মানুষের ধারণা তিনি টেস্ট ব্যাটসম্যান; কেবল টেস্টটাই খেলতে পারেন! আগেও বহুবার এই ধারণার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টির সফল ব্যাটসম্যান হয়েছেন। তারপরও ভুলটা ভাঙেনি। সর্বশেষ বিপিএলে কুমার সাঙ্গাকারার পরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্কোরার হলেন। কোয়ালিফায়ার ও ফাইনালে পর পর দুটো ফিফটি করলেন। তারপরও কী ইমরুলের মূল্যায়ন বদলাবে? ইমরুল কায়েস নিজেই ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করেছেন। জাতীয় দলের এই তারকার একান্ত সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেবব্রত মুখোপাধ্যায়—
ইনজুরির কী অবস্থা এখন?
এখনও ব্যথা আছে। বরফ দিচ্ছি। ঠিক হয়ে যাবে।
একটু বিপিএল ফাইনালের কথা বলেন। ওই হ্যামাস্ট্রিং ইনজুরি নিয়ে ব্যাটিং করলেন কী করে?
টানটা লাগার আগ পর্যন্ত আমার চিন্তা ছিলো, যেহেতু রান পাচ্ছি, আজ খেলা শেষ করে আসবো। আমাদের রান রেট খারাপ ছিলো না। কিন্তু ব্যথা পাওয়ার পর দেখলাম, দাঁড়াতেই পারছি না। এ অবস্থায় অনেকক্ষণ যে খেলতে পারবো না, বুঝতে পারছিলাম। তখন ভাবলাম, যতক্ষণ আছি, রান রেট আরও বাড়িয়ে ফেলতে হবে। পরের ব্যাটসম্যানরা এসে যেন স্বাভাবিক খেলতে পারে। পর পর দুটো ছক্কাও মারলাম সেজন্য।
আপনাকে দেখে মনে হচ্ছিলো, হাঁটতেই পারছেন না। তারপরও চালিয়ে যাওয়ার জিদটা কোত্থেকে এলো?
হ্যাঁ, কীভাবে যে ওই সময় রানের জন্য দৌড়ালাম! পেইনকিলার ইনজেকশন নিয়েও ব্যথা কমছিলো না। ভয়াবহ ব্যথা করছিলো, দাদা। কিভাবে যে জিদটা এলো! এটা আসলে বলে বোঝানো যাবে না। আমি একটা ব্যাপারই ভেবেছি—আমরা টুর্নামেন্ট জুড়ে ভালো খেলেছি, এই ম্যাচটা জিততেই হবে। শরীরে যা হয় হবে।
আউট হয়ে ফেরার পর কী অবস্থা হলো? শেষ ওভারে খুব টেনশন হচ্ছিলো?
প্রথমটায় টেনশন ছিলো না। রান রেট ভালো ছিলো। কিন্তু পর পর দুটো উইকেট পড়ে গেলো। শেষ ওভারের প্রথম বলেও একটা আউট। আমি টেনশনে ওয়াশরুমে চলে গিয়েছিলাম। তারপরও ভরসা ছিলো অলক কাপালি। সে প্রথম চারটা মারার পরই বুঝেছি, জিতে যাবো।
একটু পুরো টুর্নামেন্ট নিয়ে আলাপ করি। যদিও আপনার শর্টার ফরম্যাটে অনেক পারফরম্যান্স আছে, তারপরও গত বছর দুয়েক একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে, আপনি টেস্ট ব্যাটসম্যান! বিপিএলের পারফরম্যান্স কী ধারণাটা বদলাতে পারবে?
ধারণাটা যে কিভাবে তৈরি হয়, তাই তো বুঝি না। প্রথম এনসিএল টি-টোয়েন্টিতে আমি সেরা ব্যাটসম্যান হয়েছিলাম। আসলে মাঝে কয়েকটা টেস্টে ভালো করেছি, ওয়ানডেতে রান পাচ্ছিলাম না; ফলে লোকে ধরে নিয়েছে, আমি টেস্ট ব্যাটসম্যান। আমি অবশ্য এসব কথা নিয়ে খুব ভাবি না। কারণ, কথা নানারকম চলতেই থাকবে। আমি রান পাচ্ছিলাম না, তাই কথা হয়েছে। কথা নিয়ে ভাবলে তো রান করা আরও কঠিন হবে।
তারপরও এবার বিপিএলে আপনার পারফরম্যান্সটা একটু ব্যতিক্রমই মনে হয়েছে। বাড়তি কোনো পরিবর্তন করেছিলেন?
