গাজীপুর জেলা বিএনপি অফিসের ভেতরের দেয়ালে বিশাল বিশাল ছবি টাঙানো- মেজর জিয়া, খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ও আসম হান্নান শাহের। কিন্তু সারাদিন কেটে যায় অফিসে কোনো নেতা-কর্মী চোখে পড়ে না। সন্ধ্যার পরে গুটি কয়েক স্থানীয় নেতা-কর্মী এসে পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করে সুদিনের প্রতীক্ষায় সময় কাটান। মূলত রাজনৈতিক মামলার চাপে পড়ে জেলার সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়া দেশের অন্যতম প্রধান এই রাজনৈতিক দলটি এখন ধুঁকছে।
তবে বিএনপি’র অফিস তা-ও খোলা পাওয়া যায়, কিন্তু জেলা আওয়ামী লীগ অফিস অধিকাংশ দিনই থাকে তালাবদ্ধ। সরকারি দলের সব নেতার এখন ব্যক্তিগত অফিস রয়েছে। সেখানে বসেই চলে রাজনীতি, তদবির ও ব্যক্তিগত ব্যবসার কাজ। গাজীপুর জেলায় বিএনপি’র তুলনায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থাও খুব একটা ভালো না। নেতারা সবাই ঢাকামুখী, আর ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত। ঝুট ব্যবসা, টেন্ডারবাজি, ক্ষমতার প্রভাব বিস্তার আর কেন্দ্রে যোগাযোগ নিয়েই ব্যস্ত জেলার অধিকাংশ নেতা। সত্যিকার অর্থে, গাজীপুর জেলায় কোনো দলেরই রাজনৈতিক কোনো কর্মকাণ্ড নেই। এমনকি সরকারের অংশ হলেও আওয়ামী লীগ ছাড়া ১৪ দলের অন্য শরীক দলগুলোর কোনো আলাপ বা বৈঠকও হয় না। শরীক দলগুলো এখানে পুরোপুরি উপেক্ষিত।
দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে কাটানো আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের মাঝে দল গোছানোর একটা ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতৃত্ব ও ব্যবসায়ী নেতাদের ভিড়ে প্রবীণ নেতারাও রয়েছেন অস্তিত্বের সংকটে। দলে ব্যবসায়ীদের প্রভাব বাড়ছে। এই ব্যবসায়ীরা টাকার বিনিময়ে কমিটিতে জায়গা করে নিচ্ছে। কয়েকটি অঙ্গ সংগঠনের আংশিক কমিটি হলেও মূল দলসহ সহযোগী সংগঠনগুলোর কোনো সম্মেলন না হওয়ায় নেতা-কর্মী সবার মধ্যেই একটা গা-ছাড়া ভাব দেখা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে জেলা আওয়ামী লীগে বিরাজ করছে এক ধরনের স্থবিরতা। এ স্থবিরতার পিছনে দলীয় গ্রুপিং এবং অপেক্ষাকৃত তরুণ ও টাকা দিয়ে দলে অবস্থান নেয়া ভুঁইফোড় নেতাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি-কাজ করছে বলে রাজনীতি পর্যবেক্ষকদের অভিমত। এ গ্রুপিং নিরসনে কোনো উদ্যোগ না থাকায় দিন দিন তা আরো প্রকট হচ্ছে। ফলে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসাবে বিবেচিত গাজীপুর জেলায় দলের অবস্থা বেশ দুর্বল বলে মনে হয়েছে।
মাত্র ছয় মাস আগেই আওয়ামী লীগের গ্রুপিং এর চূড়ান্ত রূপ দেখা গেছে। ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে কালিয়াকৈরে দু্’পক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহত হয়। এ ঘটনায় মহানগর ছাত্রলীগ সভাপতি মাসুদ রানা এরশাদ গ্রেফতার হন। এ বিষয়ে থানায় হত্যা মামলা রয়েছে। তবে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে কালিয়াকৈর উপজেলায় এক অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের উপস্থিতিতে স্থানীয় যুবলীগের সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি সব মহলে আলোচিত সমালোচিত হচ্ছে। থানায় হত্যা মামলা রয়েছে, চার্জশিটে ‘অভ্যন্তরীণ কোন্দল’ বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনাটি দলের নেতা-কর্মীদের মাঝেও বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।
এ প্রসঙ্গে গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল স্বীকার করেন জেলায় দলের সাংগঠনিক কাঠামো কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘জেলাকে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেন আমার প্রয়াত বাবা আহসান উল্লাহ মাস্টার। পরবর্তী সময়ে সে অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। কিন্তু আমি আমার আসনে প্রতিটি কমিটি করেছি, সম্মেলন করেছি। দলকে চাঙ্গা রেখেছি।’
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বললেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ না থাকলে খেলা হয় না। সেই জন্য রাজনীতিতে জোয়ার নেই। তিনি বলেন, আগামীতে দলের প্রতিটি সম্মেলনে ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে। তিনি দাবি করেন, দলে গ্রুপিং নেই। সরকারি দলে একটু অভিমান থাকতেই পারে। এটাকে বিরোধ বলা যাবে না। আগামী ডিসেম্বরে দলের জেলা কমিটির কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া পর্যায়ক্রমে কাউন্সিলের মাধ্যমে সকল অঙ্গ সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে।
