ওষুধ অধ্যাদেশে ১৯৮২ সালে অনেক ওষুধ আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়। এই নিয়মের সূত্র ধরে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে জেল-জরিমানা করে থাকে। নিষিদ্ধ ওষুধ চিকিত্সকরা বছরের পর বছর ব্যবস্থাপত্রেও লিখে আসছেন। ক্যান্সার, কিডনি এবং লিভারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিত্সার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা এসব ওষুধ দিয়ে থাকেন।
এসব নিষিদ্ধ কিছু ওষুধ বাংলাদেশেও তৈরি হয়। কেন চিকিত্সকরা ব্যবস্থাপত্রে এসব ওষুধের নাম লেখেন- জানতে চাইলে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ এবং অধ্যাপক ডা. এনএন হুদাসহ আরো অনেক চিকিত্সকই বলেছেন, কোনটি নিষিদ্ধ কোনটি নিষিদ্ধ নয় এসব দেখার সুযোগ চিকিত্সকদের নেই। কোনটিতে রোগীর জীবন বাঁচানো যাবে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মেজবা উদ্দীন আহাম্মেদ বাজার থেকে বিভিন্ন নামি কোম্পানির ওষুধ সংগ্রহ করেন। এসব ওষুধ ল্যাবে পরীক্ষা করে তিনি দেখতে পান অধিকাংশ ওষুধই নিম্নমানের। স্ট্রিপে ৫০০ এমজি লেখা অনেক ওষুধ আসলে ১৫০ থেকে ২৫০ এমজি’র।
সাধারণত চিকিত্সকরা জীবন বাঁচাতে যে ওষুধ লেখা দরকার সেটাই লিখে দেন। আইন তারা দেখেন না। আগে জীবন বাঁচানোর তাগাদা, পরে আইন মানা কিংবা না মানার বিষয় আসবে। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো নামীদামী কোম্পানির মালিকেরা বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের ফ্ল্যাট, গাড়ি, বিদেশে ভ্রমণের টিকেট, চেম্বার ভাড়া এবং চেম্বার সাজিয়ে দেয়াসহ নানা প্রলোভনে ওষুধ ব্যবস্থাপত্রে লেখান। এভাবেই ওষুধ বাজারজাত করা হয়।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকা এবং প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের ওষুধের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। অনেক ওষুধ কোম্পানির নামও কেউ জানে না। এসব নিম্নমানের ওষুধ খেয়ে গ্রামের অসুস্থ মানুষ আরো অসুস্থ হয়ে ঢাকায় আসেন চিকিত্সার জন্য।
অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের মতে জীবন রক্ষাকারী কিছু ওষুধ আইনত নিষিদ্ধ হলেও আইন শিথিল করা দরকার। নিষিদ্ধ ওষুধের চাহিদা থাকায় হাসপাতাল কিংবা ওষুধ বিক্রেতারা এসব ওষুধ সংরক্ষণ করে বিপাকে পড়ে যান। এই বিষয়ে সৃষ্টি হওয়া জটিলতা কমাতে সরকারের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন ঐ চিকিত্সকরা।
ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, আমাদের দেশে গুণগত মানসম্পন্ন ওষুধ তৈরি হয়। ১০৪টি দেশে বাংলাদেশ ওষুধ রপ্তানি করে। রোগীর জীবন বাঁচাতে কোনো নিষিদ্ধ ওষুধ দরকার হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আবেদন করলে আমরা আমদানির অনুমতি দিয়ে থাকি। তিনি বলেন, বর্তমানে ওষুধের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণে ওষুধ প্রশাসন কঠোর অবস্থানে। গত একমাসে বাজারজাতকৃত ওষুধের মধ্যে ২৪টি কোম্পানির ওষুধ নিম্নমানের ধরা পড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে বলে মহাপরিচালক জানান।
পাঁচজন বিশিষ্ট চিকিত্সক জানান, আমাদের দেশ থেকে অনেক ওষুধ বিদেশে রপ্তানি হয়। তবে সেসব ওষুধের গুণগত মান আর দেশে বাজারজাত করা ওষুধের গুণগত মানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। নিম্নমানের কাঁচামাল দিয়ে দেশের জন্য বেশিরভাগ কোম্পানি ওষুধ তৈরি করে। এসব বাজারজাতকরণের জন্য চিকিত্সকদের আবার কমিশনও দেয়া হয়। জীবন রক্ষার্থে ওষুধ অধ্যাদেশ যুগোপযোগী এবং রোগীর চাহিদানুযায়ী সংস্কার করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য বিষয়ক সংসদীয় কমিটির ওষুধ কোম্পানির বিশেষজ্ঞ পরিদর্শক দলের প্রধান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আবম ফারুক বলেন, ওষুধ অধ্যাদেশ সংশোধন করা প্রয়োজন। জীবন রক্ষা এবং রোগীর কল্যাণের জন্য অধ্যাদেশ সংশোধন করতে হবে।
