রংপুরে জাপানি নাগরিক কুনিয়ো হোশি হত্যাসহ ৬টি ঘটনার মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা ছিলো নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন জেএমবি'র। সোমবার রাতে পুলিশের হাতে গ্রেফতারকৃত জেএমবি নেতা ইসাহাক আলী রংপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতের বিচারক শফিউল আলমের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এ কথা জানান।
পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আব্দুল মালেক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে আজ মঙ্গলবার দুপুরে পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি হুমায়ুন কবীর তার কার্যালয়ে প্রেসব্রিফিংয়ে জেএমবি নেতা ইসাহাক আলীর দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির তথ্য তুলে ধরে বলেন, জেএমবি'র আঞ্চলিক কমান্ডার মাসুদ রানার ঘনিষ্ট বন্ধু জেএমবি নেতা ইসাহাক এক সময়ে ইরাকে ছিলেন। সেখানে তিনি কোন ধরণের প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকতে পারেন। মূলত, ইসাহাক ছিলেন অস্ত্রের জিম্মাদার। যে কোন অপারেশন শেষ করে ইসাহাকের কাছেই অস্ত্র জমা রাখা হতো। তিনি বলেন, ইসাহাকের বড় ভাই ইনসান জেএমবি'র একজন শীর্ষ স্থানীয় নেতা ছিলেন। ২০০৬ সালে মাসুদ রানা প্রথম ইনসানের কাছেই দীক্ষা নিয়েছিলেন। ইনসান পরবর্তীতে লিবিয়ায় গিয়ে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। তবে কিভাবে ইনসান মারা গেছেন তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ইসাহাকের ইরাকে যাওয়া ও বড় ভাই ইনসানের লিবিয়া যাওয়ার বিষয়ে আইএস বা পাকিস্তানের সঙ্গে জেএমবি'র সংশ্লিষ্টতা আছে কি না সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের উত্তরে ডিআইজি বলেন, যারা এ পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছে তারা সকলেই স্থানীয় এবং স্থানীয়ভাবেই এসব কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে এদের কোন সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাওয়া যায়নি।
জেএমবি নেতা ইসাহাক জাপানি নাগরিক কুনিয়ো হোশি এবং মাজারের খাদেম রহমত আলী হত্যার ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে জানিয়ে ডিআইজি আরো বলেন, রংপুরে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি হত্যাকাণ্ডসহ সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া রংপুর ও দিনাজপুরের সকল কর্মকাণ্ডে জেএমবি জড়িত ছিল। এখন পর্যন্ত জেএমবি ঝুঁকিতে রয়েছে রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল। বিদেশিদের হত্যা করে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ব্যহত করা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতেই রংপুর অঞ্চলে জেএমবি সক্রিয় হয়ে উঠছে। তবে তারা এটাতে সফল হতে পারবে না। ইতোমধ্যেই রংপুরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জেএমবি'র ১৮ জন সদস্যকে গ্রেফতার করার পাশাপশি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ। জেএমবি'র রংপুর অঞ্চলের কমান্ডার মাসুদ রানা ও তার অন্যতম সহযোগী ইসাহাক আলীর আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে গুরুতপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
জাপানি নাগরিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিএনপি নেতাসহ অন্যদের গ্রেফতারের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি বলেন, এ পর্যন্ত যারা ধরা পড়েছেন এবং যেসব তথ্য-উপাত্ত আমাদের কাছে রয়েছে, তাতে এটা প্রতিয়মান যে, এসব কর্মকাণ্ডে জেএমবি সক্রিয়ভাবে জড়িত। তবে গ্রেফতারকৃতরা এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত কী না তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বলা যাবে না। জেএমবি'র এসব কর্মকাণ্ডে কারা মদদ দিচ্ছেন তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
অপরদিকে জাপানি নাগরিক কুনিয়ো হোশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের ছোট ভাই গ্রেফতারকৃত বিএনপি নেতা রাশেদ-উন-নবী বিপ্লব, কুনিয়োর ব্যবসায়ীক পার্টনার হুমায়ুন কবীর হীরা, চাপাইনবাবগঞ্জে র্যাবের হাতে গ্রেফতারকৃত রংপুর মহানগরীর শাহীপাড়ার রাজিব হাসান ওরফে মেরিল সুমন, জুম্মাপাড়ার নওশাদ হোসেন ওরফে ব্ল্যাক রুবেল ও শালবন মিস্ত্রিপাড়ার কাজল চন্দ্র বর্মণ ওরফে ভরসা কাজলকে আজ মঙ্গলবার দুপুরে রংপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতের বিচারক শফিউল আলমের আদালতে হাজির করে জামিনের আবেদন করা হলে আদালত তাদের জামিন নামঞ্জুর করে পুনরায় কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ প্রদান করেছেন। এ ছাড়া শুনানীর পরবর্তী তারিখ ৩০ ডিসেম্বর নির্ধারণ করে দিয়েছেন আদালত।
প্রসঙ্গত, গত ৩ অক্টোবর সকালে কাউনিয়া উপজেলার নাছনিয়া বিল আলুটারী এলাকায় জাপানি নাগরিক কুনিয়ো হোশিকে তার কোয়েল ঘাসের খামার বাড়ি পাশে ৩ জনের মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা গুলি হত্যা করে। এ ব্যাপারে কাউনিয়া থানার তৎকালীন ওসি রেজাউল করিম বাদি হয়ে অজ্ঞাত ৩ জনের নামে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এর প্রায় এক মাস পর ১০ নভেম্বর মধ্যরাতে একই উপজেলার মধুপুর ইউনিয়নের চৈতারমোড়ে টেপামুধুপুর পীরের দরগার খাদেম রহমত আলীকে (৬৬) কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নিহত রহমত আলীর পুত্র শফিকুল ইসলাম বাদি হয়ে কাউনিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