কিছুটা মানসিক অ্যাডজাস্টমেন্ট ছিলো। গত দুটো বিপিএলে যেমন আমি শট নিয়ে খুব একটা ভাবিনি। ভেবেছি, সাধারণ যা খেলি, তাতেই রান আসবে। কিন্তু এই ফরম্যাট কিছু অ্যাডজাস্টমেন্ট ডিমান্ড করে।
টেকনিক্যাল কিছু অ্যাডজাস্টমেন্ট দরকার হয়?
অবশ্যই। টেস্টে, এমনকি ওয়ানডেতেও আপনি শুধু নিরাপদ শট খেলতে পারবেন। বাজে বলের জন্য অপেক্ষা করে নিজের শক্তিশালী শটটাই খেললেন; সমস্যা নেই। এখানে সে সুযোগ নেই। ফলে আপনাকে রিস্কি শটও করতে হবে। সেই শটগুলো নির্বাচন করতে হয়। কোন শটগুলো একটু রিস্ক নিয়েও ভালো করতে পারি, সেগুলো প্র্যাকটিস করতে হয়। সেটা কিছুটা সফলও হয়েছি এখানে।
প্রথম দুই ম্যাচেই শূন্য রানে ফিরলেন। শেষ অবদি টুর্নামেন্টে সেরা বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান। এই প্রত্যাবর্তনের ম্যাজিকটা কী?
আমার নিজের ওপর বিশ্বাস ছিলো। কিন্তু ‘ম্যাজিক’ যদি বলেন, সেটা আমার ক্যাপ্টেন আর কোচের ভেতর। প্রথম কথা হলো, এই দু’জন আমার ওপর অসীম বিশ্বাস রেখেছেন। আমি কিন্তু প্রথম চার ম্যাচেই তেমন রান পাইনি। আমার ধারণা, ফ্রাঞ্চাইজি ক্রিকেটে অন্য কোনো কোচ-ক্যাপ্টেন হলে আমাকে ড্রপ করে দিত। কিন্তু সালাউদ্দিন ভাই আর মাশরাফি সবসময় বিশ্বাসটা রেখেছে। ওরা অনেকদিন ধরে চেনে আমাকে। আমাকে সবসময় বলেছে, ক্রিকেট কখনোই জীবন-মরণ নয়। জাস্ট নিজের খেলাটা খেলতে বলেছে। আমি বলবো, ম্যাজিক ওরাই।
টুর্নামেন্টে সময় যতো গড়িয়েছে, ততো আপনার ব্যাট যেন চওড়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় দুটো ম্যাচেই দুই ফিফটি।
আমি জানতাম, আমি বড় ম্যাচে ভালো করবো। এই বিশ্বাসটার পেছনে আরেকটা মানুষের অবদান আছে—মারলন স্যামুয়েলস। ও যখন চলে যায়, আমাকে যেচে ডেকে বললো, ‘শোনো কায়েস, তুমি খুব ন্যাচারাল স্টোক-মেকার। তুমি কারো দিকে না তাকিয়ে নিজের খেলাটা খেলো, বিপিএলে সেরাদের একজন থাকবে।’ এরকম কথা অনেকেই বলে। কিন্তু ওর কথাটা আমার খুব লেগেছে। আমি ভাবলাম, স্যামুয়েলসের মতো অভিজ্ঞ একজন মানুষ এরকম বললো, আমি সেটা করতে পারবো না!
ইমরুল, আপনার কী মনে হয়, আপনি একটু আন্ডার রেটেড থাকেন? আপনার এই পারফরম্যান্সের পরও আপনি ঠিক তারকা নন!
মনে হয়। এটাকে আমার কপাল বলতে পারেন। আমার পারফরম্যান্স কারোরই মনে হয়, বেশিদিন মনে থাকে না। হা হা হা...। আমি অবশ্য এটার পজেটিভটাই দেখি। আমাকে মানুষের মনে থাকতে গেলে প্রতিটা সিরিজেই ভালো করতে হবে। আমার একটা সেঞ্চুরি অনেকদিন আমার হয়ে কথা বলবে না। ফলে রোজই ভালো খেলতে হবে। এটা তো আমার জন্য ভালো।