কিন্তু সভাপতির এ আশ্বাস বাণীতে আশ্বস্ত নন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা আওয়ামী লীগের প্রবীণ এক নেতা বললেন, নেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আমরা নিবেদিত, তাই দলে কাজ করছি। নেত্রী না থাকলে কি হবে জানি না। কেননা উপর থেকে নেতা নির্বাচন করার পাঁয়তারা দেখা যাচ্ছে, সেক্ষেত্রে যতই দলের জন্য কাজ করা হোক না কেন শেষ পর্যন্ত তার মূল্যায়ন হবে না।
এ প্রসঙ্গে শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট ওয়াজউদ্দিন মিয়া বলেন, আওয়ামী লীগের এমন অনেক সিনিয়র নেতা রয়েছেন, যারা নিজের গুণাবলীতে বর্তমান অবস্থানে এসেছেন তৃণমূলের সমর্থনে। এ মূহূর্তে দলে সেইসব সিনিয়র ও ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন নেই। এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ভুঁইফোড় নেতাদের সরব অবস্থান। সে কারণে দলীয় কর্মকাণ্ডে কারোরই তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।
মামলায় কাতর বিএনপি: গত সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে আন্দোলনের সময় নাশকতার অভিযোগে জেলার বিভিন্ন থানায় নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা বিএনপির প্রায় ৫ হাজার নেতা-কর্মীর নামে ৩০টির মতো মামলা দায়ের করে পুলিশ। এসব মামলায় মেয়র মান্নানসহ আড়াইশ নেতা-কর্মী গ্রেফতার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১২৫ জনের মতো জামিনে মুক্ত হলেও বাকিরা জেলে রয়েছেন। মামলার কারণে দলের অধিকাংশ নেতা-কর্মী এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে বা রাজনীতি থেকে দূরে নিরাপদ অবস্থান বজায় রেখেছেন। সিটি মেয়র অধ্যাপক এম এ মান্নানের বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা হয়েছে। জেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক মিলন এবং সাধারণ সম্পাদক কাজী সাইয়েদুল আলম বাবুলের বিরুদ্ধে তিনটা করে মামলা হয়েছে। কালিয়াকৈর পৌরসভার মেয়র ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছিল। সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় কালিয়াকৈর বাসে অগ্নিসংযোগ করে একজন নিহত হবার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় এজাহারভুক্ত এক নম্বর আসামি ছিলেন মজিবুর। তিনি এ মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন লাভের পর নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করেননি। তার আগেই পুলিশের দেয়া চার্জশিট থেকে তার নাম বাদ দেয়া হয়েছে। এ মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন গাজীপুর সিটি মেয়র মান্নান। ত্যাগী নেতাদের অভিযোগ, বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতা সরকারের সাথে আঁতাত করে নিজেরা নিরাপদে থাকছেন।
ফলে আন্দোলন তো দূরের কথা, কমিটি নির্বাচন নিয়েই বড্ড জটিলতায় রয়েছে বিএনপি। কাদের কমিটিতে রাখা হবে এ নিয়ে দোটানায় নেতারা। যারা জেলে রয়েছে তাদের কমিটিতে স্থান দেয়া হবে নাকি তাদের দেয়া হবে যাদের নামে মামলা থাকায় কর্মসূচি থেকে দূরে থাকছেন, নাকি তাদের যারা বিভিন্ন মামলা থেকে গা বাঁচিয়ে টিকে রয়েছেন? তবে যারা গা বাঁচিয়ে টিকে রয়েছেন তাদের সুবিধাবাদি হিসাবে চিহ্নিত করছেন মামলা খাওয়া ও জেলে থাকা নেতা-কর্মীরা। এসব নিয়ে কমিটি ঘোষণা নিয়েও অন্তর্দ্বন্দ্ব রয়েছে বিএনপিতে। জানা গেছে, একটি থানার আহ্বায়ক কমিটি গঠন নিয়েও লন্ডন থেকে দলের হাইকমান্ডের নির্দেশনা রয়েছে। ফলে জেলা বিএনপির নেতারা রয়েছেন দোটানায়।
জেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক অ্যাডভোকেট মনজুর মোর্শেদ প্রিন্স বলেন, জেলায় এখন ঘরে বসে ইউনিয়ন কমিটি গঠন করা হচ্ছে। চলছে ফেসবুক রাজনীতি। একারণে প্রকাশ্যে দলের কোনো কার্যক্রম নেই। অনেকে ম্যানেজ করার রাজনীতি করছেন।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী সাইয়েদুল আলম বাবুল বলেন, কেন্দ্র থেকে নির্দেশ ছিল বিগত আন্দোলনে ত্যাগী নেতাদের সম্পৃক্ত করে নতুন কমিটি গঠন করার; কিন্তু বর্তমানে যারা পদে রয়েছেন তারা দলের হাইকমান্ডে লবিং করে স্বপদে টিকে রয়েছেন। তাই ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ নিয়ে বিএনপির স্থানীয় নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা কাজ করছে।
তবে এ কথা মানতে নারাজ জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলন। তিনি বলেন, জেলার নেতাকর্মী সবার সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে; কিন্তু মামলার কারণে সবাই পার্টি অফিসে যায় না। তিনি দাবি করেন, গাজীপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে নতুন কমিটি গঠনের কাজ পুরোদমে চলছে। কালীগঞ্জের সবকটি ওয়ার্ড ও ৬টি ইউনিয়ন কমিটি গঠন সম্পন্ন হয়েছে। সদর উপজেলার কমিটি নতুন করে গঠন করা হবে।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ২৩ জুনের পর জেলা বিএনপির আর কোনো সম্মেলন বা নতুন কমিটি হয়নি। মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে ঢিমেতালে চলছে দল।
