উদ্বোধনের বছরে ভেঙ্গে যায় ব্রিজ, কেউ কথা রাখেনি ৩২ বছরেও

আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৯, ১৬:৫১

‘৩২ বছরে ৩ জন এমপি ক্ষমতায় এলো-গেলো; কিন্তু কেউ কথা রাখেনি। ভোটের সময় এমপি, উপজেলা, ইউপি চেয়ারম্যানরা ভোট চাইতে আসে কিন্তু ভোটের পরে আর আমাদের খবর নেয় না। এলাবাসীর কাছে চাঁদা তুলে ভাঙ্গা রাস্তা মেরামত করা হয়েছে। খরা সময় বাঁশ-কাঠের সাঁকো দিয়ে পার হতে হয়। ১৯৮৭ সাল থেকে বর্ষাকালে ২০ টিরও বেশি গ্রামের মানুষকে নৌকায় পর করি। বিনিময়ে পায় ২-৫ টাকা করে সারাদিনে জোটে ২-৩শ টাকা। কেউ দেয় আবার কেউ দেয় না। এলাকার বিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের কাছে কোন সময় টাকা চাইনা।’ আবেগআপ্লুত হয়ে কথাগুলো বলছিলেন বর্মপুর এলাকার ৭০ বছর বয়সী সামশুল হক।

৩২ বছর থেকে রানীশংকৈল উপজেলার ল্যাহেম্বা ও হোসেনগাঁও ইউনিয়নের মানুষকে রাউতনগর বাজার এলাকায় কুলিক নদীতে পারাপার করে আসছেন তিনি।

সামশুল হক জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে এলজিইডি করবে আর এলজিইডি বলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড করবে। এভাবেই পার হয়ে গেল ৩২ বছর। গত ২ বছর আগে ঠাকুরগাঁওয়ের ডিসি পরিদর্শনে আসলে অনেক অনুরোধ করে বলেছিলাম স্যার ব্রিজ কবে হবে হোক আমাদের নদীর দু’পাশে রাস্তা মেরামত করে দেন আমরা এলাকাবাসী আপাতত কোন রকমে চলা ফেরা করি তাও কোন কাজ হয়নি। আপনি সাংবাদিক ছবি তুলে কি করবেন? অনেকবার মিটিয়াতে প্রকাশ হয়েছে। আমাদের কষ্টের শেষ নাই।

আরো পড়ুন: ব্যালটে সিল মারার সময় সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তাসহ আটক ৩, ভোট স্থগিত

জানা গেছে, ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলার ল্যাহেম্বা ও হোসেনগাঁও ইউনিয়নের মানুষকে পানির সুবিধা ও পারাপারের জন্য রাউতনগর বাজার এলাকায় কুলিক নদীতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর ব্রিজ উদ্বোধনের বছরে বন্যায় ভেঙ্গে পড়ার ৩২ বছরেও নতুন ব্রিজ নির্মাণ হয়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) একে অপরকে চাপাচাপির ফলে ব্রিজটি নির্মাণ না হওয়ায় ওই উপজেলার হোসেনগাঁও ও ল্যাহেম্বা ইউনিয়নের ২০ টিরও বেশি গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। 

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ওই এলাকায় কুলিক নদীর এক পাশে ল্যাহেম্বা ইউনিয়ন ও অপর পাশে হোসেনগাঁও ইউনিয়ন মাঝ খানে ১৯৮২ সালে ঠাকুরগাঁও পানি উন্নয়ন বোর্ড কুষকদের সুবিধার্থে বাধ ও বাধের উপরে ব্রিজ নির্মাণেও পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। কার্যক্রম শেষ করে ব্রিজটি নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে ১৯৮৬ সালের শেষের দিকে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেন পাউবো কর্তৃপক্ষ। 

কৃষকরা কোন প্রকার সুবিধা পাওয়ার আগেই ১৯৮৭ সালের বন্যায় ব্রিজটি ভেঙ্গে যায়। তারপর থেকে আশেপাশের ২টি ইউনিয়নের বর্মপুর, বিরাশি, ল্যাহেম্বা, শ্যামলাডাঙ্গী, রসুলপুর, কার্তিপুর, কোচলসহ ২০টিরও বেশি গ্রামের মানুষকে বর্ষাকালে নৌকা ও খরা মৌসুমে বাঁশের সাঁকো দিয়ে নদী পার হয় সেই ১৯৮৭ সাল থেকে।

আরো পড়ুন: মাতৃত্ব অর্থ একজন নারীর সর্বস্ব ছেড়ে দেওয়া নয়: কারিনা

 উপজেলা সদর থেকে কিছুটা দূরে হওয়ায় নদীর এক পাড়ে রাউতনগর বাজার ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষার জন্য সরকারি প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও দুইটি কিন্ডার গার্টেন বিদ্যালয় অবস্থিত। বিশেষ করে বিবাহ বা অন্য কোন অনুষ্ঠান হলে বেশি সমস্যা দেখা যায়। কারণ একপারে গাড়ী রেখে ২-৪ কিলোমিটার পথ হেটে যেতে হয়।

রসুলপুর গ্রামের গৃহবধূ সালমা বেগম জানান, ‘বর্ষাকালে তাদের নৌকায় করে নদী পার হতে হয়। শিশুদের জন্য দুশ্চিন্তায় হয়।’

সলেমান আলী, নজরুল ইসলাম, মখলেসুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন পথচারী জানান, বর্ষাকালে ভোগান্তি হয়। হাট-বাজার মালামাল নিয়ে যেতে পারি না। গাড়িতে ১০-১২ কিলোটিার ঘুরে আসতে। ছেলে-মেয়েরা সময়মত স্কুল ও কলেজে পৌঁছাতে পারে না। এবার আরও বিএনপির এমপি জয়ী হয়েছে সংসদে যায়নি তাই মনে হয় আমাদের কষ্ট বুঝি আর শেষ হবে না!

রাউতনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আঁখি, লতা, নিহার বলেন, একটি ব্রিজের কয়েটি খুঁটি এখনও দাড়িয়ে আছে। দাদা-দাদীর কাছে শুনেছি ব্রিজ হয়েছিল কিন্তু চলাচলের আগেই ভেঙ্গে যায়। আমরা সকলে চাই প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের দুর্ভোগের কথা শুনতে পেলে আর আমাদের দু:খ থাকবেনা।

ঠাকুরগাঁও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘ঠাকুরগাঁওয়ে নতুন এসেছি। তাই ওই এলাকায় তখন কেন পুন:রায় কাজ হয়নি সে বিষয়ে বলতে পারছি না। তবে দ্রুত পরিদর্শন করে কিছু করার থাকলে চেষ্টা করবো।’

ঠাকুরগাঁও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী কান্তেশ্বর বর্মণ বলেন, ‘ওই এলাকায় কুলিক নদীতে ব্রিজটি জন্য একাধিকবার মাপযোগ হয়েছে। কিন্তু ব্রিজটি কথায় ও কতটুকু নির্মাণ হলে নদীর ধারা ঠিক থাকবে তা এখনও নির্ধারণ করা যায়নি। কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।’ 

ইত্তেফাক/বিএএফ