বাঙালি জাতির গৌরবের মাস ডিসেম্বর। লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই মানচিত্রে আমাদের প্রণম্য মুক্তিযোদ্ধা তারকাদের সংখ্যাও কম নয়। প্রতিবছর বিজয়ের মাসে আমরা মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন আঙ্গিক নিয়ে শিল্পী-কুশলীদের লেখা বা স্মৃতিগদ্য ছেপে থাকি। এ বছরে পুরো মাসজুড়ে তারকাদের বয়ানে থাকবে তাদের দেখা যুদ্ধকালীন খণ্ডচিত্র। এ নিয়েই পুরো ডিসেম্বরের আয়োজন ‘সেই সময়’। আজ লিখেছেন প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব সারা যাকের
তখন ঢাকায় বন্দি অবস্থায় ছিলাম আমরা। আমার তখন তেমন একটা বয়স হয়নি, চৌদ্দ কি পনের হবে। স্পষ্ট মনে পড়ে যে, কিছুদিন পরপরই ভীষণ গোলা-গুলির শব্দ শুনতে পেতাম। স্বাভাবিকভাবেই গোলা-গুলির শব্দে আতঙ্কের রাত কাটতো। তখন আমরা জয়েন্ট ফ্যামিলিতে থাকতাম। আমার আব্বা ঢাকা না ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আমরা পুরো যুদ্ধের সময়টাতে ঢাকাতেই ছিলাম। হাশেম ভাই আমাদের পরিবারের খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। আমাদের পারিবারিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তিনি দেখাশোনা করতেন। হাশেম ভাই সব সময় তার সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা রাখতেন। ওই লাল সবুজ পতাকাটি বুকে সাহস দিতো। একদিন মিলিটারিরা এলেন বাসায় চেক করতে, পুরো ঘর তছনছ করে তারা। ওইদিন পতাকাটি হাশেম ভাইয়ের স্যুটকেসের মধ্যে ছিল, কিন্তু মিলিটারিরা খুঁজে পায়নি। আমাদের সবারই বুক ধুকধুক করে কাঁপছিল। কেননা, মিলিটারির শুধু শুধু কারণ খুঁজে বের করে, কারণে-অকারণে মানুষ ধরে নিয়ে যায় এবং মেরে ফেলে। ওই দিনটা খুব ভয়ানক ছিল আমাদের জন্য।
খুব ভয়াবহ ছিল সেই দিনগুলো। প্রতিটা দিনই নানা হত্যা ও নির্যাতনের খবর পেতাম। আর নারী নির্যাতনের কথাগুলো প্রতিদিনই তখন শুনতে পেতাম। যখনই গুলি বা বোমার আওয়াজ শুনতাম দৌড়ে ঘরে গিয়ে লুকিয়ে পড়তাম। খুবই ভীতু টাইপের ছিলাম এমনিতেই।
তখন আমরা পুরোপুরি গৃহবন্দি। বাসায় খাবারও সে রকম থাকতো না। বাজার তো বসতো না। আমাদের বাসার দু’দিকেই সিঁড়ি ছিল। যুদ্ধের শেষের দিকে বেশি বেশি বোমা পড়া শুরু হলো। যখনই বোমা পড়েছে তখনই আমাদের বাড়ির পাশের দেওয়ালের ওপরে গিয়ে বসতাম। মনে হতো এইটাই বোধহয় সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। বয়সে খুব ছোট থাকাতে, যুদ্ধটা সেভাবে উপলব্ধি করতে পারিনি, তবে ভীষণ ভয় পেতাম। গুলি আর বোমার শব্দের কারণে ঘুমাতেও পারতাম না। সেই দুঃসহ স্মৃতি আজও বারবার মনে পড়ে। বারবার!
