শিশুদের মেধা বিকাশে শিক্ষা কার্যক্রম কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। মুখস্থবিদ্যা নির্ভর পাঠ্যসূচি শিশুদের স্বাভাবিক শিক্ষা গ্রহণে বরং বাধার সৃষ্টি করছে। গ্রাম পর্যায়ে সরকারি স্কুলগুলোতে তো কথাই নেই দেশের স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও প্রথাগত শিক্ষা পদ্ধতির বাইরে মেধা বিকাশের কোন সুযোগ নেই।
এ বাস্তবতায় আমাদের শিক্ষা পদ্ধতিকে কী ঢেলে সাজানো প্রয়োজন? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের শিক্ষানীতি একটি বিশ্বমানের শিক্ষানীতি। এর বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে আমাদের শিক্ষার মানের যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। তবে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, শিশুদের মেধা বিকাশে মুখস্থ বিদ্যার বাইরে কিছু প্রয়োজন। আমাদের সাধারণ শিক্ষাপদ্ধতি তা করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, একটি শিশুর শারীরিক বৃদ্ধির যতটা চিন্তা অভিভাবকরা করেন তার মেধার বিকাশ ঘটছে কিনা সে নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে তাদের ততটা দেখা যায় না। শুধু অভিভাবক কেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাতেও একটি শিশুর মেধা বিকাশের দিকে খুব একটা নজর নেই। একজন শিক্ষার্থীর মেধাবী হওয়ারও তেমন প্রয়োজন নেই। কেননা, আমাদের দেশে মুখস্থ বিদ্যার অনেক দাম। কিন্তু টেকনিক্যাল ও লজিক্যাল বিদ্যার কোন দাম নেই। কারণ পাঠ্যসূচিকে এমনভাবে গঠন করা হয়েছে গত্বাঁধা মুখস্থ না করলে কোনভাবেই ভাল ফলাফল করা সম্ভব নয়। এমনকি লেখাপড়াকে আনন্দদায়ক করে উপস্থাপনেরও কোন ব্যবস্থা নেই। কঠিন এবং নতুন বিষয়ের প্রতি শিশুদের ভীতি সহজাত। সেই বিষয়টিকে আনন্দ দিয়ে শেখানোর পদ্ধতিও নেই। বরং এক নিদারুণ অপমান ও বিভীষিকাময় চাপ তৈরি করা হয় কেউ যদি পড়া না বুঝতে পারে।
নিলুফার ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষার্থী। চতুর্থ শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ওঠার সময় সে দুটি বিষয়ে ফেল করলো। স্কুল থেকে নোটিস দেয়া হলো পরের বছর এমন ফলাফল হলে বহিষ্কার করা হবে। মা-বাবা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন। কেন এমন হলো? তারা মেয়ের সঙ্গে কথা বললেন, স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গেও কথা বললেন। জানলেন, মেয়ে একটু অমনোযোগী। কেন এমন হচ্ছে এ বিষয়ে শিক্ষকরা কিছু বলতে পারছেন না। এরপর তাকে ভর্তি করিয়ে দিলেন ছায়ানটের ‘শিকড়’ কার্যক্রমে। দেখা গেল, অরিগ্যামি, মাটি দিয়ে নানা জিনিস বানানো, ছবি আঁকা এসবের প্রতি মেয়ের খুব আগ্রহ। সহশিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিলে সে খুব আনন্দের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, স্কুলের পড়াশোনাতেও এর প্রভাব দেখা গেল। পড়াশোনায় মনোযোগী হয়ে উঠেছে নিলুফার। এ সুযোগ ছিল না তার ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে। শুধু ইংরেজি মাধ্যম স্কুলেই নয় - দেশের স্বনামধন্য স্কুলগুলোর কোনটিতেই এসব ‘ফালতু’ বিষয়ে ক্লাস করানোর মত নষ্ট করবার সময় নেই স্কুলগুলোর। তারা আছেন বিষয়গুলোতে কিভাবে বেশি নম্বর তোলা যাবে– সেই সূত্র আবিষ্কারের চেষ্টায়। শিশুদের মেধা বিকাশ, পড়ার প্রতি আগ্রহ এসব নিয়ে ভাববার কি সময় আছে কারো?
