দেবীর আগমনী বাজে

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০১৫, ০০:৪৮

সারি সারি প্রতিমা। দুর্গা প্রতিমাটা বড়। এর পাশে খানিক ছোট প্রতিমা লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ, অসুর, সিংহ ও মহিষ। প্রতিমায় এখন চলছে শেষ মুহূর্তের কাজ। তারপর রং করে, পোশাক, গয়না দিয়ে সাজানো হবে। পুরান ঢাকার বাংলাবাজারে শ্রীশ্রী লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ ঠাকুর মন্দিরে গত দুই মাস ধরে প্রতিমা গড়ছেন বিক্রম-পুরের শ্রীনগর থেকে আসা গোকূল পাল। বংশ পরম্পরায় প্রতিমা গড়ছেন তিনি। বাবা বিজয় পালের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে কাজ শিখেছেন। গত ২৫ বছর ধরে প্রতিমা গড়ছেন গোকূল। বললেন, প্রতিমা গড়া আমাদের কাছে পূজার সমতুল্য। প্রতিমার সবচেয়ে কঠিন কাজ হচ্ছে মুখ গড়া এবং চোখ আঁকা। এই বিদ্যা রপ্ত করতে অনেক সময় লাগে, অনেক সাধনা লাগে।

 
দেবী মর্ত্যে আসছেন, তারই আয়োজন যেন প্রকৃতিতে। কাশবনের দোলায়, আকাশের নীলাভ বর্ণে দেবীর আগমনের পদধ্বনি। মণ্ডপে তারই প্রস্তুতি। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ ‘মা দুর্গা’কে বরণ করে নিতে অধীর প্রতীক্ষায় দিন গুনছেন। প্রতিটি মণ্ডপে প্রতিমা গড়তে নির্ঘুম রাত পার করছেন কারিগররা। চলছে মণ্ডপ সাজানো, শামিয়ানা টানানোর কাজ। মা আসছেন, পৃথিবী থেকে সব অশান্তি, অন্যায়, পাপকে বিনাশ করে সত্য ও সুন্দরকে প্রতিষ্ঠা করবেন তিনি। সেই প্রত্যাশায় অধীর প্রতীক্ষা তাদের। বছর ঘুরে আনন্দময়ীর এই  আগমন-সান্নিধ্যে তারা দুঃখ-যন্ত্রণা ভুলে আনন্দ পেতে চায়।
 
দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উত্সব। তবে ভারতের অন্যান্য প্রদেশের অবাঙালি হিন্দুরাও ভিন্ন ভিন্ন নামে এ উত্সব পালন করে। যেমন কাশ্মীর ও দাক্ষিণাত্যে অম্বা ও অম্বিকা, গুজরাটে হিঙ্গুলা ও রুদ্রাণী, কান্যকুব্জে কল্যাণী, মিথিলায় উমা এবং কুমারিকা প্রদেশে কন্যাকুমারী নামে দেবীর পূজা ও উত্সব পালিত হয়। পূজার আগে খড়-মাটি দিয়ে প্রতিমা তৈরি করে তাতে কাঞ্চনবর্ণের রং লাগানো হয়। অতীতে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িসহ আরও কয়েকটি সম্পন্ন পরিবার প্রতিমায় দামি শাড়ি, এমনকি সোনার গহনা পর্যন্ত পরাতো এবং তত্সহ প্রতিমা বিসর্জন দিত। কেউ ব্যক্তিগতভাবে করে, কেউবা সমষ্টিগতভাবে। সমষ্টিগত পূজাকে বলা হয় বারোয়ারী বা সর্বজনীন দুর্গোত্সব। বাংলাদেশে প্রতিবছর যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয় দুর্গাপূজা। এ বছর ১৯ অক্টোবর থেকে ষষ্ঠী পূজা দিয়ে শুরু হচ্ছে দুর্গাপূজা।
 
