প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকারকে উত্খাত করতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। এ জন্য ঢাকার যাত্রাবাড়ী ও মিরপুরে দুটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলা হয়েছিল। আর ভারতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য পশ্চিমবঙ্গে খোলা হয়েছিল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। কিন্তু এসব জঙ্গি গ্রেফতার হওয়ার কারণে তাদের উদ্দেশ্য সফল হতে পারেনি। ভারতের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনআইএ) খাগড়াগড়ে বিস্ফোরণের মামলায় আদালতে দাখিল করা সম্পূরক চার্জশিটে এসব বিষয় উল্লেখ করেছে। গত সোমবার কলকাতার ব?্যাঙ্কশাল আদালতে নূরুল হক মণ্ডল ওরফে নইমসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে এই চার্জশিট পেশ করা হয়। এদের মধে?্য এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে ১৮ জনকে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (গোয়েন্দা) মনিরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘যাত্রাবাড়ী ও মিরপুরে জেএমবির প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে এমন তথ্য এনআইএ আমাদের দিয়েছিল। কিন্তু সেখানে অভিযান চালিয়ে আমরা কিছুই পাইনি। তবে আগে সেখানে জঙ্গিদের অবস্থান থাকলেও থাকতে পারে। ইতোমধ্যে আমরা শতাধিক জঙ্গি সদস্যকে গ্রেফতার করেছি। এখন আর বাংলাদেশে জঙ্গিদের আগের মতো কোনো শক্ত অবস্থান নেই।’
এনআইএ’র চার্জশিটে বলা হয়েছে, যাত্রাবাড়ীতে জেএমবির শীর্ষ নেতা সাইদুর রহমানের ছেলে তালহা বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। সেই প্রশিক্ষণ নিয়েই পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের খাগড়াগড়ে এসেছিল এই ঘটনার অন?্যতম অভিযুক্ত জঙ্গি নূরুল হক মণ্ডল ওরফে নইম। প্রায় দেড় মাস তাকে যাত্রাবাড়ী এবং মিরপুরে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল।
এনআইএ সূত্রে খবর, ঢাকা থেকে ফিরে নূরুল হক মণ্ডল ওরফে নইম খাগড়াগড়ে বোমা তৈরির পাশাপাশি অন?্যদেরও প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল। উদ্দেশ?্য ছিল বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতেও বড় ধরনের নাশকতা ঘটানোর। ৪৫০ পৃষ্ঠার সম্পূরক চার্জশিটে বলা হয়েছে, খাগড়াগড় বিস্ফোরণ কাণ্ডে জড়িতদের সঙ্গে বাংলাদেশের জঙ্গি গোষ্ঠী জেএমবিসহ আল কায়দা, লস্কর ই তৈয়বার মতো বিভিন্ন জেহাদি সংগঠনের যোগের যথেষ্ট তথ?্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। ধৃতদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে আল কায়দা নেতা ওসামা বিন লাদেন, মোল্লা ওমর ও জেএমবি নেতা বাংলা ভাইয়ের জেহাদি ভাষণের ভিডিও। এ সংক্রান্ত ৬৬ হাজার ৮০০ পৃষ্ঠার তথ?্য পেশ করা হয়েছে আদালতে।
চার্জশিটে এনআইএ জানিয়েছে, বিস্ফোরক তৈরির পাশাপাশি বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন জেএমবিতে লোক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজ হতো খাগড়াগড়ে। জঙ্গি প্রশিক্ষণ হতো শিমুলিয়া ও মোকিমনগর মাদ্রাসায়। পাশাপাশি জেএমবির সংগ্রহ করা অর্থ গরিব মাদ্রাসা ছাত্রদের দিয়ে তাদের নিজেদের দলে টানার প্রয়াস চলছিল। নূরুল হক মণ্ডল ওরফে নইম বেশ কয়েকবার বাংলাদেশে গেছে। আরেক অভিযুক্ত জেএমবি নেতা বাংলাদেশের নাগরিক সুমন ওরফে সাদিকের বিরুদ্ধেও চার্জশিট দেয়া হয়েছে। সুমন বোমা তৈরির পাশাপাশি অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দিত পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে, ঝাড়খণ্ডের সাহেবগঞ্জে। তার নিজেরও এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ রয়েছে।
এনআইএ এই বিস্ফোরণ মামলায় প্রথম চার্জশিট দিয়েছিল গত ৩০ মার্চ। তাতে ২১ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মধ্যে চারজন বাংলাদেশি ছিলেন। এরপর প্রথম সম্পূরক চার্জশিট দেয়া হয় গত ২৩ জুলাই। সেখানে আরো ছয় আসামির নাম যুক্ত করা হয়। এদের মধ্যে একজন বাংলাদেশি নাগরিকও ছিলেন।
এই মামলার তদন্ত দায়িত্বে থাকা এনআইএ কর্মকর্তাদের দাবি, পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও আসাম ও ঝাড়খণ্ডে প্রাথমিকভাবে নিজেদের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে জেএমবি। ভারতে তাদের কাজ হলো সদস্য সংগ্রহ ও তরুণ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেয়া। তারা কিছু নির্দিষ্ট মাদ্রাসা ও গোপন আস্তানায় এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল।
তবে অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, এই প্রক্রিয়া ভেস্তে যাওয়ায় বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবঞ্জ ও রাজশাহী জেলায় অনেক বেশি যাতায়াত বেড়েছে জঙ্গি সদস্যদের। তবে গোয়েন্দারা সেদিকে নজর রাখছেন।
র্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘জঙ্গিদের ব্যাপারে আমাদের সার্বক্ষণিক নজরদারি রয়েছে। নিয়মিতই র্যাব জঙ্গি সদস্যদের গ্রেফতার করছে। আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’
উল্লেখ?্য, গত বছরের ২ অক্টোবর বর্ধমানের খাগড়াগড়ে বোমা, গ্রেনেড তৈরির সময় বিস্ফোরণে মৃত্যু হয় ২ জনের। তদন্তে নেমে মেলে একের পর এক চাঞ্চল?্যকর তথ?্য। জানা যায়, বাংলাদেশে নাশকতা ঘটাতে জেএমবি জঙ্গিরা সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে গড়ে তুলেছিল বোমা তৈরির আঁতুড়ঘর। সেখানে তৈরি হচ্ছিল গ্রেনেড, শক্তিশালী বোমা। প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছিল জেহাদি জঙ্গি। মানব বোমা হিসেবে জঙ্গিদের প্রস্তুত করার প্রশিক্ষণও দেয়া হচ্ছিল সেখানে।