হাসান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের বরাদ্দকৃত খাদ্যসামগ্রী ও টাকা শেষ মুহূর্তে বরাদ্দ পাওয়া গিয়েছিল। তারপরও বাস্তবায়নের হার ভালো। জনবল কম থাকায় সবগুলো প্রকল্প ঠিকমত তদারকি করা সম্ভব হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, কাজ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সবাই সহযোগিতা না করলে যথাযথভাবে কাজ করা বেশ কঠিন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যে বাড়িতে বিদ্যুত্ সংযোগ আছে, সেখানে সোলার প্যানেল বরাদ্দ দেয়া যাবে না। তাহলে বিদ্যুত্ সংযোগ আছে এমন বাড়িতে কিভাবে সোলার প্যানেল স্থাপন হলো? এ প্রসঙ্গে রায়গঞ্জ উপজেলার এ প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বলেন, এসব বরাদ্দ স্থানীয় সংসদ সদস্যের সুপারিশে হয়েছে।
এ ব্যাপারে স্থানীয় (রায়গঞ্জ, তাড়াশ) সংসদ সদস্য আলহাজ্ব গাজী ম ম আমজাদ হোসেন মিলন-এর বক্তব্যের জন্য যোগাযোগ করলে তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আরিফ হোসেন জানান, তিনি বিদেশে রয়েছেন।
