সাক্ষাৎকার

‘শুধু গান গাইলেই তো হবে না, শ্রোতাদের শুদ্ধ সুরের কানও তৈরি করতে হবে’: আইয়ুব বাচ্চু

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০১৫, ০২:১২
সুরের সাথে পাড়ি দেওয়া তার দুই যুগেরও বেশি সময়। এদেশে বাংলা গান শোনানোর কাজে ব্রত নিয়েছিলেন পপগুরু আজম খানের পরেই। আজম খানের পর তাই তাকে বলা হয় রকগুরু। দীর্ঘ গানের জীবনে অভিজ্ঞতা আর স্মৃতির আলোয় গানের আগাম ভাবনা নিয়েও বললেন অকপটে অনেক কথা। বিনোদন প্রতিদিনের মুখোমুখী সাক্ষাত্কারে জানালেন সেই দিক নির্দেশনা।
 
 
 
কেমন আছেন, এ রকম প্রশ্নে আপনি কতবার বলেছেন যে, না ভালো নেই! মনে পড়ে?
 
প্রশ্নটা খুব ভালো লাগলো রে! কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি কোনোদিন এ রকম প্রশ্নে বলিনি, না ভালো নেই আমি। কারণ সৃষ্টিকর্তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। হ্যাঁ মন খারাপের হাওয়া আমার জীবনেও অনেকবার বয়ে গেছে। কিন্তু তাতে আমি খারাপ আছি, এটা কেন জানি বলতে পারিনি। ওপরওয়ালার পর আমার সবকিছুর আধার ছিল আমার মা। মা যেদিন চলে যান সেদিন আমার মন ভালো ছিল না, থাকার কথা না। কিন্তু আমার সেই মায়ের আশীর্বাদটুকু নিয়েই আজও বেঁচে আছি। আর বেঁচে থাকি আমার সৃষ্টিগুলো নিয়ে, এই যে এত ভক্ত কতভাবে আমাকে ভালোবেসে বাঁচিয়ে রাখে।
 
খুব কঠিন প্রশ্ন বা গানের তত্ত্ব তালাশ করতে ইচ্ছে হচ্ছে না, তবু যদি দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় এই গানের রাজ্যকে নেতৃত্ব দেওয়ার পর এখনকার গানের অবস্থান নিয়ে কী বলবেন..
 
এটা অনেক গভীর প্রশ্ন হয়ে গেল। তবে আমি বলবো, এখন গ্লোবাল ভিলেজে আমরা প্রত্যেকে গান করছি। যে ছেলেটি গান রিলিজ করছে সে কিন্তু এখন আর শুধু ঢাকা বা তার এলাকা ঝিনাইদহ বা কোনো নির্দিষ্ট দেশের জন্যও করছে না। এটা ভাবলে ভুল হবে। কারণ ইউটিউব বা যেকোনো মাধ্যমে গানটি রিলিজ হলে তা ছড়িয়ে যাচ্ছে সারাবিশ্বের কাছে।
 
কিন্তু গানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সঙ্কট হয়ে গেছে, এখন সেই আগের কনসার্টের উন্মাদনা নেই! এটা কি ফিরে আসবে?
 
অবশ্যই আসবে। আমি তো খুব আশাবাদী। এক সময় আর্মি স্টেডিয়াম, মিরপুর স্টেডিয়াম, শাহীন কলেজ থেকে শুরু করে একাধিক ভেন্যুতে একাধিক কনসার্ট অনুষ্ঠিত হতো। দর্শকরা অপেক্ষা করতো। সেই নতুন উন্মাদনা এখন সন্ধ্যা বা রাতের ক্লাবে ঢুকে গেছে। এটাকেও আমি খারাপ চোখে দেখছি, এখন শ্রোতারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে লাউড স্পিকারে মাতিয়ে গান শোনে না। এখন সেই আদলটা বদলে গেছে, এখনকার তরুণ কানে হেড ফোন ঢুকিয়ে সারাপথ বা সারাবেলা হয়তো ফেসবুকিং করছে। এটা তো দিনবদলের সুর। এটাকে তাই নতুন করে উপস্থাপন করতে হবে।
 
তবে কি এ ধরনের তরুণদের জন্যই ব্লুজ ক্লাব..
 
না, এটা সিলেক্টিভ শ্রোতাদের জন্য। নতুন একটি কান তৈরি করা। শুধু গান গাইলেই তো হবে না, শ্রোতাদের ভালো কিছু শোনানোর কানও তৈরি করতে হবে। এটা খুব জরুরি। আমি রক, হার্ডরক করে গেলাম। খুব খাচ্ছে, তাই আরও করলাম, এটা কোনো শিল্পীর কাজ হতে পারে না। আমি সে কারণেই সবচেয়ে অপ্রচলিত ব্লুজটাকে বেছে নিলাম। তবে যে ব্যাপক সাড়া পেয়েছি তা অবর্ণনীয়!
 
এছাড়া বর্তমানে একাধিক চ্যানেলের লাইভ মিউজিক কি খানিকটা শিল্পীদের বেডরুম সিঙ্গার বানিয়ে দিচ্ছে না? বা এর প্রচুর উপস্থাপনটা ক্ষতি করে দিচ্ছে না?
 
