সাল ১৯২৬। সেপ্টেম্বর মাসের তিন তারিখ। কলকাতায় সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় ও চপলা দেবীর ঘর আলো করে আসে ফুটফুটে এক পুত্র সন্তান। তার নাম অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু সময়ের আবর্তে মা-বাবার রাখা নামকে পেছনে ফেলে এই ছেলে উত্তম কুমার নাম নিয়ে বাংলা সিনেমার কালজয়ী সম্রাটে পরিণত হন। আজ বাংলা সিনেমার এই একচ্ছত্র অধিপতির ৮৯তম জন্মবার্ষিকী।
বাংলা সিনেমায় উত্তম কুমার চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন তার বৈচিত্র্যময় অভিনয়ের জন্য। সপ্তপদীতে তিনি হয়ে যান বিরহে কাতর প্রেমিক, আবার অগ্নিশ্বরে তিনি একজন নিবেদিত চিকিৎসক। সত্যজিৎ রায়ের চিড়িয়াখানাতে যেমন ব্যোমকেশ বক্সি রূপে গোয়েন্দা হয়ে যান, আবার একই পরিচালকের নায়ক সিনেমায় তিনি আত্মদংশনে ভোগা একজন সুপারস্টার অরিন্দম চক্রবর্তী! ধূতি-পাঞ্জাবিতে তাকে যেমন খাটি বাঙ্গালি মনে হতো, সেই তিনিই আবার কোর্ট টাই পড়ে হয়ে যেতেন শতভাগ খাটি সাহেব।
উত্তম-সূচিত্রা জুটি নিয়ে এত কথা বলা হয়েছে যে সেটা নিয়ে কিছু বলা বাহুল্য। শুধু বাংলা সিনেমাই নয়, হিন্দি সিনেমাতেও সমান ভাবে সফল তিনি। বিখ্যাত হিন্দি সিনেমার কিংবদন্তি অভিনেত্রী ভিজয়ন্তীমালার সেই কথাতো প্রবাদে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, উত্তম কুমার এবং রাজ কাপুরই হচ্ছেন আধুনিক ভারতীয় অভিনেতা। কারণ তারা ভারতের একমাত্র অভিনেতা যাদের ডাবিংয়ের সময়ে ঠোটের নড়া ও ডায়ালগ প্রায় নিঁখুত ভাবে মিলে যায়।
১৯৬৭ সালে ভারতে চালু হয় জাতীয় পুরস্কার। আর সে বছরেই প্রথম ব্যক্তি হিসেবে এই পুরস্কার জেতেন তিনি। সত্যজিৎ রায়ের চিড়িয়াখানা ও সুনীল বন্দোপাধ্যায় পরিচালিত অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি সিনেমার জন্য তিনি এই পুরস্কার জেতেন। সব মিলিয়ে ২১২টি সিনেমায় অভিনয় করেছেন, যার মধ্যে ১৫টি হিন্দি।
শুধু অভিনয়ই নয়- কণ্ঠশিল্পী, কম্পোজার, সংগীত পরিচালক এবং সর্বোপরি সিনেমার পরিচালক হিসেবেও কৃতিত্ব রেখে গেছেন এই গুণী বাঙ্গালি। কাজ পাগল এই মানুষটি 'ওগো বধু সুন্দরী'তে শ্যুটিং করার সময়ে স্ট্রোক করেন। চিকিৎসকদের ১৬ ঘণ্টা আপ্রাণ চেষ্টার পরে বেলভিউ হাসপাতালে ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই মাত্র ৫৪ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে যান তিঁনি। তাঁর মৃত্যুর পরে বাংলা সিনেমা তথা সিনেমা ইতিহাসেরই সেরা পরিচালকদের একজন সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, 'উত্তম কুমারের মতো কোনো হিরো আগে ছিল না এবং ভবিষ্যতেও কখনো আসবে না'।
৩৫ বছর হলো পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে দৈহিক বিদায় হয়েছে মহানায়কের। কিন্তু ৮৯ তম জন্মদিনে পা রাখার পরও উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কোনো নায়ক আসতে পারেননি। আর তাই মহানায়কের ১৮৯ তম জন্মদিনেও হয়ত সত্যজিৎ রায়ের মতো বলতে হবে, 'তার মতো কেউ আসেনি, আসবেও না'।
