নার্সিং পেশায় বঞ্চনার শেষ নেই

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০১৫, ০১:১৯
সেবার মান উন্নীতকরণের মূল কারিগর নার্স। নিরলস পরিশ্রম করে, মমতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে রোগীদের সেরে তোলেন নার্সরা। এই বিষয়টি মাথায় রেখে উন্নত দেশে নার্সদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশের নার্সিং পেশাকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিতে ২০০৯ সালে নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই নির্দেশনার পরও নার্সরা পদে পদে বঞ্চনার শিকার। তবে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি ও নির্দেশনা অনুযায়ী দ্বিতীয় শ্রেণির উচ্চতর পদসমূহ প্রথম শ্রেণিতে উন্নীতকরণ এবং নিয়মিতকরণ না করে গত ৮ ডিসেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সিনিয়র স্টাফ নার্সদের মধ্য থেকে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদায়ন করে সেবা কার্যক্রম চালু রাখার সিদ্ধান্তের ফলে নার্সিং সেক্টরে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে সারাদেশে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে।
 
জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী নার্সদের দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা প্রদানের পূর্বে উচ্চতর পদসমূহ প্রথম শ্রেণিতে উন্নীতকরণ এবং যে সকল নার্স উক্ত পদে কর্মরত ছিলেন তাদের প্রথম শ্রেণিতে নিয়মিতকরণের নির্দেশ দেন। এ নির্দেশ অনুযায়ী নার্সিং ইনস্টিটিউট প্রধান, নার্সিং ইনস্ট্রাকটর ইনচার্জ, নার্সিং ইনস্টিটিউটের শিক্ষক, নার্সিং ইনস্ট্রাকটর ও সেবিকা শিক্ষয়িত্রী, নার্সিং কলেজের শিক্ষক, ইনস্ট্রাকটর ও ডেমনস্ট্রেটর, জেলা পাবলিক হেলথ নার্স, হাসপাতালের ডেপুটি নার্সিং সুপারিনটেন্ডেন্ট, ওটি সুপারভাইজার ও নার্সিং সুপারভাইজার— এই নয়টি পদই প্রথম শ্রেণিভুক্ত হওয়ার কথা।
 
অথচ গত ৪ মে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত প্রথম শ্রেণিতে উন্নীতকরণের আদেশে সমস্কেল, সমযোগ্যতা ও সমমর্যাদা সম্পন্ন দ্বিতীয় শ্রেণির ৭টি পদকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র দুটি পদকে প্রথম শ্রেণিভুক্ত করা হয়। এ বৈষম্যের ফলে নার্সিং শিক্ষা ও প্রশাসনের ক্ষেত্রে সংকট ও জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।
 
গত ৮ ডিসেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় দ্বিতীয় শ্রেণির বাকি ৭টি পদকে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত না করে সিনিয়র স্টাফ নার্সদের মধ্য থেকে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদায়ন করে সেবা কার্যক্রম চালু রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ সিদ্ধান্তে নার্সদের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
 
জানা গেছে, সকল প্রশাসনিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উচ্চতর পদে দীর্ঘদিন যাবত্ কোনো পদোন্নতি নেই। সেবা পরিদপ্তরের অধীনে পদ দীর্ঘদিন খালি   থাকা সত্ত্বেও প্রথম শ্রেণির পদসহ ১৯৯২ সাল থেকে পরিচালকের পদ একাধারে দীর্ঘ প্রায় ২৩ বছর যাবত্ খালি রয়েছে। সর্বোচ্চ পদ পরিচালকসহ সকল নার্সিং কর্মকর্তা ভারপ্রাপ্ত, চলতি দায়িত্ব, নিজ বেতনে, প্রেষণে অথবা অ্যাকটিং হিসেবে সকল ঊর্ধ্বতন পদে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ সকল পদে পদোন্নতি প্রদান না করায় সেবা পরিদপ্তরের ক্ষমতায়ন বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে এবং এর সুষ্ঠু প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা সার্বিকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে নার্সিং শিক্ষা, প্রশাসন ও সার্ভিসে বিভিন্নমাত্রার জটিলতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে; যার মূলে রয়েছে বিদ্যমান নিয়োগবিধি। এই অবস্থায় প্রচলিত ত্রুটিপূর্ণ নার্সিং নিয়োগবিধি সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
 
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছেন, সাত কলেজসহ নার্সিং ইনস্টিটিউটের শিক্ষা কার্যক্রম সুষ্ঠু পরিচালনার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বিনির্মাণ এবং শিক্ষক ও জনবলের পদসৃজন, নিয়োগ ও পদোন্নতি অতীব জরুরি। জনবল না থাকায় অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, প্রভাষক ও ইন্সট্রাক্টর পদে সিনিয়র স্টাফ নার্সরা রয়েছেন। তবে এরা মন্ত্রণালয়ের অনেক কর্মকর্তার তুলনায় উচ্চ ডিগ্রিধারী। জানা গেছে, দেশে কয়েক হাজার নার্স আছেন যারা পিএইচডি ডিগ্রিধারী।
 
এদিকে বর্তমান সরকার সেবা পরিদপ্তরকে অধিদপ্তর করার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। অবকাঠামোগত কাজও চলছে। এসব পদ কুক্ষিগত করতেই আমলারা ষড়যন্ত্র করে নার্সদের পদোন্নতি আটকে দিচ্ছে। নার্সিং কলেজের জন্য ১ হাজার ৬১৮টি নার্সিং পদ সৃষ্টি করা হয়। তবে মন্ত্রণালয় থেকে মাত্র ৫২৭টি পদের অনুমোদন দেয়া হয়। 
 
৭টি পদ প্রথম শ্রেণিতে উন্নীতকরণের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন দেয়া হলেও অর্থ মন্ত্রণালয় তা প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছে। নার্সিং পেশার মানোন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও আমলারা এটা নিয়ে টালবাহানা করছেন বলে জানা গেছে।
 
সেবা পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, আমরা প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হয়ে আসছি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের লোকজন আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে, মানসিকভাবে নানা নির্যাতন চালায়। সারাদেশে নার্সদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। দাবি না মানলে নার্সরা আন্দোলনে নামবে। বড় ধরনের ঘটনা ঘটলে এর দায় অর্থ মন্ত্রণালয়কে নিতে হবে।   
 

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে নার্সদের মান উন্নীতকরণের বিকল্প নেই। নার্সিং পেশার মানোন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য যা করা দরকার সেটাই করা হবে।