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের প্রাক্তন পরিচালক অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, শুধু স্কুল-কলেজের কারিক্যুলাম পড়লেই শিক্ষা পূর্ণাঙ্গ হয় না। উন্নত দেশগুলোতে প্রত্যেকটা বিষয়ের আলাদা লাইব্রেরি থাকে। একটি বিষয় পড়ানোর সময় সেই বইয়ের পাশাপাশি সম্পূরক আরও অনেকগুলো বই পড়বার সুযোগ পায় শিক্ষার্থীরা। আমাদের দেশে সে সুযোগ নেই। যেসব স্কুলে লাইব্রেরি রয়েছে তারা ছাত্রদের ব্যবহার করতে দেয় না। অনেক স্কুলে তো লাইব্রেরিই নেই। ফলে বিকল্প শিক্ষার কার্যক্রম যারা চালান তারা শিক্ষা ব্যবস্থার সহায়ক শক্তি। খুব ভালো হতো যদি সরকারি ব্যবস্থাপনায় এই বিষয়গুলো থাকতো। কিন্তু তা যখন সম্ভব হচ্ছে না তখন এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহযোগিতা দেয়া জরুরি। আর এই কার্যক্রমগুলো শহরের চাইতে গ্রামে পৌঁছানো বেশি জরুরি। শহরে একজনের আগ্রহ থাকলে সে প্রয়োজনীয় উপকরণ জোগাড় করতে পারবেন। কিন্তু গ্রামে সেটা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান এ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র শিশু-কিশোরদের মেধা বিকাশ কার্যক্রমকে দেশব্যাপী একটি কাঠামোর ওপরে দাঁড় করাতে পেরেছে। এছাড়া ‘ফুলকি’ নামের একটি সংগঠনও মেধা-মননের বিকাশে স্কুলভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ছায়ানটের ‘শিকড়’ কার্যক্রম শিশুদের দেশের সংস্কৃতি ও প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় ঘটানোর এক ভিন্নধর্মী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব কার্যক্রম আমাদের শিক্ষা কার্যক্রমের সম্পূরক কার্যক্রম হিসাবেই বিবেচিত হচ্ছে। ছায়ানটের বিকল্প ধারার শিক্ষা কার্যক্রম হচ্ছে ‘নালন্দা বিদ্যালয়’। প্রচলিত শিক্ষা কাঠামোকে অবলম্বন করে শিশুর মেধা বিকাশের কার্যক্রমকে সমন্বয় করে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ প্রসঙ্গে ছায়ানটের সহ-সভাপতি ডা. সারওয়ার আলী বলেন, ‘শিকড়’ পরািচলনা করা হচ্ছে মূলত শিশুদের সঙ্গে সংস্কৃতি ও প্রকৃতির পরিচয় ঘটানোর লক্ষ্যে। আমরা লক্ষ করেছি, এ কার্যক্রমে মূলত ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করছে। এ থেকে মনে হতে পারে, ঐ শিক্ষা কার্যক্রমে দেশ-ভাবনা, সংস্কৃতি ও প্রকৃতি-পরিচয় ঘটছে না বলেই অভিভাবকরা আগ্রহী হচ্ছেন। তবে নালন্দা পুরোপুরি ‘বিকল্প শিক্ষা পদ্ধতি’। প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি ছাত্রদের বাধ্যতামূলকভাবে সংস্কৃতির পাঠ নিতে হচ্ছে। তারা শুরু থেকেই রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-শাহ আবদুল করিমের দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। দেশ-ভাবনা, প্রকৃতি-পরিচয় বাধ্যতামূলক। সেই সঙ্গে আমরা শিক্ষার্থীদের কোচিং বা প্রাইভেট টিউশন নিতে নিরুত্সাহিত করি। এই ধারায় আমরা খুব দ্রুত পরিবর্তন লক্ষ করেছি। আমাদের ছেলেমেয়েরা অন্যান্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চাইতে ভিন্নভাবে গড়ে উঠছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জাতীয় উন্নয়নে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের সুফল আসে ধীরে। আর তাই সেটা তাত্ক্ষণিকভাবে আমাদের চোখে পড়ে না। এ কারণেই হয়তো আমাদের দেশে শিক্ষা খাতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ক্রমাগত কমছে। অথচ অর্থনীতিবিদদের মতে, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ সবচেয়ে লাভজনক এবং নিরাপদ রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ। অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ, ডেভিড রিকার্ডো এবং মার্শালের মতে, শিক্ষা এমন একটি খাত যার কাজ হলো দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলে পুঁজির সঞ্চালন ঘটানো। অর্থনীতিবিদ আর্থার শুল্জ্ দেখিয়েছেন, প্রাথমিক শিক্ষায় বিনিয়োগকৃত সম্পদের সুফল ফেরত আসে ৩৫ শতাংশ, মাধ্যমিক শিক্ষায় ২০ শতাংশ এবং উচ্চশিক্ষায় ১১ শতাংশ। অথচ শিক্ষা খাতে সেই বিনিয়োগ ঘটছে না।
অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বললেন, মানসম্পন্ন শিক্ষার দিকে এখন আমাদের সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে। এজন্য মানসম্পন্ন শিক্ষক দরকার। শিক্ষকদের আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতির প্রশিক্ষণ দরকার। পাশাপাশি প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ দরকার। কেননা গ্রামের স্কুলগুলোর মান বাড়াতে হলে তদারকি, নজরদারি বাড়াতেই হবে। শিক্ষা নীতিতে সবকিছু বলা হয়েছে। তবে এই শিক্ষানীতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে সময় লাগবে। এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব হলে দেশে শিক্ষাব্যবস্থা বদলে যাবে। তিনি বলেন, পঞ্চম শ্রেণিতে যে দেশব্যাপী পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে, এটা শিশুদের মাঝে বৈষম্য ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। এটা বন্ধ করা দরকার। ফলাফলমুখী শিক্ষাকে উত্সাহিত করছে এ পরীক্ষা। যাদের সামর্থ্য আছে তারা প্রাইভেট টিউটর রাখছে। তারা হয়তো ফল কিছুটা ভালো করছে। কিন্তু এটা একই সাথে গ্রামের দরিদ্র ছেলেটির প্রতি বৈষম্য ও মানসিক চাপ তৈরি করছে।
উন্নত দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থা এখন পুরোপুরি ভিন্নধারায় পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্ব এগিয়ে আছে বৈজ্ঞানিক এবং যৌক্তিক দিক দিয়ে। যেমন সফটওয়্যার খাতে যৌক্তিক ধারণা ছাড়া কোনোভাবেই উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমাদের দেশে বাস্তবমুখী, যৌক্তিক, প্রযুক্তিবান্ধব ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বিকাশের উল্লেখযোগ্য কোনো সুযোগ নেই। শুধু আছে মুখস্থ বিদ্যা বিকাশের সুযোগ। সেজন্য অকালেই ঝরে পড়ে মেধাবীরা। তাই প্রয়োজন পাঠসূচিকে বাস্তবমুখী, যৌক্তিক, প্রযুক্তিবান্ধব ও বৈজ্ঞানিক বিষয়ে অধিকতর জোরদার করা।
বিশ্বজুড়ে প্রচলিত ধারার শিক্ষা পদ্ধতিতে শিশুর বিকাশ ঘটছে না বলেই প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতির বাইরে বেশকিছু শিক্ষাধারা গড়ে উঠছে। এ পদ্ধতি মূলধারাকে স্বীকার করে না বরং মূল ধারার অসঙ্গতিগুলোকে তুলে ধরে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা পদ্ধতি এই দুই ধারার সমন্বয়ে গঠিত। গত তিন শতকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থাকে সমন্বয় করে গড়ে উঠেছে। এখন তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় চারটি স্তর রয়েছে। ১. স্কুল চয়েস– এ পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থী কোন বিষযে পড়তে চায় তা নির্ধারণ করতে পারবে। ২. অলটারনেটিভ স্কুল– বিকল্প ধারার এ শিক্ষা পদ্ধতি নতুন জীবন দর্শনের ওপরে ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। তাদের পড়ানোর ধরন, বিষয় নির্বাচন শিক্ষার্থীকে নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন ও ভাবনার স্বাধীনতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে। যেটা প্রথাগত শিক্ষা পদ্ধতিতে থাকে না। দেখা যাচ্ছে, এই পদ্ধতির লেখাপড়ায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার খুব কম। ৩. ব্যক্তি মালিকানাধীন। ৪. হোম বেজ্ড এডুকেশন– এটা আমাদের দেশের উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিকে প্রতিষ্ঠিত।