প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করতে না পারলে বাংলাদেশ কখনোই অভিশাপমুক্ত হবে না। কারণ, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে তারা যে অপরাধ করেছে, তার কোনো সীমা নেই। তাই একাত্তরের ঘাতকদের বিচার ও রায় কার্যকরের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশকে অভিশাপমুক্ত করছি। আর এতে একাত্তরের স্বজনহারা পরিবারগুলো কিছুটা হলেও সান্ত্বনা পাচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা দেশকে অভিশাপমুক্ত করতে পারছি বলেই বাংলাদেশ আজ সব দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে, সর্বক্ষেত্রে উন্নয়ন হচ্ছে। তাই যতই ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত করা হোক না কেন, বাংলাদেশের এই উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে কেউ রুখতে পারবে না।
গতকাল সোমবার রাতে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে দশম জাতীয় সংসদের অষ্টম অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। প্রায় ৪০ মিনিটের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, দেশীয়-আন্তর্জাতিক নানা ষড়যন্ত্র, বিএনপি-জামায়াত জোটের নাশকতা-সন্ত্রাস-মানুষ হত্যাসহ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের তথ্য দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন।
সংসদ নেতা বলেন, বাংলাদেশ নিরাপদ বা অনিরাপদ এ নিয়ে আমাদের অনেক কথা শুনতে হয়েছে। অনেকেই জোর-জোবরদস্তি করে বাংলাদেশে আইএস বা জঙ্গি আছে একথা বলানোর চেষ্টা করেছে। যেসব দেশ একসঙ্গে বসে এসব কথা বলানোর চেষ্টা করছে, তাদের দেশের অবস্থা কী? প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বলেছি, বাংলাদেশে আইএস কিংবা জঙ্গিদের স্থান হতে দেব না। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একটি নিরাপত্তা প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই রিপোর্টেই স্পষ্ট হয়েছে বাংলাদেশ এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক উন্নত দেশ থেকেও নিরাপদ। এই শান্তিপূর্ণ অবস্থা যাতে ধরে রাখা যায় সে ব্যাপারে তিনি দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করে বলেন, বাংলাদেশে কোন আইএস বা জঙ্গিবাদের স্থান না হয় এজন্য আসুন আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করি।
নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা দেশে জঙ্গি বা আইএস আছে বলার চেষ্টা করছে, তারাই পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির দোষ দেয়ার চেষ্টা করেছে।
তিনি বলেন, আমরা দুর্নীতি কিংবা নিজেদের ভাগ্য গড়তে ক্ষমতায় আসিনি, আমরা জনগণের ভাগ্যে গড়তে ও তাদের কল্যাণে ক্ষমতায় এসেছি। বাংলাদেশ আর পিছিয়ে থাকবে না। বাংলাদেশ যে উন্নয়নের গতিশীলতা ধরে রেখে এগিয়ে চলেছে, যতই ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত করা হোক না কেন, সেই উন্নয়নের গতিধারা কেউ রুখতে পারবে না। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবেই।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর এই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে অর্ডিন্যান্স জারি ও ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল। অনেক যুদ্ধাপরাধীকে গ্রেফতার এবং তাদের বিচার শুরু হয়েছিল। অনেক যুদ্ধাপরাধীর শাস্তিও হয়েছিল। বিচারের ভয়ে একাত্তরের গণহত্যাকারী অনেক যুদ্ধাপরাধী পালিয়ে পাকিস্তানে গিয়ে সেদেশের নাগরিকত্ব নিয়েছিল। কিন্তু ’৭৫-এর পর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল জিয়া সেসব যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে দেয় এবং তাদের কারাগার থেকে মুক্ত করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছিল। যুদ্ধাপরাধী শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী এবং কুখ্যাত গণহত্যাকারী আবদুল আলিমকে মন্ত্রী বানিয়ে তাদের গাড়িতে লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছিল এই জিয়াউর রহমান।
শেখ হাসিনা বলেন, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধী যুদ্ধাপরাধীদের যে বিচার জিয়াউর রহমান বন্ধ করে দিয়েছিল, আমরা তাদের বিচার করে দেশকে অভিশাপমুক্ত করছি। বিচারের রায় কার্যকর দেখে একাত্তরের স্বজনহারা পরিবারগুলো অন্ততঃ কিছুটা শান্তি পাচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু যুদ্ধাপরাধীদেরই নয়, বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদেরও এই জিয়া প্রতিষ্ঠিত ও পুরস্কৃত করেছে। পরবর্তীতে জেনারেল এরশাদের সময়ও বঙ্গবন্ধুর খুনি ফারুককে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করা হয়েছিল, রাজনৈতিক দল গঠনের সুযোগ দেয়া হয়েছিল। আর খালেদা জিয়া বঙ্গবন্ধুর খুনি রশিদকে প্রহসনের নির্বাচনে বিজয়ী করে এনে সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসিয়েছিল। আমরা ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার করেছি, রায়ও কার্যকর করেছি। জেলহত্যার বিচারের মাধ্যমে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে দেশকে মুক্ত করেছি।
বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচন ঠেকানোর নামে খালেদা জিয়া শত শত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছেন। আবার ২০১৫ সালে আন্দোলনের নামে তিনটি মাস নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ থেকে দেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছেন। সংসদ নেতা বলেন, আন্দোলনের নামে মানুষকে পুড়িয়ে হত্যার পর কিছুই করতে না পেরে বিএনপি নেত্রী বিদেশে গেলেন। আর তখনি আমাদের দেশে দুইজন বিদেশি নাগরিককে হত্যা করা হলো। আর এক বিদেশিকে হত্যার চেষ্টা চালনো হলো।
বাংলাদেশ বিদেশিদের জন্য অন্যতম নিরাপদ দেশ: রওশন এরশাদ
প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদও সমাপনী বক্তব্যে অংশ নেন। রওশন এরশাদ বলেন, হঠাত্ করেই দেশে তাজিয়া মিছিলে হামলা, বিদেশি নাগরিক হত্যাসহ নানা ঘটনা ঘটছে। এ ধরণের হামলা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর হামলা। কারা করেছে, কে করেছে- তাদের অবশ্যই খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তি দিতে হবে। তিনি বলেন, কেন আমাদের দেশে দু’একটা ঘটনা ঘটলেই নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে? বরং আমি বলবো, বাংলাদেশ বিদেশিদের জন্য বিশ্বের মধ্যে অন্যতম নিরাপদ দেশ। এদেশে বিদেশিদের যে সন্মান দিয়ে আমরা রাখি, পৃথিবীর কোন দেশে তা দেয়া হয় না।
