অনেক দিন হলো, সেই প্রথম বিজয়ের দিনে চারদিকে ছিল আনন্দ, তখন মাত্র আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। ২০১৫ তে আমরা বিজয়ের ৪৫ বছর উদযাপন করছি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ তো শুধু সাড়ে নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধ ছিল না। ছিল ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত সংগ্রাম— অনেক ত্যাগ এবং শেষ পর্যন্ত অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা। সেই সময় আমরা অনেক মানুষকে হারিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধে হারিয়েছি ৩০ লাখ মানুষ এবং ৬ লাখ মা-বোন ধর্ষিতা হয়েছেন, নির্যাতিত হয়েছেন।
আমার অতি প্রিয় বড় ভাই ডা. সোলেমান খানকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমার সামনেই গুলি করে হত্যা করা হয়। আমি, আমার মা এবং এক ভাগ্নী (সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী) গুরুতর আহত হই। আমাদের পরিবারের ওপরে অনেক নির্যাতন চলে। কারণ বড় ভাই ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির একজন সক্রিয় সদস্য। আর আমি সেই ষাটের দশকে সবকটি আন্দোলনে বিশেষ করে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছি। এটা তত্কালীন সামরিক সরকার ভালো করে জানতেন।
৭ই মার্চ রমনার মাঠে বঙ্গবন্ধু লাখ লাখ মানুষের সামনে তথা পূর্ব পাকিস্তানে সাড়ে ৭ কোটি মানুষকে যে আহ্বান জানালেন, ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, ‘তোমাদের কাছে আমাদের অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে ... তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। রক্ত যখন দিয়েছি, আরো রক্ত দেবো। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। ... এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম...।’
আমরা চারুশিল্পীরা ৭ই মার্চের পরই নতুন উদ্যোগে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। পাক-সামরিক সরকারের রক্তচক্ষু, বিধি-নিষেধ, কারফিউ— কিছুই তোয়াক্কা করলাম না। প্রায় ৫ দিন ছবি-পোস্টার এঁকে দেশের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য এবং স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার জন্য বঙ্গবন্ধুর সেই ঘোষণাকে বক্ষে ধারণ করে এগিয়ে যেতে এক বিশাল চলমান প্রদর্শনীর আয়োজন করলাম। শহীদ মিনার থেকে এই চলমান প্রদর্শনী-মিছিলে প্রায় ১শ চারুশিল্পীরা নীরবে হেঁটে বাহাদুর শাহ পার্ক পর্যন্ত গিয়েছিলাম। প্রত্যেকের হাতেই ছিল শিল্পীদের আঁকা ছবি এবং প্ল্যাকার্ডে লেখা শ্লোগানে মুক্তিযুদ্ধের আহ্বান। মিছিলের পূর্বভাগে ছিল ৪ জন মেয়ে। তাদের গলায় ঝোলানো ছিল বিরাট আকারের ৪টি বাংলা বর্ণমালা ‘স্বা-ধী-ন-তা’।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ছিলেন সবার আগে। আমরা শিল্পীরা মুখে কোনো শ্লোগান দিইনি। সবই ছিল আমাদের আঁকা ছবিতে। রাস্তার পাশে থেকে মানুষজন যোগ দিয়ে মিছিলটি বিশাল লম্বা করে ফেলেছিল। বন্দুকের গুলি এবং মৃত্যু অবধারিত জেনেও শিল্পীরা এ দুঃসাহসিক ঘটনা ঘটাতে পেরেছিলেন। সেই মিছিলটির কথা ৪৫ বছর পর এজন্য মনে করলাম, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। আমরা স্বাধীনতার শত্রুদের নানানভাবে আশকারা দিয়ে এসেছি।
আমরা এ বিষয়ে কেন সচেতন ছিলাম না সেটি আজকের দিনে আমার প্রশ্ন। কারণ আলবদর-রাজাকাররা এবং বাংলাদেশের শত্রুরা নানানভাবে ছদ্মবেশে আমাদের সঙ্গে চলাফেরা করেছে। তারা বাংলাদেশকে স্বীকার করে না জেনেও আমরা কিন্তু সেইভাবে প্রতিবাদ করিনি। এ কারণে আমরা নিজেদের বিপদগ্রস্ত করে ফেলেছি। আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের অবিমৃষ্যকারিতা এবং নিলিপ্তকারিতা কিংবা মূখ্যতা আজ তাদের এতো শক্তিশালী করে তুলেছে। তারা আজ বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মানুষদের অপমান থেকে শুরু করে হত্যা করে চলছে।
আমাদের প্রথম আঘাত আসে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা, আমাদের ৪ নেতাকে জেলখানায় হত্যা এবং বিভিন্ন কৌশলে বিভিন্ন জায়গায় যে হত্যা করেছিল যেসব সামরিক স্বৈরাচারী সরকার— তাদের বিরুদ্ধে যথাসময়ে যতখানি বিদ্রোহী হওয়া উচিত ছিল কিংবা রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দেখানো উচিত ছিল তা অনেক রাজনীতিবিদ ও শাসকগোষ্ঠী ব্যর্থ হয়েছে। অনেক তিতিক্ষার পর ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ক্ষমতায় আসার পর ধীরে ধীরে দেশের মানুষ স্বাধীনতার ফল পেতে শুরু করে। দেশের প্রবৃদ্ধি-সমৃদ্ধি বাড়তে থাকে, সেই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার সম্পন্ন হয়, আলবদর-রাজাকারদের তথা যুদ্ধাপরাধীদের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচার হতে থাকে। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানো হচ্ছে। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীরা অনেক বাধা দিলেও অনেক কৌশল অবলম্বন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করার চেষ্টা করা হলেও বর্তমান মুক্তিযুদ্ধের সরকার সব বাধাকে পাশ কাটিয়ে সাহসের সঙ্গে স্থির লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে।
অনেক দেরিতে হলেও আমরা এখন অনেক আশাবাদী। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল। কারণ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে শক্ত ভিত তৈরি করছে। বিদেশিদের ধমক তোয়াক্কা না করে তাদেরকেই আমরা পাল্টা ভর্ত্সনা করার সাহস ও শক্তি পাচ্ছি। শিক্ষা-সংস্কৃতিতেও একটা জোয়ার এসেছে। খাদ্য সঙ্কট কেটে যাচ্ছে। মঙ্গা-দুর্ভিক্ষ দূর হয়েছে। বাংলাদেশ এখন অনেক ক্ষেত্রেই রপ্তানিমুখি দেশ এবং অর্থনৈতিক মুক্তি দিকে প্রবলভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।