উত্তেজনা বা উস্কানি নয়, রাজধানী দিল্লিতে শীতের প্রাক্কালে গণতন্ত্রের উষ্ণতা আর ভারতীয় সহিষ্ণুতার বার্তা ছড়িয়ে দিল ত্জাতীয় কংগ্রেস। সামাজিক উগ্রতা আর বিভাজন তৈরির বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বিকালে রাষ্ট্রপতির হাতে স্মারকলিপি তুলে দিলেন সংগ্রেসের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, সোনিয়া-পুত্র রাহুল গান্ধী এবং দলের প্রথম সারির নেতারা। কংগ্রেসের সদর দপ্তর থেকে মিছিল বের হয় বিকাল চারটায়, দেখা গেল সামনে জোর কদমে হাঁটছেন লোকসভার প্রাক্তন অধ্যক্ষ মিরাকুমারী, সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গোলাম নবি আজাদ, খুরশেদ আলম, অশোক গেইলট আর বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী ও প্রাদেশিক নেতারা। দিনকয়েকের প্রস্তুতিতে কংগ্রেস সংযত আবেগ নিয়ে এত বড় মিছিল করতে পারে, করবে ভাবতে পারেননি রাজধানীর জনতা, হয়ত ভাবেননি শাসক গোষ্ঠীর নেতৃত্ব। সাউথ ব্লক আর নর্থ ব্লককে সাক্ষী রেখে রাষ্ট্রপতি ভবনের দিকে এগিয়ে চলল পদযাত্রা। পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটলেন নেতাকর্মীরা। হাতে প্ল্যাকার্ড, স্লোগানহীন স্তব্ধ কণ্ঠ। কালো টাটা সাফারি আর বিএমডব্লিউ থেকে রাষ্ট্রপতি ভবনের প্রধান ফটকে এসে নামলেন সোনিয়া গান্ধী আর মনমোহন সিং। দুজনেই প্রতিবাদের উচ্চারণহীন ভাষণ নিয়ে এগিয়ে গেলেন ভেতরে। স্মারকলিপি তুলে দিলেন রাষ্ট্রপতির হাতে। অন্যান্য নেতা-কর্মী তখন ফটকের বাইরে। তাদের দিকে ছুটছেন সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিরা। হাঁটতে হাঁটতে হাঁপিয়ে উঠেছেন মিরাকুমারী, তা তার বিবৃতি আর প্রতিক্রিয়ার ভাষা থেকে স্পষ্ট বোঝা গেল। কিন্তু পুলিশ ও অন্যান্য রক্ষীবাহিনী নিশ্চিন্ত, কেননা কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা নেই, ভারতাত্মার কালোত্তীর্ণ শান্তির বাণীর মতো অন্তঃস্রোতা এই মিছিল। মঙ্গলবার কংগ্রেস সোনিয়ার নেতৃত্বে অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবে, রাষ্ট্রপতির দরবারে স্মারকলিপি পেশ করবে, এ সংবাদ জানা ছিল, কিন্তু তাদের পদযাত্রা এত ব্যাপক, এত জনবহুল আর দৃষ্টিআকর্ষক হয়ে উঠবে, তা নেতৃত্ব ভাবেনি, এ কারণেই তাদের সংশয়কে অতিক্রম করে বিরোধী রাজনীতির সদর্থক ভূমিকাকে উঁচিয়ে ধরল মিছিল।
ভারতে গত কয়েকমাসে কোথাও সামাজিক সংঘর্ষ দেখা দেয়নি। কিন্তু এখানে-ওখানে কয়েকটি অপ্রীতিকর ঘটনা ও অসহিষ্ণুতার অপ্রত্যাশিত চেহারা দেখে বিমূঢ় বিস্ময়ে, ক্ষোভে একে একে রাষ্ট্রীয় সম্মান ফিরিয়ে দিলেন দেশের নানা প্রান্তের বহু সংখ্যক লেখক, কবি, চিত্র তারকা ও চিত্র নির্মাতারা। রোমিলা থাপার, ইরফান হবিব, সুমিত সরকারের মত আন্তর্জাতিক খ্যাতির ইতিহাসবেত্তারাও স্বউদ্বেগে সরকারের হস্তক্ষেপ দাবি করলেন। অসন্তোষ জানালেন রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর ড. রঘুরাম রাজন এবং ইনফোসিস কর্তা। রবিবার সাংবাদিক বৈঠকে অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দাবি করলেন ওস্তাদ আমজাদ আলি খান। নিজের জন্মদিনে সরব হলেন অভিনেতা শাহরুখ খান। বুদ্ধিজীবীদের প্রতিবাদের পাশে দাঁড়ালেন জীবিত কিংবদন্তি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ভারতের এমন কোন শহর নেই, যেখানে ক্ষোভে উদ্বেগে বেরিয়ে আসেননি লেখক, কবি ও চিত্রকরেরা। গণতন্ত্র আর বহুত্ববাদী সংস্কৃতির সমর্থনে জাতীয় বিবেকের এই দলবদ্ধ, সংযত প্রতিবাদ ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকেই বড় করলো। ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বিদেশে আমন্ত্রিত বক্তার মঞ্চ থেকে কয়েকটি অপ্রীতিকর ঘটনার নিন্দা করেছেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। আবার তিনিই তার ফেসবুকে দীর্ঘ প্রবন্ধে বুদ্ধিজীবীদের প্রতিবাদকে ‘বানানো বিদ্রোহ’ বলে বিদ্রূপ করেছেন। কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর গরিষ্ঠ নেতা, মন্ত্রী ও সাংসদেরা কতিপয় ব্যক্তি ও সংগঠনের অসহিষ্ণুতাকে সুনজরে দেখেননি। ঘরোয়া বৈঠকে প্রকাশ্যে নিন্দা করছেন। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় একাধিকবার বলেছেন, বহুত্বই আমাদের সংস্কৃতির ভিত। তাকে হেয় করা অনুচিত। বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে এইসব উদ্বেগ, সংযত ক্ষোভ প্রমাণ করছে, ঘোষিত আদর্শ থেকে ভারতকে সরানো যাবে না। তার গণতন্ত্র, তার ধর্মনিরপেক্ষতা, তার পরমত সহিষ্ণুতাই গৌরব আর জাতীয় অলঙ্কার। রাষ্ট্র আর রাজনীতির চেয়ে সমাজের সংহতি ও সদিচ্ছা যে অনেক অনেক উঁচু আর মহান, রাজনীতিকে সঙ্গে নিয়েও একথা মঙ্গলবার জানিয়ে দিল কংগ্রেস।
