বিদ্যুৎ-গ্যাসের এই মূল্যবৃদ্ধি অযৌক্তিক

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০১৫, ০১:৫৫

দেশে একইসঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বিশ্ববাজারে ২০০৯ সালের পর জ্বালানি তেলের মূল্য এখন সর্বনিম্ন। দেশের বাজারে তেলের মূল্য না কমিয়ে সরকার দীর্ঘদিন ধরে মুনাফা করছে। আবার তেলের দাম কমায় বিদ্যুতের উত্পাদন খরচও কমেছে। বর্তমানে বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট উত্পাদন ও খুচরা মূল্যের মধ্যে তফাত প্রায় দেড় টাকা। বিদ্যুতে ভর্তুকিও কমছে। এ অবস্থায় গ্যাসের দাম গড়ে ২৬ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং বিদ্যুতের দাম ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ বাড়ানোর মাধ্যমে জনগণ ও শিল্পের উপর খরচের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেয়া হল। বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও জ্বালানি পরিস্থিতিতে এ মূল্যবৃদ্ধি অযৌক্তিক ও ‘উল্টো দিকে যাত্রা’ বলে তারা মত দিয়েছেন।

 
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পেট্রোলিয়াম প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, কোন যুক্তিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে, তা বোধগম্য নয়। দেশে সাতটি কোম্পানি ৭৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্য কম দামে তেল ব্যবহার করায় বিদ্যুতের গড় উত্পাদন মূল্য প্রায় ৫০ পয়সা কমে সাড়ে ছয় টাকা থেকে ছয় টাকার কাছাকাছি হয়েছে। সব মিলিয়ে তেলচালিত বিদ্যুত্ উত্পাদন কেন্দ্রগুলোতে প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদিত হচ্ছে। দেশে তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজার অনুযায়ী নির্ধারণ করা হলে বিদ্যুতের গড় উত্পাদন মূল্য সাড়ে পাঁচ টাকার কাছাকাছি চলে আসত। এর ফলে বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে মানুষকে সুবিধা দিতে পারত সরকার। একইসাথে শিল্প-উত্পাদনেও উত্সাহ দিতে পারত। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে বিপরীত প্রতিক্রিয়াই দেখিয়েছে সরকার।
 
কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, বিদ্যমান জ্বালানি পরিস্থিতিতে সরকার জনগণকে সুবিধা দেয়ার পরিবর্তে অসুবিধা তৈরি করেছে। গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানিতে গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর পক্ষে জোরালো কোনো যুক্তি পাওয়া যায়নি। বরং বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমছে এবং কমার প্রবণতা অব্যাহত থাকবে বলেই পূর্বাভাস মিলেছে। তাই দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুতের দাম অপরিবর্তিত থাকার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই অবস্থায় বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি জনগণের স্বার্থবিরোধী।
 
পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বি ডি রহমত উল্লাহ বলেন, এবার বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে উল্টোপথে হেঁটেছে সরকার। বাড়তি আয়ের মাধ্যমে বিদ্যুত্খাতের উন্নয়ন করা হবে বলা হলেও তার পন্থা সঠিক নয়। নতুন করে পর্যালোচনা না করে দাম বাড়ানোর ঘোষণা যৌক্তিক নয়। আর গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম একসাথে বাড়িয়ে মানুষের দিকে অহেতুক আর্থিক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া হয়েছে।
 
‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ’র বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, জ্বালানি খাতের ভর্তুকি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারকে এখন সুনির্দিষ্ট নীতি গ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেন, দেশের বিনিয়োগ ও রপ্তানি পরিস্থিতি এখন ভালো নয়। এ অবস্থায় গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নতুন বিনিয়োগকেও নিরুত্সাহিত করবে। নতুন করে মূল্যবৃদ্ধিতে মানুষের সামর্থ্য বিবেচনায় না নিয়ে শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতি নজর দেয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
 

তবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান এ আর খান বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের বর্ধিত মূল্যহার যৌক্তিক। গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা করেই নতুন মূল্যহার ঘোষণা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার দেশে ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য আবারো বাড়িয়েছে সরকার। বর্ধিত এই মূল্যহার আগামী এক সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে।