শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মন্ত্রী-এমপিদের প্রচারণায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। মন্ত্রী-এমপিদের প্রচারণার সুযোগ রেখে পৌরসভা (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা-২০১৫-এর খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কিন্তু সরকার মনে করে এ সুযোগ রাখলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিতর্কিত হতে পারে, এ নিয়ে দেশে-বিদেশে আপত্তি উঠতে পারে। আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক গতকাল নির্বাচন কমিশনের সচিবকে জাতীয় সংসদে ডেকে নিয়ে মন্ত্রী-এমপিদের প্রচারণার সুযোগের বিষয়ে সরকারের আপত্তির কথা জানান। মন্ত্রী এই আপত্তিসহ বিধিমালার আরো কিছু বিষয়ের সংযোজন-বিয়োজন করে পুনরায় ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে নির্বাচন কমিশনকে পরামর্শ দিয়েছেন।
এদিকে পৌরসভার নির্বাচনের মেয়র, সংরক্ষিত কাউন্সিলর এবং সাধারণ কাউন্সিলর পদে নির্বাচন দলীয়ভিত্তিতে হচ্ছে। আইন পাসের পর শুধু মেয়র এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করা যায় কিনা—এ নিয়ে সরকারের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে নতুন করে চিন্তা-ভাবনা দেখা দেয়। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে নির্বাচন কমিশনের অভিমতও জানতে চাওয়া হয়। কমিশন থেকে জানানো হয়, এটি করতে হলে নতুন করে আবার মূল আইনে পরিবর্তন আনতে হবে। মূল আইন পরিবর্তন করে পৌরসভার নির্বাচন নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে করা সম্ভব নয়। এখন সিদ্ধান্ত হয়েছে, অধ্যাদেশ যেভাবে জারি হয়েছে সেইভাবে পৌরসভার নির্বাচন করার। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের আইন প্রণয়নকালে শুধু চেয়ারম্যান পদে দলীয়ভাবে নির্বাচন করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ইসির খসড়া বিধিমালা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, চিফ হুইপ, বিরোধী দলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ, উপমন্ত্রী বা তাদের সমমর্যাদার কোন ব্যক্তি, সংসদ সদস্য এবং সিটি করপোরেশনের মেয়ররা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। ওই প্রস্তাবে বলা হয়, গুরুত্বপূর্ণ ওইসব ব্যক্তি কোন প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় সরকারি যানবাহন, প্রচারযন্ত্রের ব্যবহার বা অনধিক সরকারি সুবিধা ভোগ করতে পারবেন না। একইসঙ্গে সরকারি-আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ব্যবহার করতে পারবেন না। পাশাপাশি ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ভোটদান ছাড়া শুধু ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ বা ভোট গণনার সময় গণনাকক্ষে প্রবেশ বা উপস্থিত থাকতে পারবেন না।’ তবে ওই প্রস্তাব পাঠানোর পরপরই নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা।
নতুনভাবে ইসির সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে পৌরসভা (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা-২০১০ এ অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যে বিধান ছিল তা রাখার পক্ষে আইন মন্ত্রণালয়। ওই বিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ এবং সরকারের কোন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপ-মন্ত্রী বা তাদের সমমর্যাদার কোন ব্যক্তি, সংসদ সদস্য এবং সিটি করপোরেশনের মেয়ররা নির্বাচন-পূর্ব সময়ে নির্বাচনী প্রচারণায় বা নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না। পাশাপাশি কোন সরকারি কর্মকর্তা, কোন নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে বা নির্বাচনী কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। তবে শর্ত থাকে যে, উল্লিখিত ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার ভোটার হলে কেবল ভোট দিতে উক্ত এলাকায় যেতে পারবেন। এছাড়াও ইসির পাঠানো খসড়া বিধিমালায় দলীয় মনোনয়নের কর্তৃপক্ষ, দলীয় মনোনয়ন গ্রহণের পর অন্য প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিল, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের শর্তযুক্ত ভোটারের বিধানেও কিছু পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিয়েছেন আইনমন্ত্রী। প্রতীক বরাদ্দের পর লিফলেট আকারে ব্যালট পেপার প্রচারণার বিষয়টিও বিধিমালায় যুক্ত করার পরামর্শ রয়েছে।
আইনমন্ত্রী গতকাল দুপুর ২টায় ইসি সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম ও যুগ্ম সচিব জেসমিন টুলির সঙ্গে বৈঠক করে সরকারের মনোভাব ব্যক্ত করেন। পরে ইসি সচিবালয়ের শীর্ষ দুই প্রতিনিধি আইনমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের সারমর্ম নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের সাথে বৈঠক করেন।
পৌরসভা (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালায় অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রচারণার সুযোগ বন্ধ করার বিষয়ে জানতে চাইলে ইসি সচিবালয়ের সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। ভেটিং হওয়ার পর জানা যাবে নির্বাচনী বিধিমালায় কি কি বিষয় থাকছে।’