ওয়ার্ল্ড রোবট কনফারেন্স ২০১৫

চীনে যন্ত্রমানবের মিলনমেলা

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০১৫, ০১:৩৬

রোবট নিয়ে মানুষের রোমান্টিসিজমের শেষ নেই। বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর বড় একটি জায়গা দখল করে রেখেছে এই রোবট। ক্রমাগত প্রযুক্তির উত্কর্ষ কল্পলোকের এসব রোবটকে হাজির করেছে বাস্তবতায়। ফলে বৈচিত্র্যময় সব কাজের ক্ষেত্রে বাড়ছে রোবট ব্যবহারের সুযোগ। গেল সপ্তাহে এমন বৈচিত্র্যময় সব ক্ষেত্রের রোবটদের এক মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়ে গেল চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে। জানাচ্ছেন তরিকুর রহমান সজীব

 
কল্পবিজ্ঞানের কাহিনীর গণ্ডি পেরিয়ে রোবট এই প্রযুক্তি যুগের এক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে গত এক দশকে রোবট নিয়ে যে বিস্তর গবেষণা হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে এখন অনেক দেশেই পরীক্ষামূলকভাবে নানা কাজে রোবটের ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে। এমনকি শিল্প রোবটের ব্যবহার মানবকর্মীদের ছাটাইয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে কি না, তা নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়ে গেছে। শিক্ষা আর বিনোদনের জন্যও দারুণ সব রোবট তৈরি করছে রোবট নির্মাতারা। আর সাম্প্রতিক সময়গুলোতে চেষ্টা করা হচ্ছে দৈনন্দিন জীবনযাপনের সাথে সমন্বয় করতে পারে এমন রোবট তৈরির। এমন সব বৈচিত্র্যময় রোবটদের নিয়ে ২৩ নভেম্বর থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের চায়না ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ‘ওয়ার্ল্ড রোবট কনফারেন্স ২০১৫’। এই সম্মেলনে অনেকটাই ভবিষ্যত্ পৃথিবীর একটি খণ্ডচিত্র উপস্থাপিত হয়েছে বলেই মনে করছেন এই রোবট সম্মেলনের আয়োজক ও দর্শনার্থীরা।
 
রোবট নিয়ে বিশ্ববাসীর যে আগ্রহ রয়েছে, তা মাথায় রেখেই আয়োজন করা হয় ওয়ার্ল্ড রোবট কনফারেন্স ২০১৫। বেইজিং মিউনিসিপ্যাল গভর্নমেন্ট এবং শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সাথে যৌথভাবে এই সম্মেলনের করে চীনে রোবটিক ইন্ডাস্ট্রি বিষয়ক প্রথম সংগঠন চায়না অ্যাসোসিয়েশন ফর সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি। রোবট নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে উদ্ভাবনী গবেষণা চলছে, সেগুলোর চিত্র তুলে ধরতে এবং রোবট নিয়ে গবেষণাকে আরও ত্বরান্বিত করতেই অনুষ্ঠিত হয় এই সম্মেলন। শিল্প রোবটের জন্য চারটি স্ট্যান্ডার্ডও প্রকাশ করা হয় এই সম্মেলনে। স্ট্যাকিং রোবট, হুইলড রোবট ও ইলেকট্রনিক বেল্ট স্কেল—এই তিন ধরনের শিল্প রোবটের জন্য তৈরি করা হয়েছে এই স্ট্যান্ডার্ড। শিল্প রোবট তৈরিতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশ চীনের রোবট গবেষণা ইনস্টিটিউট ও শিল্প রোবট নির্মাতা ২০ প্রতিষ্ঠান এই স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলার সম্মতিও জ্ঞাপন করে। রোবটের ক্ষেত্রে এই ধরনের স্ট্যান্ডার্ড তৈরির ঘটনা এই প্রথম।
 
শিল্প রোবটের সাথে সাথে দৈনন্দিন কাজের জন্য প্রয়োজনীয় গৃহস্থালী রোবটের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। চীনের বাজারও এর ব্যতিক্রম নয়। ওয়ার্ল্ড রোবট কনফারেন্সে অংশ নেওয়া চীনের শেনঝেন ওকাভ কোম্পানি জানিয়েছে, তারা গত বছরেই পাঁচশ ওয়েট্রেস রোবট বিক্রি করেছে চীনে। এর বাইরে বেলজিয়াম, সিঙ্গাপুর ও কানাডার বাজারেও তাদের এই ওয়েট্রেস রোবটের চাহিদা বাড়ছে বলে জানায় তারা। চীনের আরেক রোবট নির্মাতা হাইয়িং রোবট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি হাজির হয়েছিল তাদের শেফ রোবট নিয়ে। ক্যাফেটেরিয়া ও রেস্টুরেন্টের জন্য তারা এক হাজারেরও বেশি শেফ রোবট তৈরি করছে বলে জানায়। এদিকে ইকোভ্যাকস রোবটিকস নামের আরেকটি কোম্পানি সম্মেলনে হাজির করে ক্লিনার রোবট। প্রায় ৪০টি দেশে তাদের এই ক্লিনার রোবটের বাজার রয়েছে বলে জানায় তারা। এর বাইরেও রিসিপশনিস্ট ও তথ্য প্রদানকারী বেশকিছু রোবট মুগ্ধ করেছে রোবট সম্মেলনে আগত দর্শনার্থীদের।
 
ঘরে ব্যবহারের উপযোগী বেশকিছু রোবটও হাজির ছিল সম্মেলনে। ‘সার্ভিস রোবট’ নামের এসব রোবটের মধ্যে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে আলফা ২। ইউবিটেক রোবটিকসের তৈরি দেড় ফুট উচ্চতার মানুষের আকৃতির এই রোবট যোগ ব্যায়ামের বিভিন্ন আসন দেখাতে পারে, এর মালিককে বিনোদিত করতে নাচতেও পারে। এতে নানা ধরনের অ্যাপস ইনস্টলের সুবিধাও রয়েছে।
 
এতে করে একে গল্প বলা, বই পড়ে দেওয়া, টিকেট বুক করা, লাইটের সুইচ অফ করা, প্রিন্টার চালু করার মতো সব কাজেও ব্যবহার করা যাবে। এর বাইরে রবি মিনি নামের একটি রোবট প্রদর্শিত হয় সম্মেলনে, যেটি বয়স্কদের নিত্যদিনের কাজে সহায়তা করে। আবার আইনিমো নামের আরেক রোবট তৈরি করা হয়েছে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গ দিতে।
 
সম্মেলনে আরও একটি রোবটকে খুব ব্যস্ত সময় কাটাতে হয়েছে। টেবিল টেনিস খেলতে পটু এই রোবটের সাথে এক গেম টেবিল টেনিস খেলেনি, এমন দর্শনার্থী খুব কমই ছিল এতে। বর্তমান রোবটের বাজারের ৮০ শতাংশই শিল্প রোবটের দখলে থাকলেও এসব গৃহস্থালী রোবট খুব অল্পদিনের মধ্যেই রোবটের বাজারে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে নিবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এসব রোবটের নির্মাতারা।
 

জাপানের নাগোয়া ইউনিভার্সিটির রোবটিক এক্সপার্ট তোশিও ফুকুদার কাছে আসছে দিনে ঘরে ঘরে রোবটের উপস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি সহাস্যে বলেন, ‘এখনই হয়তো তেমন হবে না। তবে ৩০-৪০ বছরে সেটি খুবই সম্ভব।’ রোবট নির্মাতাদের জন্য আশার খবরই তা।