টানা প্রায় ১ মাস ধরেই এই অনুষ্ঠানের ক্যাম্পেইন চলেছে। হাজার কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীতের শ্লোগান নিয়ে এমন অনবদ্য আয়োজনের পক্ষ ও বিপক্ষের বাহাসও কম হয়নি। কিন্তু মোটা দাগে এই আবেগমথিত অনুষ্ঠান দিয়ে নিউইয়র্কের বাঙালি কমিউনিটিকে প্রায় এক করার এক দারুণ উত্সব হয়ে গেল সেদিন।
১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের রবিবারে সকলের প্রায় ছুটি। ব্রনকস এলাকার পার্কেচেস্টারে অনুষ্ঠান উপলক্ষে মেলার পসরা সাজানো হয়েছিল পুরো একটি পথজুড়ে। মেলার গেটে ইউএস সিকিউরিটির বিশাল দেহধারীদের দেখলে ভেতরে প্রবেশের জন্য খানিক ভয়ই লেগে যায়। পুরো অনুষ্ঠান চত্ত্বর টহল দিচ্ছে ইউএস পুলিশ। এলাকায় ছুটির বিকেলের মতো বেশ আয়েশী চলাচল। প্যান্ডেল আর সাউন্ডের দায়িত্বে থেকে পুরো আয়োজন সাজানোর জন্য কসরত করছেন কণ্ঠশিল্পী আয়োজক তানভীর শাহিন ও সাংবাদিক হাসানুজ্জামান সাকী। সাকী জানালেন, ভোর ৫টা থেকে তিনি আর শাহিন এই মেলার প্যান্ডেল থেকে সবকিছু সাজাচ্ছেন, দু’কাপ কফি ছাড়া তারা কিছুই মুখে দেননি। শুধু প্রার্থনা করছেন যেন এত বড় আয়োজনে বৃষ্টি না আসে। এদিকে নিউইয়র্কের আকাশ এখন অভিমানী প্রেমিকার মতো আচরণ করছে ক’দিন। এই মেঘ, এই রোদ্দুর। তবে এমন অনন্য আয়োজনে মেঘ-বৃষ্টির অভিমান খুব একটা কাহিল করতে পারলো না প্রবাসী বাঙালির চেতনা আর আবেগের প্রণয়কে। ইত্তেফাকের নিউইয়র্ক প্রতিনিধি শহীদুল ইসলামও প্রায় আয়োজকের ভূমিকাতেই বিভিন্ন শিল্পী ও কুশলীদের খোঁজখবর নিচ্ছেন নিজ উদ্যোগেই। স্থানীয় চ্যানেলগুলোও বেশ সজাগ বিশাল এই আয়োজনকে কাভার করার জন্য। ব্রনকস এলাকাতে সিলেটি বাঙালি বেশি তা দর্শকদের খোশগল্পের শব্দ চয়নে বোঝা গেল। শিরিন নামের এক মহিলা তার পুরো পরিবারসহ এই অনুষ্ঠানে এসেছেন। তার কাছে যখন জানতে চাইলাম অনুষ্ঠানে আসার উদ্দেশ্য, তখন বেশ গর্বের সাথে বলে উঠলেন তিনি, ‘বাংলাদেশি ভাইয়েরা একটা অনুষ্ঠান সাজিয়েছে আর আমরা আসবো না এটা হয়। তাই খবর পেয়েই ছুটে এসেছি। এটা আমার দায়িত্ব।’
অর্থাত্ একটা দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে স্থানীয় বাঙালি বাংলাদেশিরা ছুটে এসেছেন। সমস্বরে জাতীয় সঙ্গীত আসরের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়। সাথে মঞ্চে ছিলেন আমেরিকা নিবাসী প্রায় ১৪জন গুণী তরুণ কণ্ঠশিল্পী ও ঢাকা থেকে আমন্ত্রিত রবি চীেধুরী, পড়শী, ইলিয়াসসহ একাধিক শিল্পীরা। তবে রথীন্দ্রনাথ রায় দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র নিবাসী হওয়ায় শিল্পীদের সবচেয়ে আরাধ্য অভিভাবকের ভূমিকাটাই পালন করেন তিনি এখানে।
