গোলাপ বানুর বয়স ১০ কি ১১ বছর। এই বয়সেই সে খুব ভোরে উঠে মায়ের সাথে ময়লার স্তূপ থেকে বিভিন্ন জিনিস টোকানোর কাজ শুরু করে। কখনো হাত-পা কেটে যায়। স্যাঁতস্যাঁতে জায়গা আর নোংরার মধ্যে কাজ করতে করতে জ্বর আসে; কিন্তু কাজ ছাড়ার কথা ভাবতেও পারে না গোলাপ বানুরা। কারণ এখান থেকেই আসে তাদের দুই বেলার খাওয়ার পয়সা।
রাজধানীর অদূরে মাতুয়াইলে ময়লার ডাম্পিং স্টেশনে স্টাফ ছাড়া অন্যদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও গোলাপ বানুদের মতো কয়েকশ শিশু-কিশোর এখানে আসে জীবিকার সন্ধানে। সুই, সিরিঞ্জ, স্যালাইন প্যাকেট, ক্যানুলা সেট, তরল ওষুধের শিশি, বোতলের ছিপি, গজ, ব্যান্ডেজ, তুলা, শল্যবিদদের ব্যবহূত ছোট ছুরিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র খুঁজে বের করে তারা। ময়লা বাছাইয়ের এ কাজে প্রতিদিন গড়ে একশ থেকে দেড়শ টাকা পর্যন্ত আয় করে কেউ কেউ।
আমাদের দেশে যখন এসব শিশু-কিশোর ময়লা ঘাঁটায় ব্যস্ত, তখন সারাবিশ্বে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিশু দিবস। দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশেও নেয়া হয়েছে নানা কর্মসূচি; কিন্তু প্রতি বছর এই দিনটিতে দেশে শিশুদের উন্নয়নে গালভরা আলোচনা করা হলেও গোলাপ বানুর মতো শ্রমজীবী শিশুদের ভাগ্যের তেমন একটা পরিবর্তন হয় না।
জানা গেছে, জীবিকার তাগিদে মাতুয়াইল ডাম্পিং স্টেশনে কাজ করা এসব শিশু-কিশোররা চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘক্ষণ ময়লা-আবর্জনা ঘাঁটাঘাঁটি করার কারণে এদের অনেকে চুলকানিসহ নানা ধরনের চর্মরোগে ভোগে। শিশু ও কিশোরদের লেখাপড়া ব্যাহত হয়। মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে অনেকেই।
জাতীয় অধ্যাপক ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম আর খানের মতে, ঝুঁকিপূর্ণভাবে ক্লিনিক্যালসহ নানা বর্জ্য কুঁড়ানোর ফলে শিশু-কিশোররা ইনফেকশনে অঙ্গহানির আশঙ্কার মধ্যে বেড়ে উঠছে। তাছাড়া তারা প্রতিনিয়তই জ্বর ও কাটা-ছেঁড়ার মতো অসুখের জন্য অতিরিক্ত এন্টিবায়োটিক খায় বলে তাদের কিডনি ও হার্টের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। তারা মাদকাসক্ত হলে কুড়িয়ে পাওয়া হেপাটাইটিস বি, সি এমনকি এইচআইভি এইডসে আক্রান্ত রোগীদের সিরিঞ্জ ব্যবহার করলে এসকল রোগ হওয়ারও আশঙ্কা থাকে।
শিশুদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ ছাড়াও ৬ থেকে ১০ বছরের শিশু এবং ১৪ থেকে ১৮ বছরের কিশোর-কিশোরীরা এ ময়লা বাছাইয়ের কাজে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে। অনেক বাবা-মা আবার তাদের স্কুলগামী সন্তানদের লেখাপড়া বাদ দিয়ে এই কাজে নিয়োজিত করেছে বাড়তি আয়ের আশায়। এখানে কাজ করা শিশুরা দিনে গড়ে ১০০ টাকা থেকে দেড়শ টাকা পর্যন্ত রোজগার করছে। ফলে শিশুরা লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে এবং অল্প বয়সেই উপার্জনের লোভে পড়ে যাচ্ছে। অনেক শিশু পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম হওয়ায় ইচ্ছা থাকলেও কাজ ছাড়ার কথা ভাবতে পারে না। এদের অনেকেই টোকাই থেকে পরে ভাঙ্গারির দোকানের মালিক হয়।
স্থানীয় ভাঙ্গারি দোকানের মালিক মো. হাকিম বলেন, ময়লা টোকাইদের বেশিরভাগেরই আবাসস্থল মাতুয়াইল এলাকার ডাম্পিং সাইটে। কেউ কেউ আবার ধলপুর এলাকায় বাস করে। আরেকটি ভাঙ্গারির দোকানের মালিক আয়নাল হক জানান, প্রতিদিন সকালে টোকাইদের কাছ থেকে তিনি কেজি দরে ময়লা কিনে নেন। এরপর প্লাস্টিকের বোতল, স্যান্ডেল, পলিথিন, টিনের কৌটা ইত্যাদি ময়লা ক্যাটাগরি অনুযায়ী ভাগ করে বিক্রির জন্য বস্তায় ভরে রাখেন। বস্তা প্রতি তার ১০০ থেকে ২০০ টাকা লাভ হয়।
শিশুদের জীবনমান উন্নয়নে কর্মরত বেসরকারি সংস্থা ‘নাগরিক উদ্যোগে’র পরিকল্পনা সমন্বয়কারী নাদিরা পারভিন জানান, একজন সাধারণ শিশুর মতো এই শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিত্সা আর বিনোদনের অধিকার আছে। আমরা তাদের সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছি।
এ ব্যাপারে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, উন্নয়ন সংস্থার প্রজেক্ট ভিত্তিক কাজ এই শিশুদের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্পূর্ণ করতে পারে না। ফান্ড শেষ হলে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তার মতে, এই এলাকায় কর্মরত শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও চিকিত্সার জন্য বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে সরকার ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
আইন ও সালিস কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বলেন, স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও আমরা শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি, এটা আমাদের জন্য যেমন কষ্টের তেমন লজ্জারও বটে। এই সময়ে এসে শিশুরা খাদ্যের জন্য আর্বজনার স্তূপে কাজ করে -এটা বাস্তবতা; কিন্তু এই বাস্তবতা দিনের পর দিন মেনে নিলে চলবে না। এসব বিষয় মাথায় রেখেই পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক সচিব নাসিমা বেগম বলেন, এসব শিশুর উন্নয়নে কাজ শুরু করেছে সমাজ কল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এক মাসের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সমাজ কল্যাণ সচিব তারিক-উল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, মহিলা ও শিশু, শ্রম এবং সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় রাস্তার শিশুদের ঘরে ফিরিয়ে নিতে একযোগে কাজ করছে। পথশিশুদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। তালিকা হাতে পাওয়ার পরই ব্যবস্থা নেয়া হবে।