এবারও মন্দিরে মন্দিরে প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। এবারের পূজা প্রসঙ্গে মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির পূজারী বরুণ চক্রবর্তী বলেন, এবার মা আসছেন ঘোড়ায় চড়ে। আর ফিরে যাবেন দোলায় করে। ঘোড়ায় চেপে এলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা থাকে। দোলায় করে ফিরলে ভূমিকম্পসহ দুর্যোগের আশঙ্কা থাকলেও শ্যামল শস্যে পূর্ণ হবে দেশ, দুঃখ-দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করে ধরিত্রীকে পূর্ণ করে দিয়ে যাবেন। হিন্দুধর্মে দেবী দুর্গা পরমা প্রকৃতি ও সৃষ্টির আদি কারণ। দুর্গা মূলত শক্তির দেবী। তিনি শিবের স্ত্রী পার্বতী, কার্তিক ও গণেশের মা এবং কালীর অন্যরূপ। ‘দ’ অক্ষর দৈত্যনাশক, উ-কার বিঘ্ননাশক, ‘রেফ’ রোগনাশক, ‘গ’ অক্ষর পাপনাশক ও আ-কার ভয়-শত্রুনাশক। অর্থাত্ দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ও ভয়-শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন, তিনিই দুর্গা। অন্যমতে, দুর্গ নামক অসুরকে যিনি বধ করেন তিনিই নিত্য দুর্গা নামে অভিহিতা।  আবার শ্রীশ্রী চণ্ডী অনুসারে এই দেবীই সকল দেবতার সম্মিলিত শক্তির প্রতিমূর্তি।
 
দুর্গা পৌরাণিক দেবী। তিনি আদ্যাশক্তি, মহামায়া, শিবানী, ভবানী, দশভুজা, সিংহবাহনা ইত্যাদি নামে অভিহিত হন। দুর্গ বা দুর্গম নামক দৈত্যকে বধ করেন বলে তাঁর নাম হয় দুর্গা। জীবের দুর্গতি নাশ করেন বলেও তাঁকে দুর্গা বলা হয়। ব্রহ্মার বরে পুরুষের অবধ্য মহিষাসুর নামে এক দানব স্বর্গরাজ্য দখল করলে রাজ্যহারা দেবতারা বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। বিষ্ণুর নির্দেশে সকল দেবতার তেজঃপুঞ্জ থেকে যে দেবীর জন্ম হয় তিনিই দুর্গা। দেবতাদের শক্তিতে শক্তিময়ী এবং বিভিন্ন অস্ত্রে সজ্জিতা হয়ে এ দেবী যুদ্ধে মহিষাসুরকে বধ করেন। তাই দেবীর এক নাম হয় মহিষমর্দিনী।
 
দুর্গাপূজার প্রচলন সম্পর্কে পুরাণে লিখিত হয়েছে যে, পুরাকালে রাজ্যহারা রাজা সুরথ এবং স্বজনপ্রতারিত বৈশ্য একদিন মেধস মুনির আশ্রমে যান। সেখানে মুনির পরামর্শে তাঁরা দেবী দুর্গার পূজা করেন। পূজায় তুষ্ট দেবীর বরে তাঁদের মনস্কামনা পূর্ণ হয়। এ পূজা বসন্তকালে হয়েছিল বলে এর এক নাম ‘বাসন্তী’ পূজা। কৃত্তিবাসী  রামায়ণ থেকে জানা যায় যে, রামচন্দ্র রাবণবধের জন্য অকালে শরত্কালে দেবীর পূজা করেছিলেন। তখন থেকে এর নাম হয় অকালবোধন বা শারদীয়া দুর্গাপূজা। বাসন্তী পূজা হয় চৈত্রের শুক্লপক্ষে, আর শারদীয়া পূজা হয় সাধারণত আশ্বিনের কখনও বা কার্তিকের শুক্লপক্ষে। বর্তমানে শারদীয় পূজাই সমধিক প্রচলিত। এসময় শুক্লা ষষ্ঠীতিথিতে দেবীর বোধন হয় এবং সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী (মহানবমী)তে পূজা দিয়ে দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়। এদিন দশোহরার মেলা হয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন নতুন পোশাক পরে দশোহরার মেলায় যায়। মেলার দিন নৌকাবাইচ বিশেষ আকর্ষণের বিষয়। সকলে কোলাকুলি, প্রণাম, আশীর্বাদ ইত্যাদির মাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময় করে।
 