সেই ভাবেই এক ভিন্ন ঢঙে শুরু হলো পুরো অনুষ্ঠান। মঞ্চে প্রথমে যে তিনটি গান দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হলো তা মূলত আমাদের বাঙালির স্বত্তা সঙ্গীত। প্রথমে সমস্বরে গাওয়া হলো আব্দুল লতিফের সেই বিখ্যাত গান ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়, দ্বিতীয় গানটি ছিল আমাদের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মূল গান আব্দুল গাফফার চৌধুরীর লেখা, আলতাফ মাহমুদের সুরের সেই অমিয় শ্লোগান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’।
এরপরেই পুরো এলাকাজুড়ে হাতে পতাকা আর মাথায় লাল-সবুজ ব্যান্ডেনা নিয়ে গাইলেন ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’ এক বৃদ্ধ মহিলাকেও দেখা গেল হাতে দেশের পতাকা নিয়ে গান গাইছেন আর কাঁদছেন।
পরে অবশ্য তাকে খুঁজে জানতে চাইলাম, আপনি বারবার চোখ মুছছিলেন কেন? বৃদ্ধা আমায় প্রায় ধমক দিয়ে বললেন, ‘দেশ থেকে দূরে থাকো না তো। কি বুঝবা? এই গীত শুনলে কেন জানি আমার চোখ ভারী হয়ে আসে।’
এরপর একে একে প্রবাসী ও ঢাকা থেকে আগত শিল্পীরা গাইলেন বাংলা জনপ্রিয় গান। তবে পুরো অনুষ্ঠানের এই হাজার কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীতের আয়োজন দিয়ে ব্রঞ্জে নিউইয়র্কের ছুটির বিকেলের আকাশ শুনেছে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। কৌতুহলী অনেক আমেরিকান, মেক্সিকান দর্শককেও দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানাতে দেখা গেল গানটি পরিবেশনার সময়। অনবদ্য এই আয়োজন প্রসঙ্গে বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়ের কাছে যখন গ্রীনরুমে জানতে চাইলাম, তিনি বললেন, ‘অনেক আগেই এই উদ্যোগ নেওয়ার দরকার ছিল। আমরা এখানে যারা বাংলা গান জানি তারা কিন্তু তৃষ্ণার্ত থাকি একটু বাংলা সুর শোনার জন্য। এই যে এত মানুষ কাউকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, এখানে আমরা সবাই মিলে দাঁড়িয়ে সমবেত হয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাইবো। এই প্রাণের ডাকে সবাই ছুটে এসেছে। এটা একটা ধারাবাহিকতা। এটা রক্ষা করে চললে আমরা বাংলা কালচারকে সত্যিকার অর্থেই আন্তর্জাতিক প্লাটফর্মে নিয়ে যেতে পারবো।’ অনুষ্ঠানের আয়োজক নর্থ আমেরিকার প্রথম বাংলাদেশি ক্যাবল অপারেটর টোটাল ক্যাবল ও বিএসিসি। বক্তব্য রাখেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. একে আব্দুল মোমেন, এসেম্বলীম্যান লুইস সিপুলভিদা, টোটাল ক্যাবলের সিইও আহমদুল বারোভূইয়া পুলক ও আইনজীবী মোহাম্মদ এন মজুমদার। গানের নেতৃত্ব দেন রথীন্দ্রনাথ রায় ও শহীদ হাসান। নিউইয়র্ক ও ঢাকার শতাধিক শিল্পী এতে অংশ নেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন হাসানুজ্জামান সাকী ও আশরাফুল হাসান বুলবুল।