এটা ভাববার বিষয়। আমি টিভি লাইভের বিরুদ্ধে নই। আমি স্বচ্ছন্দেই টিভি লাইভ করি। কিন্তু এখানে আমার একটি কথা আছে, টিভি লাইভকে যদি আমি আর্মি স্টেডিয়াম কনসার্ট ভাবতে থাকি তাহলে কিন্তু দর্শক বিরক্ত হবেন। কারণ রাতে রিল্যাক্স হয়ে হয়তো প্রিয় শিল্পীর গান শুনতে বসেন। সেক্ষেত্রে আমার মনে হয়, গানের উপস্থাপনা বা সাউন্ড ডিজাইনে নতুনত্ব আনা খুব জরুরি। এই বিষয়টি কেউ কেউ করছেন। এটা প্রত্যেক শিল্পীর তাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে ভেবে করা উচিত।
 
এই যে দীর্ঘপথে আপনি যেভাবে নিজের গানকে ভেঙেছেন। এই ভাঙা-ভাঙির খেলায় ইদানিংকালের সুর আর অংশ নিচ্ছে না। তারা অনেকেই ভয় পাচ্ছেন, যদি কেউ না খায়। তাই যা খাচ্ছে সেই রেসিপি তৈরিতেই ব্যস্ত-এ সম্পর্কে কি বলবেন।
 
আমার মনে হয় এই প্রশ্নের ভেতরেই এর উত্তরটা বলা হয়ে গেছে। একটা বিষয় এখন ভাবতে খুব অবাক লাগে। আগের দিনে আমরা কত কষ্টে একটা বিদেশি এলপি বা ক্যাসেট সংগ্রহ করে শুনতাম। কিংবা রেডিওর ওয়ার্ল্ড মিউজিক শোনার জন্য বসে থাকতাম। সেগুলো শুনেই নিজেদের বিশ্বমানের করার স্বপ্ন দেখেছি। আজ এক ক্লিকে সব ধরনের গান, ইন্সট্রুমেন্টাল বা টিউটরিয়াল আমি পেয়ে যাচ্ছি। এর চেয়ে বড় অপারচুনিটি তো আর কিছুই হতে পারে না। তাই বিষয়টিকে হালকাভাবে না দেখে বাংলা গানকে বিশ্বায়নে কিভাবে নেওয়া যায় সেদিকে ভাবা উচিত।
 
দীর্ঘদিন পর ‘জীবনের গল্প’ রিলিজ হলো। নতুন গানের বিপণন প্রসঙ্গে শুনতে চাই।
 
এটা দারুণ উদ্যোগ যে, অবশেষে এখন অনেকেই বুঝতে পেরেছেন যে আগে গানের পিতা-মাতাদের রক্ষা করতে হবে। তারপর বস্ত্র, বাসস্থান। অনেকে এটাকে উল্টো সুরে ভাবতে শুরু করেছিলেন। সবাই ধরেই নিয়েছিলেন বাপ-মা’রা মরে মরুক! আগে বাড়ি ঘর রঙ করে ফেলি। এখন গানের মূল শিল্পীদের স্বার্থ সংরক্ষণ সবার আগে। সেই পথেই এখন এগুচ্ছে ইন্ডাষ্ট্রি। আমার কাছে মনে হয় আগামী দিন বাংলা গানের সবচেয়ে ভালো একটি সময় হতে যাচ্ছে।
 
আপনার ছেলের গিটার বাজানো বা ওর পারফর্মেন্সে তো মুগ্ধ অনেকেই। এলআরবি’র নেক্সট জেনারেশনের হাল কি ধরবে জুনিয়র এবি!
 
এটা আমি কখনও চাপিয়ে দিইনি। বরং ওর স্কুল বা সহপাঠিদের অনেকদিন বুঝতে দেওয়া হয়নি যে, ও আমার ছেলে। আইয়ুব বাচ্চু’র ছেলে বলে আলাদা সুবিধা নিয়ে ওর মেধার অবমূল্যায়ন হোক এটা ওর মা’ও চায়নি। আমিও না। ও নিজের মতো করেই বড় হচ্ছে। কখনও মিউজিকটাকে চাপিয়ে দেওয়া হয়নি।
 
এলআরবি’র একটি কাঙ্ক্ষিত অ্যালবাম এখন অনেকেরই চাওয়া।  শ্রোতারাও নানা সময় প্রশ্ন করে বসে, কবে আসবে? কবে আসছে?
 
এটা সময়ই বলে দেবে। গান তো চলছেই। চলবে যতোদিন প্রাণ আছে। তবে রিলিজের বিষয়টি স্বার্থ সংরক্ষণকারীদেরই ভাবতে হবে। আমি মিউজিশিয়ান, গান বাঁধাই তো আমার কাজ। জীবনে আর তো কিছু শিখিনি। সেটিই করে যাচ্ছি। শ্রোতারা চাইলে অবশ্যই এলআরবির নতুন রিলিজ হবে। আমি আমার সুরে কখনও কাউকে নিরাশ করিনি। সব সময়ই উজাড় করে দিয়েছি। আজীবন তাই-ই দেবো।