বঙ্গদেশে প্রথম দুর্গাপূজার প্রচলন করেন সম্রাট আকবরের (১৫৫৬-১৬০৫) রাজত্বকালে রাজশাহী জেলার তাহিরপুরের সামন্ত রাজা কংসনারায়ণ, মতান্তরে নদীয়ার সামন্ত রাজা  কৃষ্ণচন্দ্র রায় (১৭১০-১৭৮৩)। কিন্তু জীমূতবাহনের (আনুমানিক ১০৫০-১১৫০) দুর্গোত্সবনির্ণয়, বিদ্যাপতির (১৩৭৪-১৪৬০) দুর্গাভক্তিতরঙ্গিণী, শূলপাণির (১৩৭৫-১৪৬০) দুর্গোত্সববিবেক, কৃত্তিবাস ওঝার (আনু. ১৩৮১-১৪৬১)  রামায়ণ, বাচস্পতি মিশ্রের (১৪২৫-১৪৮০) ক্রিয়াচিন্তামণি, রঘুনন্দনের (১৫শ-১৬শ শতক) ‘তিথিতত্ত্ব’ ইত্যাদি গ্রন্থে দুর্গাপূজার বিস্তৃত বর্ণনা থাকায় অনুমান করা হয় যে, বাংলায় দুর্গাপূজা দশম অথবা একাদশ শতকেই প্রচলিত ছিল। হয়তো কংসনারায়ণ কিংবা কৃষ্ণচন্দ্রের সময় থেকে তা জাঁকজমকের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হতে থাকে। উনিশ শতকে কলকাতায় মহাসমারোহে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতো। অষ্টাদশ শতকের শেষ অব্দি ইউরোপিয়ানরাও দুর্গোত্সবে অংশগ্রহণ করত। ধনীদের গৃহে বাইজি, নর্তকী এবং গায়িকারা অংশগ্রহণ করত। কোথাও কোথাও যাত্রাগান,  পাঁচালি ও কবিগানের আসর বসত।
 
প্রতিমার রং হতে পারে অতসীপুষ্পবর্ণ বা তপ্তকাঞ্চনবর্ণ, কখনও বা রক্তবর্ণ। প্রতিমা ছাড়াও পূজা হতে পারে দর্পণে, অনাবৃত ভূমিতে, পুস্তকে, চিত্রে, ত্রিশূলে, শরে, খড়্গে বা জলে। দুর্গাপূজায় হিন্দুদের সকল বর্ণের লোকেরাই অংশগ্রহণ করতে পারে। দুর্গাপূজা তিন প্রকার: সাত্ত্বিক (জপ, যজ্ঞ ও নিরামিষ ভোগ দ্বারা পূজা), তামসিক (কিরাতদের জন্য বিহিত; এতে জপ, যজ্ঞ ও মন্ত্র নেই; পানীয়, মাংস প্রভৃতি দ্বারা পূজা করা হয়) ও রাজসিক (পশুবলি ও আমিষ ভোগ দ্বারা পূজা করা হয়)। অতীতে দুর্গাপূজার সময় ছাগ, মেষ, মহিষ, হরিণ, শূকর, গণ্ডার, ব্যাঘ্র, গোসাপ, কচ্ছপ বা পাখি বলি দেয়া হতো। কোনো কোনো গ্রন্থে নরবলির বিধানও আছে। বর্তমানে অবশ্য বলির প্রচলন নেই বললেই চলে। দেবী সাধারণত দশভুজা, তবে শাস্ত্রানুসারে তাঁর বাহুর সংখ্যা হতে পারে চার, আট, দশ, ষোলো, আঠারো বা বিশ।
 

দুর্গোত্সব উপলক্ষে আত্মীয়-স্বজন সকলে একত্র মিলিত হয়। ঢাকার সর্বজনীন দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে। এছাড়া শত শত মণ্ডপে বসে মন্দিরে এবং বিভিন্ন সংগঠনের আয়োজনে। পূজা উপলক্ষে গরিব-দুঃখীদের মধ্যে খাদ্য ও বস্ত্র বিতরণ করা হয়। দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারি ছুটি থাকে। এদিন সংবাদপত্রসমূহ বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে এবং বেতার-টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান হয়। দশমীর দিন সকাল থেকে চলে বিসর্জনের আয়োজন। মিছিল করে প্রতিমা নিয়ে বিকেল থেকে শুরু হয়ে কাছের নদী-খাল-বিল কিংবা পুকুরে বিসর্জনের পালা। ঢাকার অধিকাংশ প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয় বুুড়িগঙ্গার জলে। এভাবে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পাঁচদিনব্যাপী দুর্গোত্সব।