‘উপযুক্ত সংরক্ষণের অভাবে অনেক গান কালের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে’ : জিনাত রেহানা

আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৫, ০২:১৫

‘সাগরের তীর থেকে মিষ্টি কিছু হাওয়া এনে, তোমার কপালে ছোঁয়াবো গো...’ হারানো দিনের শ্রুতিমধুর এই গানটি একসময় আমাদের দেশের একমাত্র টিভি চ্যানেল বিটিভিতে প্রায়ই শোনা যেত। এমন অনবদ্য গানের কিংবদন্তী শিল্পী জিনাত রেহানা। তাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। সত্তর দশকে মা গীতিকার জেবা-উন-নেসার লেখা গানটি তিনিই প্রথম গেয়েছিলেন রেডিও বাংলাদেশ ঢাকা থেকে। খালা আঞ্জুমান আরাও ছিলেন ষাটের দশকের শীর্ষস্থানীয় শিল্পীদের একজন। গুণী এই শিল্পী এসেছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের বিনোদন প্রতিদিন বিভাগে। কারওয়ান বাজারের ইত্তেফাক ভবনে বিনোদন প্রতিদিন টিমের সাথে আড্ডা দিলেন দীর্ঘক্ষণ। সেই আড্ডারই চুম্বক অংশ গ্রন্থিত হলো আজকের সাক্ষাত্কারে। কথা বলেছেন মোস্তাফিজ মিঠু, মারুফ রহমান ও মেহেদী সোহেল

 
বর্তমান কাজের ব্যস্ততা সম্পর্কে জানতে চাই—
 
বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে এক কথায় বলবো অনেক ভালো আছি। ভাবতে ভালো লাগে জীবনের এই মুহূর্তেও গান নিয়ে থাকতে পারছি, গান গাইতে পারছি। এর থেকে পাওয়া একজন শিল্পীর কাছে আর কি হতে পারে।
 
গান ও বর্তমান অবস্থা প্রসঙ্গে জানতে পারি-
 
আমার গান বলতে, আমার গাওয়া গান। গানগুলো লিখেছিলেন আমার মা গীতিকার জেবা-উন-নেসা। গানের ক্ষেত্রে আমি আমার মা’কেই নিজ জীবনের আদর্শ হিসেবে মনে করি। আমার ৫০ বছর গানের জীবনে সবচেয়ে বেশি গেয়েছি আমার মায়ের লেখা গান। মায়ের লেখা প্রায় দেড় হাজার গান ছিল। উপযুক্ত সংরক্ষণের অভাবে অনেক গান কালের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। তাই আমি এই বয়সে এসেও সেগুলোর শেষরক্ষা করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। তার লেখা গান, বই নিয়েই সারাক্ষণ ঘাটাঘাটি করি। এছাড়া অনেকদিন আমেরিকাতে থেকে সেখানে বিভিন্ন শহরে গানের অনুষ্ঠান করে কাটিয়ে এলাম।
 
আপনার মায়ের লেখা গানগুলো সংরক্ষণে সরকার কর্তৃক কোনো পদক্ষেপের সাড়া পেয়েছেন কি-না?
 
অনেক পুরোনো বিষয় এগুলো। আমার গাওয়া গানগুলোই হারিয়ে যাচ্ছে, সেক্ষেত্রে মায়ের লেখা গানগুলো সংরক্ষণে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো উদ্যোগ এখনও নেয়নি। তাই নিজ উদ্যোগেই মায়ের লেখা গানগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছি। আর এই ধারাবাহিকতায় মায়ের লেখা ছোটদের কিছু গান নিয়ে কাজ করছি।
 
বর্তমানে গান নিয়ে নতুন কি করছেন?
 
সম্প্রতি ‘প্রিয় জন্মভূমি’ শিরোনামে আমার গাওয়া একটি ভিডিও অ্যালবামের কাজ করলাম। ড. কামাল কলি হোসেনের লেখা, কাজি নাজির আহম্মেদের সুর ও মানাম আহম্মেদের সঙ্গীতায়োজনে অ্যালবামটি খুব শীঘ্রই মুক্তি পাবে। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের আদলে মোট দশটি গান নিয়ে এটি একটি দেশাত্ববোধক গানের অ্যালবাম।
 
আপনার সময়ের সহশিল্পী প্রসঙ্গে জানতে চাই—
 
আমার মা-খালা যেহেতু দেশের সঙ্গীতাঙ্গনের সাথে জড়িত ছিল, তাই আমার সহকর্মী বলতে বেশিরভাগ শিল্পীই ছিলেন তাদের সহশিল্পী। আমি সবাইকে মামা বলেই সম্বোধন করতাম। আমাদের সময়ে সৈয়দ আব্দুল হাদি, শাহনাজ রহমতউল্লাহ ছিলেন। অনেকদিন তাদের সাথে গানের কাজ করেছি। পরন্ত বিকেলে শীতের হারিয়ে যাওয়া রোদের মতো সেই দিনগুলোর কথা এখনও মনে পড়ে।   
 
বর্তমান সময়ের গানগুলো সম্পর্কে আপনি কি বলবেন?
 
যুগ বদলিয়েছে, শ্রোতাদের চাহিদারও পরিবর্তন হয়েছে। আমাদের সময় মানুষ গান লিখতো মন থেকে। তাই গানের কথাগুলো শুনলে মনে হতো নিজের কথা। এখন সবই তো বাণিজ্যিক, তাই হয়তো গানের কথাগুলোও বাণিজ্যিক হয়ে গেছে। আর বাণিজ্যিক গানের সাথে মনের আবেগ মেলানো যায় না। তবে বাণিজ্যিকের বাইরেও বর্তমানে দেশে যে গানগুলো হচ্ছে বা করার চেষ্টা করছে নতুন প্রজন্ম সেগুলোর প্রতি আমার আস্থা আছে।
 
এক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের প্রসঙ্গে আপনার পরামর্শ কি?
 
এখন তো অস্থিরতার যুগ, সবাই প্রাপ্তির কথা চিন্তা করে। এজন্য অবশ্য বর্তমান প্রজন্ম দায়ী নয়, বরং যারা তাদের প্রাপ্তির জায়গাটি করে দিচ্ছে তারা দায়ী।
 
তরুণ প্রজন্মের কাছে আমার একটিই পরামর্শ, তারা যেন কোনো প্রাপ্তির আশায় নিজ প্রতিভার বিকাশ না ঘটায়। তারা যেন শিল্পের উদ্দেশ্যে শিল্পী হয়, বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে নয়।