প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত ঝুলে আছে ২ বছর

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০১৫, ২৩:৫৬

কাজে ধীরগতি আর উদাসীনতায় প্রশাসনে দুই বছরেও বাস্তবায়ন হচ্ছে না প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত। আর এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হওয়ায় বেতনক্রমের গ্রেড-১ তথা সচিব এবং গ্রেড-২ তথা অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার পাশাপাশি আর্থিক সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত হচ্ছেন অর্ধশত কর্মকর্তা।

 
জানা গেছে, প্রশাসনে পদোন্নতির চাপের মুখে বেশকিছু পদের মান উন্নয়নের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এ উদ্দেশ্যে ২০১৩ সালের ২৭ অক্টোবর প্রশাসনের ৩০টি পদকে গ্রেড-১ এবং ২০টি পদকে গ্রেড-২ এ উন্নীত করে সরকারি আদেশ জারি করা হয়। কিন্তু এ পদে নিযুক্তিলাভের জন্য যে কাজগুলো করা প্রয়োজন তার অধিকাংশই সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় দুই বছরেও করেনি। ফলে উপযুক্ত ব্যক্তিরা এ সব পদে অধিষ্ঠিত থাকলেও তারা মর্যাদা আর সুযোগ-সুবিধাবিহীন। অর্থাত্ এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যই বিফলে যাচ্ছে।
 
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, তার মন্ত্রণালয়ের যেসকল পদ মানোন্নীত হয়েছে সেগুলো পূরণের জন্য পদোন্নতি নীতিমালা সংশোধন দরকার। কতদিনে তা সম্ভব হবে এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনেক দূর এগিয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মর্যাদাসহ নিয়োগ দেয়া হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। প্রসঙ্গত, যে ৩০টি পদ গ্রেড-১ করা হয়েছিল তার মধ্যে তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তার পদ একটি। এখন পর্যন্ত প্রধান তথ্য কর্মকর্তা তছির আহমেদকে গত বৃহস্পতিবার গ্রেড-১ পদের মর্যাদা দেয়া হয়েছে।  এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চারটি পদকে এ সুযোগ দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
 
জানা যায়, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড, খাদ্য অধিদপ্তর, কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড, বিএসটিআই, এনজিও বিষয়ক ব্যুরো, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, ডাক বিভাগের মহাপরিচালক, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, প্রধান বন সংরক্ষক, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, মত্স্য অধিদপ্তর ও প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, মহাহিসাব নিয়ন্ত্রক, ভূমি রেকর্ড জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বিসিকের চেয়ারম্যান, মহাপরিচালক মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, কম্পোট্রোলার জেনারেল অব ডিফেন্স ফাইন্যান্স, পরিকল্পনা উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, রাজউকের চেয়ারম্যান, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী, মহাপরিচালক আনসার ও ভিডিপি, মহাপরিচালক পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, মহাপরিচালক বাংলাদেশ রেলওয়ে— এই পদগুলোতে যারা নিয়োজিত আছেন তাদের অনেকের অধঃস্তন ব্যাচের, ক্ষেত্রবিশেষে নিজস্ব ব্যাচের কর্মকর্তারাও এখন পূর্ণাঙ্গ সচিব হিসাবে কর্মরত। কিন্তু এসব কর্মকর্তা দপ্তর-অধিদপ্তরের প্রধান ব্যক্তি হিসাবে নিয়োজিত থেকেও সচিবের মর্যাদাটুকু নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারছেন  না। এমন দুঃখের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই।
 
এছাড়া গ্রেড-২ এ উন্নীত হওয়া পদে যারা নিয়োজিত আছেন তাদের অধিকাংশই অতিরিক্ত সচিব বা অতিরিক্ত সচিবের পদে পদোন্নতি পাওয়ার যোগ্য। এ পদগুলো হচ্ছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান, সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধক ও মহাপরিচালক, কারা মহাপরিদর্শক, প্রকাশনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, যানবাহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, ট্রেড মার্কস অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বিটাকের মহাপরিচালক, জীবন বীমার এমডি, মত্স্য উন্নয়ন করপোরেশনের মহাপরিচালক, বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের মহাপরিচালক, এফডিসির মহাপরিচালক, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, হাইটেক কর্তৃপক্ষের এমডি, পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।
 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রেড-২ পদে নিয়োজিতদের বেশিরভাগই দুই থেকে তিন বছর আগে অতিরিক্ত সচিব তথা গ্রেড-২ এ পদোন্নতি পেয়েছেন। এখন তাদের অনেকেই গ্রেড-১ পদের যোগ্য। কিন্তু সামান্য উদ্যোগের অভাবে এ সম্মানটুকু থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
 
যেভাবে মানোন্নীত পদে কর্মকর্তার মান উন্নয়ন করার কথা: সকল বিধিগত আনুষ্ঠানিকতা অর্থাত্ প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পদোন্নতির নীতিমালা সংশোধন করা, আদেশ জারির আগে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নেয়া, জারিকৃত আদেশের কপি অর্থ বিভাগের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ শাখায় পাঠানো ইত্যাদি কাজ করে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় যে তারিখে আদেশ জারি করবে সে তারিখ থেকে তা কার্যকর হবে। কিন্তু এই সামান্য কাজ প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়গুলো ২০১৩ সাল থেকে করতে পারেনি বা করেনি।
 
অন্যভাবেও এ মর্যাদা দেয়ার নজির: এসব শর্ত পূরণ না করেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় অপরাপর শর্ত পূরণ সাপেক্ষে যে কোনো কর্মকর্তাকে প্রথমে ভারপ্রাপ্ত সচিব করে আলোচ্য পদে (গ্রেড-১) নিয়োগ দিতে পারেন। ভারপ্রাপ্ত সচিব করার ছয় মাস পূর্ণ হলে সচিব করতে পারেন। ইতিপূর্বে ১৯৮৩ ব্যাচের এক জন কর্মকর্তাকে এ রকমভাবে পদোন্নতি দেয়া হয়েছিল। প্রথমে তাকে একটি করপোরেশনের চেয়ারম্যান করার সময় ভারপ্রাপ্ত সচিব মর্যাদা দিয়ে পরে সচিব করা হয়েছিল।
 

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শর্ত বা বিধি-বিধান বড় কথা নয়, বড় হচ্ছে সদিচ্ছা। এটা থাকলে যে কোনো উপায়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা যায়। তাই সদিচ্ছার বড় অভাব প্রশাসনে। স্বার্থটি কার এবং ব্যক্তিটি কার পছন্দের– এ রকম বিবেচনা নিয়ে প্রশাসন চালানো হলে ক্ষোভ-অসন্তোষ বাড়তেই থাকবে বলে তাদের অভিমত।