দেশে গত আড়াই বছরে ১০ ব্লগার নিহত হয়েছে। শুধুমাত্র রাজিব হায়দারের হত্যা রহস্য উদঘাটন হয়েছে। দুজন বিদেশি নাগরিক খুন হলো। হোসেনী দালানে গ্রেনেড হামলায়ও ঝড়ে গেল দুটি তাজা প্রাণ। সর্বশেষ গতকাল শনিবার একজন প্রকাশক-ব্লগারকে কুপিয়ে হত্যা করা হলো। একই দিন সন্ত্রাসী হামলায় আহত হলেন দুই ব্লগারসহ আরেক প্রকাশক। দেশের এমন পরিস্থিতিতে সব বাহিনী খুব সক্রিয় হলেও একের পর এক এই হত্যা-হামলার দায় এড়াতে পারেন না তারা। এমনটিই বলছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেকে ইত্তেফাকে ফোন করে ক্ষোভের সঙ্গে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন, তাহলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কি ঘুমায়? এসব হত্যাকান্ডের দায় কি তাদের নেই? দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোই বা কি কাজ করে?
জানা গেছে, দেশে বর্তমানে কমপক্ষে ৫টি গোয়েন্দা সংস্থা সক্রিয়। সন্ত্রাসীদের তথ্য সংগ্রহের জন্য কোটি কোটি টাকা ‘সোর্স মানি’ ব্যবহার করা হচ্ছে। একর পর এক এসব হত্যার রহস্য উদঘাটনের জন্য এই টাকা ব্যয় হওয়ার কথা। কিন্তু এতো টাকা যায় কোথায়- এমন প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে পুলিশের কোন কোন এসপি, ডিআইজিসহ একশ্রেণির কর্মকর্তা মামলার তদন্ত গতিশীল করার বদলে বদলি বাণিজ্য নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কর্মকর্তাদের এই ধরনের বাণিজ্যের কারণে মাঠ পর্যায়ে অনেক মামলারই সঠিক তদন্ত হচ্ছে না। তবে পুলিশের আইজি একেএম শহীদুল হক বলেছেন, ‘পুলিশ নিষ্ঠার সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। বিদেশি হত্যার রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। ব্লগারদের উপর হামলকারীদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।’
ইদানিং অনেকে এই প্রতিবেদকের কাছে র্যাবের কার্যক্রম নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেছেন। কারণ একের পর এক ব্লগার হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটনে তেমন একটা সফলতা পাওয়া যায়নি। অথচ সাধারণ মানুষের র্যাবের কাছে প্রত্যাশা অনেক। এ ব্যাপারে র্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ বলেন, ‘র্যাব বসে নেই। কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সংস্থার কাজের গতি আরও বেড়েছে।’
একের পর এক ব্লগার হত্যা: গত ৩০ মার্চ রাজধানীর হাতিরঝিলের বেগুনবাড়িতে দিনের বেলায় ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যার পর পালানোর সময় একজন হিজড়া জিকরুল্লাহ ওরফে জিকির (২০) ও আরিফুর রহমান (১৯) নামে দুইজনকে আটক করে। আটককৃতরা মাদ্রাসার ছাত্র। তাদের একজন চট্টগ্রাম হাটহাজারী মাদ্রাসার ছাত্র। অপরজন ঢাকার যাত্রাবাড়ির একটি মাদ্রাসার ছাত্র।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে বই মেলা থেকে বাসায় ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিত্ রায়কে (৪০) একই কায়দায় কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। হত্যাকারীদের ছুরিকাঘাতে আহত হন তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ায় দেশটির কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার (এফবিআই) একটি দল ঘটনা তদন্তে বাংলাদেশে এসে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে সহায়তা করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ হত্যার তদন্ত ফল ‘শূন্য’।
২০১৩ সালের ১৪ জানুয়ারি উত্তরায় ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিনের ওপর হামলা চালানো হয়। শরীরে শীতের পোষাক থাকায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান। ঐ ঘটনায় পুলিশ এক প্রতিমন্ত্রীর ভাতিজা সাদ আল নাহিয়ান ও মাসুদ রানাকে গ্রেফতার করে। একই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ও ব্লগার ইঞ্জিনিয়ার আহমেদ রাজীব হায়দার শোভনকে কুপিয়ে ও জবাই করে রাজধানীর পল্লবীতে নিজ বাসার সামনে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। মামলার প্রধান আসামি রেদোয়ানুল আজাদ রানা পলাতক। অন্য আসামিরা হলেন, নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক এবং ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশনস বিভাগের বহিষ্কৃত ছাত্র সাদমান ইয়াছির মাহমুদ, ফয়সাল বিন নাঈম দীপ, এহসান রেজা রুম্মান, মাকসুদুল হাসান অনিক, নাঈম ইরাদ ও নাফিজ ইমতিয়াজ এবং আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি মো. জসিমুদ্দিন রাহমানী। এ মামলায় একমাত্র মুফতি জসিমুদ্দিন রাহমানী ব্যতিত অন্য আসামিরা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা ঈমানী দায়িত্ব পালন করতেই রাজীবকে হত্যা করেছে বলে বিচারকের কাছে জবানবন্দী দেন।
২০১৩ সালের ৯ এপ্রিল দিনদুপুরে বুয়েটের ছাত্রলীগ নেতা ও যন্ত্রকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের আবাসিক ছাত্র ব্লগার আরিফ রায়হান দ্বীপকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে হত্যাকারী বুয়েট ছাত্র মেজবাহ উদ্দিন গ্রেফতার হয়। গ্রেফতারের পর মেজবাহ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
৩০ সেপ্টেম্বর সাভারে মেসের ভিতর কুপিয়ে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র এসএম আশরাফুল আলম সুজনকে হত্যা করা হয়। ১৪ ফেব্রুয়ারি মতিঝিলে অগ্রণী ব্যাংকের কর্মচারী ও ব্লগার জাফর মুন্সিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়া ২৮ ফেব্রুয়ারি ব্লগার মামুন হোসেন, ২ মার্চ সিলেটে ব্লগার জগেজ্যাতি তালুকদার ও ৯ ডিসম্বের বগুড়ায় জেলা সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের যুগ্ম-সম্পাদক ব্লগার জিয়াউদ্দিন জাকারিয়া বাবুকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।