আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বড় ক্যানভাসে একটি বায়োপিক চলচ্চিত্র নির্মাণ এখন সময়ের দাবী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই তাদের বিশ্বনেতাদের নিয়ে জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে একাধিক নির্মাতার নির্মাণে। বিচ্ছিন্নভাবে আমাদের দেশেও বেশ ক’বার বঙ্গবন্ধু’কে নিয়ে সেলুলয়েডে এদেশের সবচেয়ে বড় বাজেটে, বড় ক্যানভাসে চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা হলেও তা কার্যকর হয়নি।
তবে সময়ের দাবীতেই অধিকাংশ গুণী নির্মাতা, এমনকি দেশ বরেণ্য একাধিক শিল্পীরা ইত্তেফাক বিনোদন প্রতিদিন’কে তাদের দাবী জানাতে চাইলেন এদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সংস্কৃতিবান্ধব সরকারের কাছে। বিনোদন প্রতিদিনের বিজয় দিবসের বিশেষ ফিচার উপলক্ষে সেই প্রস্তাবনাস্বরূপ আমাদের সংস্কৃতিকর্মীদের সেই দাবীর কথাটিই আমরা আজ উপস্থাপন করলাম... গ্রন্থনা করেছেন তানভীর তারেক
‘বঙ্গবন্ধুর মতো একজন মহান নেতাকে নিয়ে চলচ্চিত্র হওয়াটা উচিত। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত তাকে নিয়ে আমাদের দেশে চলচ্চিত্র তো দূরের কথা, একটি ভালোমানের ডকুমেন্টারিও হয়নি। এটা আসলেই খুবই দুঃখজনক একটি ব্যাপার। বেশ কিছুদিন আগে তথ্যমন্ত্রণালয় থেকে একটি মিটিং ডাকা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রসঙ্গে। তখন এই বিষয়টি নিয়ে একটি প্রস্তাব উঠেছিল। মিটিংটিতে এই ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণে কত খরচ হতে পারে সে বিষয়ে আমরা কথা বলেছি। যেহেতু এটি একটি বড় প্রেক্ষাপট তাই খরচটাও বেশি। আমরা একশ’ কোটি টাকার একটি বাজেটের কথা বলেছিলাম। মহাত্মা গান্ধীকে নিয়ে যে চলচ্চিত্রটি হয়েছে সেটির বাজেট ছিল বাংলাদেশি টাকায় প্রায় আটশ’ কোটি টাকা।’
স্বাধীনতার প্রায় ৪৫ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জীবনের গল্প এখনও সেলুলয়েড পর্দায় দেখতে পারেনি দর্শক। এই আক্ষেপটি একজন বাঙালি হিসেবে আজও থেকে যায়। কারণ বিশ্বের অনেক নেতার গল্পই আমরা জেনেছি চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে। আব্রাহাম লিংকন, চে গুয়েভারা বা মহাত্মা গান্ধীর জীবনের গল্প আমাদের অনেকের চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে জানা। সেই জায়গা থেকে আমরা জাতির পিতাকে শুধুমাত্র কয়েকটি তথ্যচিত্রের মাঝেই ফ্রেমবন্দি করে রেখেছি। আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে রাজনীতি থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন দিক নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন নির্মাতারা। এরমধ্যে অনেকেই আশা দেখিয়ে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর জীবনী আমরা দেখতে পারবো বড়পর্দায়। কিন্তু সেই আশায় আর খই ফোটেনি। বিষয়টি শিরোনামে আজ নতুন নয়। তাই চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্নটা চলেই আসে। বর্তমান সময়েও অনেকে বলছেন জাতির পিতাকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে। এ বিষয়ে পরিচালক আবু সাইয়ীদ বলেন, ‘আসলে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এই বিষয়টি নিয়ে অতীতে অনেকই চিন্তা-ভাবনা করেছিলেন, কিন্তু তাদের চিন্তা-ভাবনার বাস্তব কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। আর এর প্রধান কারণ হচ্ছে, এটি একটি বড় পরিসর। আর এর জন্য অনেক বড় আয়োজনের প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে অনেক সাপোর্টের প্রয়োজন, যা আমাদের নেই। আর ছোট পরিসরে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কোনো চলচ্চিত্র নির্মিত হলে সেটি অনেক বিতর্কের জন্ম দেবে, তাই এখন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কোনো চলচ্চিত্র আমরা নির্মাণ করতে পারিনি। এছাড়া এই বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর পরিবারেরও অনুমতির প্রয়োজন বা পরিবারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক উদ্যোগ আমরা প্রত্যাশা করছি।’
বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রের উল্লেখযোগ্য পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান। এ পর্যন্ত অনেক চলচ্চিত্রের সফল নির্মাতা তিনি। তবে তার চলচ্চিত্রেও কখনও উঠে আসেনি আমাদের জাতির পিতার কোনো তথ্য। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল, সেই সাথে একেক সময় একেক রাষ্ট্রনায়ক দেশ পরিচালনা করেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সবকিছুরই উর্ধ্বে। তাই ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি সার্বজনীন উদ্যোগেই বঙ্গবন্ধুর বায়োপিক চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে একাধিক নির্মাতাকে নিয়ে একটি প্যানেল তৈরি করা যেতে পারে। বিশ্বে এখন পর্যন্ত যে সকল মহান নেতাকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে সেগুলো সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় হয়েছে। আমার মনে হয় আমাদেরও সময় এসেছে আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ নিয়ে বা তাকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করার।’
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে পরিচালক মোরশেদুল ইসলামের নাম চলেই আসে। সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে তার পরিচালিত নতুন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের বাঁধা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবের কথা উঠে আসে তার কথাতেও। মোরশেদুল ইসলাম বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর মতো একজন মহান নেতাকে নিয়ে চলচ্চিত্র হওয়াটা উচিত। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত তাকে নিয়ে আমাদের দেশে চলচ্চিত্র তো দূরের কথা, একটি ভালোমানের ডকুমেন্টারিও হয়নি। এটা আসলেই খুবই দুঃখজনক একটি ব্যাপার। বেশ কিছুদিন আগে তথ্যমন্ত্রণালয় থেকে একটি মিটিং ডাকা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রসঙ্গে। তখন এই বিষয়টি নিয়ে একটি প্রস্তাব উঠেছিল। মিটিংটিতে এই ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণে কত খরচ হতে পারে সে বিষয়ে আমরা কথা বলেছি। যেহেতু এটি একটি বড় প্রেক্ষাপট তাই খরচটাও বেশি। আমরা একশ’ কোটি টাকার একটি বাজেটের কথা বলেছিলাম। মহাত্মা গান্ধীকে নিয়ে যে চলচ্চিত্রটি হয়েছে সেটির বাজেট ছিল বাংলাদেশি টাকায় প্রায় আটশ’ কোটি টাকা। আমরা হয়তো ভারতীয়দের মতো নির্মাণ করতে পারবো না, কারণ আমাদের অনেক টেকনিক্যাল সাপোর্ট নেই। তবুও এতো গুরুত্বপূর্ণ ও ফিচারভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যয় একটু বেশি হবে। যদি আমরা আমাদের প্রস্তাব ভিত্তিক আর্থিক সহায়তা পাই তবে হয়তো আমরা আমাদের মহান নেতার জীবন আদর্শ নিয়ে একটি আন্তর্জাতিকমানের চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারবো।’