খুলনায় শিশু রাকিব হত্যায় ২ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০১৫, ১৫:০৫

খুলনায় চাঞ্চল্যকর শিশু রাকিব হত্যা মামলায় দুইজনের ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আদালত। তবে এ মামলার আপর একজনকে আসামিকে খালাস দেয়া হয়েছে।

রবিবার দুপুর ১২টা ৪৮ মিনিটে খুলনা মহানগর দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ দিলরুবা সুলতানা জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় দেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- গ্যারেজ মালিক ওমর শরিফ ও তার সহযোগী কথিত চাচা মিন্টু খান।

অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় শরীফের মা বিউটি বেগমকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছে।

রায় ঘোষণার সময় তিন আসামিই আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।

রায়ে বিচারক দিলরুবা সুলতানা উল্লেখ করেন, ৩০২ ধারা অনুযায়ী আসামি শরীফ ও মিন্টু খানের বিরুদ্ধে অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের মৃত্যুদণ্ডে আদেশ দেয়া হলো। অন্যদিকে শরীফের মা বিউটি বেগমের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে বেকসুর খালাস দেয়া হলো।

একই সঙ্গে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আগামী সাত দিনের মধ্যে উচ্চ আদালতে আপীল করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

আদালত দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে রায় পড়া শুরু করেন। এর মাত্র তিন মিনিট পর ১২টা ৪৮ মিনিটে তিনি রায় ঘোষণা শেষ করেন।

রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আসামি শরীফ ও মিন্টু খানের মাথা নিচু হয়ে যায়। তবে তাদের কান্নাকাটি করতে দেখা যায়নি। অপরদিকে, শরীফের মা নিজে খালাস পেলেও ছেলের মৃত্যুদণ্ডের আদেশের কারণে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।

এদিকে, রায় শোনার সঙ্গে সঙ্গে আদালতের বাইরে থাকা বাদীপক্ষ ও উৎসুক জনতা উল্লাসে ফেঁটে পড়েন। বিশেষ করে নিহত রাকিবের বাবা-মা ও বোনসহ আত্মীয়-স্বজনরা আসামিদের দ্রুত ফাঁসির দাবি জানিয়ে আদালতের সামনের সড়কে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

রাকিবের বাবা মো. নূরুল আলম এ প্রতিবেদককে জানান, শরীফের মা বিউটি বেগম খালাস পাওয়ায় তারা খুশি হতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘হত্যাকারীদের দ্রুত ফাঁসি হলে রাকিবের আত্মা শান্তি পাবে, আর যেন কোন রাকিবের জীবন এভাবে ঝরে না যায়, এ হত্যার বিচারের শাস্তি দেখে আর কেউ যেন এ ধরনের অপরাধ ঘটানোর সাহস না পায়।’
 
রাকিবের মা লাকি বেগম বলেন, আমার রাকিব আর কোনদিন আমার কাছে ফিরে আসবে না। এ ধরনের অপরাধ যেন কেউ আর না করতে পারে। তিনি মৃত্যদণ্ডপ্রাপ্তদের দ্রুত ফাঁসি কার্যকরের দাবি জানান। শরিফের মায়েরও মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত ছিল বলে জানান তিনি।

রাকিবের একমাত্র ছোট বোন রিমি আক্তার পারভীন বলেন, তার ভাইকে যেভাবে কষ্ট দিয়ে করে হত্যা করা হয়েছে- খুনীদেরও যেন সেভাবে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারা হয়।

ফাঁসির দাবিতে আদালত চত্বরে ক্ষুব্ধ মানুষের স্লোগান:

রাকিব হত্যা মামলার আসামি শরীফ, কথিত চাচা মিন্টু খান ও শরীফের মা বিউটি বেগমকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে বেলা পৌনে ১২টায় খুলনা মহানগর দায়রা জজ আদালতে হাজির করা হলে আদালত চত্বরে উপস্থিত শত শত মানুষ ফাঁসির দাবিতে স্লোগান দেয়। এ সময় ক্ষুব্ধ জনতা  উচ্চকণ্ঠে বলেন, ‘ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই, শরীফ, মিন্টু, বিউটির ফাঁসি চাই। ফাঁসি ছাড়া আর কোন দাবি নাই।’

রায়ে  রাষ্ট্র ও বাদী পক্ষের সন্তোষ প্রকাশ:
রাকিব হত্যা মামলার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্র ও বাদী পক্ষের আইনজীবীরা।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পিপি কাজী আবু শাহিন বলেন, খুবই স্বল্প সময়ের মধ্যে চাঞ্চল্যকর এ মামলায় রায় ঘোষণা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। আসামিদের উপযুক্ত শাস্তি হয়েছে। এ রায় নতুন কোন অপরাধ সংগঠন না হওয়ার ক্ষেত্রে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বহন করবে।

অপরদিকে, আসামি পক্ষের আইনজীবী তৌহিদুর রহমান চৌধুরী তুষার এ রায়কে আবেগতাড়িত বলে মন্তব্য করে বলেন, স্বাক্ষ্য প্রমাণ অনুযায়ী সকল আসামির খালাস পাওয়ার কথা। কিন্তু আদালত সে অনুযায়ী রায় দেননি। ন্যায় বিচারের জন্য আইনী প্রক্রিয়ায় আসামি পক্ষ উচ্চ আদালতে যাবে।
 
মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার প্রতিক্রিয়া :
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা, খুলনা ইউনিটের সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম বলেন, চাঞ্চল্যকর এ মামলাটি মাত্র ১১ কার্যদিবসে শেষ হয়েছে। এত স্বল্প সময়ের মধ্যে মামলার রায় ঘোষণা বাংলাদেশের ইতিহাসে নেই। এ রায়ের কারণে মানুষের আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়বে।


ফ্লাস ব্যাক :  
উল্লেখ্য, গ্যারেজের কাজ ছেড়ে পার্শ্ববর্তী অন্য একটি গ্যারেজে কাজ নেয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে গত ৩ আগস্ট সন্ধ্যায় নগরীর টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোডের শরীফ মোটর্স গ্যারেজের মালিক ওমর শরীফ ও তার সহযোগী কথিত চাচা মিন্টু খান দোকানের ভেতর নিয়ে শিশু রাকিবের পায়ুপথে হাওয়া দেয়ার মেশিন দিয়ে বাতাস ঢুকিয়ে দেয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে রাত পৌনে ১০টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় রাকিবের বাবা আলম হাওলাদার তিনজনকে আসামি করে পরদিন খুলনা সদর থানায় ঘাতক শরীফ মটরস’র মালিক মো. শরীফ ও সহযোগী মো. মিন্টু খান ও শরীফের মা বিউটি বেগমের নামে হত্যা মামলা দায়ের করেন। রাকিবের মৃত্যুর খবর পেয়ে ওইদিন রাতে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বিক্ষুব্ধ জনতা শরীফ ও মিন্টুকে গণপিটুনী দিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ ও পরে পুলিশ শরীফের মাকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতার হওয়া তিনজনই হত্যায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত বলে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।