প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা নিলেই ব্যবস্থা :প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০১৫, ২৩:২৭

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা নিলেই ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর প্রতি নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, শিশুরা যে এলাকায় বসবাস করে, সে এলাকার স্কুলে ভর্তির সুযোগ পাওয়া তাদের অধিকার। তাই কোনো ধরনের ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি তাদের আগে ভর্তি করিয়ে নিতে হবে। প্রতিটি শিশুকে তাদের এলাকার স্কুলে ভর্তি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়ে তিনি আরো বলেন, শিশুদের যদি লেখাপড়া শিখে ছাপানো প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়ে স্কুলে ভর্তি হতে হয়, তাহলে আর স্কুল কী শিখাবে? প্রাক-প্রাইমারি বা প্রাইমারি তাদের কী শিখাবে? পড়াশোনা মানে একগাদা বই চাপিয়ে দেয়া নয়। তাই প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা নিলে ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশের প্রতিটি এলাকার শিশুদের কোনো ধরনের ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই এলাকাভিত্তিক অগ্রাধিকার দিয়ে স্কুলে ভর্তি করাতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত যাতে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয় সেজন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তদারকি ও সমন্বয় করার জন্য প্রধানমন্ত্রী তার কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।

 
গতকাল রবিবার শিশু একাডেমি মিলনায়তনে বিশ্ব শিশু দিবস ও শিশু অধিকার সপ্তাহ ২০১৫-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রসঙ্গত, শিক্ষা জীবনে প্রবেশ করতে অনেক শিশুকেই এরকম কষ্টকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই যেতে হয়। শিক্ষা জীবনের শুরুতে এমন অনভিপ্রেত ঘটনা বন্ধ করার দাবি অনেক দিনের। প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন শিক্ষাবিদরা।
 
প্রতিটি পথশিশুর খাদ্য, আশ্রয় ও শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতি নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি শিশুও রাস্তায় ঘুরে মানবেতর জীবনযাপন করবে না। প্রতিটি শিশুর আবাসন থাকবে, কেউ অনাহারে কাটাবে না। আমরা ১৬ কোটি লোকের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছি। তাই প্রায় ৩৪ লাখ পথশিশুকে খাওয়ানোর সক্ষমতা সরকারের রয়েছে। তিনি বলেন, শিশুদের শৈশব হতে হবে আনন্দময়। আর শিশুদের ওপর নির্যাতন কিংবা নিপীড়ন কোনোভাবেই মেনে নেয়া হবে না। গৃহকর্মী নির্যাতন এবং কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশু নিয়োগ সরকার কোনোভাবেই মেনে নেবে না। একটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে ঢাকায় ৩৪ লাখ শিশুর রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর তথ্য এসেছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি শিশুর মেধা বিকাশের সুযোগ করে দিতে হবে। এখন যারা শিশু, আগামীতে তারাই দেশের নেতৃত্ব দেবে। তাই আগামী দিনের শিশুদের জন্য বাসযোগ্য সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে দিয়ে যেতে চাই। আমাদের বর্তমান আমরা আগামী দিনের শিশুদের জন্য উত্সর্গ করছি। শিশুদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা সরকারের দায়িত্ব।
 
সম্প্রতি দেশে শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের কয়েকটি ঘটনা ঘটায় ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিশুদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো যাবে না। শিশুদের কাজ পড়াশোনা করা। তিনি বলেন, ‘অনেকে শিশুদের বাড়িতে নিয়ে আসে কাজ করতে। তাদের লেখাপড়ার অধিকার আছে। ওই শিশুটা ফ্রিজ থেকে একটা মিষ্টি খেলে এভাবে মারে... এটা মেনে নেয়া যায় না। মানুষ এত নির্দয় হয় কীভাবে, আমি এটা ভেবে পাই না। এসব দেখলে খুব কষ্ট হয়। শিশুদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করতেই হবে।’
 
প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক শিশুদের প্রতি অভিভাবক ও সহপাঠীদের সংবেদনশীল হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, জন্ম থেকে কেউ কানা হয়, খোঁড়া হয়, চিন্তাশক্তির সমস্যা থাকে। এটা তাদের অপরাধ না। তাই তাদের নিয়ে টিজ করা অপরাধ। এ ধরনের শিশুদের সঙ্গে আদর, যত্ন, বন্ধুসুলভ ও সহানুভূতিশীল আচরণ করতে হবে। তাদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টা কখনো করা যাবে না। প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক শিশুদের বিশেষ কাউন্সেলিং করানোর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, এতে একসময় তারা অন্য শিশুদের সঙ্গে মিলে যেতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেক শিশুকে দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে হবে। নইলে তারা জীবনযুদ্ধে জয়ের অনুপ্রেরণা পাবে না। এছাড়া সারাদেশে স্কুলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্কুল ছুটির পর শিশুদের রাস্তা পারাপারের জন্য ট্রাফিক পুলিশকে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
 
শেখ হাসিনা বলেন, ‘ঢাকা শহরের অধিকাংশ ফ্ল্যাট বাড়িতে শিশুদের খেলাধুলার জায়গা রাখা হয় না। এই ফ্ল্যাট বাড়িতে থেকে বাচ্চারা ফার্মের মুরগির বাচ্চার মতো মানুষ হচ্ছে। আমি সব সময় বলতাম, আপনারা অন্তত বাচ্চাদের জন্য খেলার জায়গাটা রাখবেন। বাচ্চারা যাতে খেলাধুলা করতে পারে, তাদের হাত-পা ছড়াতে পারে।’ চাপ সৃষ্টি না করে শিশুদের পড়তে উত্সাহিত করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘কাউকে সারাক্ষণ পড় পড় বললে, পড়া থেকে তার মনটা উঠে যায়। আমি আমার ছোটবেলার কথা বলতে পারি, যখনই বলত, এই পড়তে বস, তখনই আর পড়তে ইচ্ছে করত না।
 
শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার শিশুদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে অব্যাহত প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়টি দেশের সংবিধান, জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ ও শিশু আইন-১৯৭৪-এ সন্নিবেশিত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘে ১৯৮৯ সালে শিশু অধিকার সনদ গৃহীত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের জাতির পিতা ১৯৭৪ সালে শিশু অধিকার আইন প্রণয়ন করেছেন। ১৯৭৪ সালের শিশু নীতির আলোকে শিশু নীতি-২০১১ প্রণীত হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার প্রত্যেক শিশুর খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি এবং মায়েদের পুষ্টির ওপর বিশেষ নজর দিয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার কমছে।
 
বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিশু একাডেমিতে শিশু জাদুঘর এবং প্রস্তাবিত শহীদ শেখ রাসেল গ্যালারি ঘুরে দেখেন। মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসিমা বেগম, বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউনিসেফের আবাসিক প্রতিনিধি এডওয়ার্ড বেগবেদার, আজিমপুর শিশু বিকাশ কেন্দ্রের ছাত্রী সানজিদা আফরোজ স্মৃতি, মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সুবিধাভোগী প্রকল্পের আওতায় মহাখালীর আব্দুল হালিম বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র হাশেম প্রমুখ। ‘শিশু গড়বে দেশ, যদি পায় পরিবেশ’ এই প্রতিপাদ্য নিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশে দিবসটি পালিত হয়।